শহিদ ভাইদের প্রতি একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস পরিক্রমা

শহিদ ভাইদের প্রতি একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস পরিক্রমা

জুলফিকার মোল্যা, বঙ্গ রিপোর্টঃ মনের ভাব প্রকাশের প্রধান উপাদান হল ভাষা, আর মাতৃভাষা যেকোন ব্যক্তির রক্তের মধ্যে মিশে থাকা এক সত্বা। মানব সাংস্কৃতি, আত্ম সচেতনতা, জাতীসত্বা, ঐতিহ্য সংরক্ষণে ভাষা হচ্ছে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। বাংলা ভাষা আমাদের সেই আত্মার সত্বা। বাংলা মিশে আছে প্রতিটি বাঙালির রক্তের অণুতে অণুতে। আমার একুশে রাঙানো শহীদ ভাইদের রক্তে লাল হওয়া এ মাটি সোনার চেয়ে অনেক খাঁটি।

আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। এই ভাষার সংগ্রামের কাহিনি ইতিহাসে এক নজির সৃস্টি, যা পৃথিবীর ভাষা আন্দোলনকে সারাক্ষণই আন্দোলিত করে তোলে। বাংলার মানুষের বাংলা ভাষায় কথা বলার স্বাধীনতার জন্য আমাদের শহীদদের বহু সংগ্রাম এবং জীবন দিয়ে ভাষা’র মর্যদা রক্ষা করতে হয়েছে। ১৯৯৯ সালের নভেম্বরে UNESCO’র সাধারণ পরিষদে মহান ভাষাদিবস একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস ’ ঘোষণা করায় বাংলা ভাষা আজ মর্যাদার আসনে সুপ্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।

বিশ্ব ইতিহাসে বাঙালী একমাত্র জাতি যারা তাঁর মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। পাকিস্তান স্বাধীনতার লাভের পর এক সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। ১১ মার্চ ১৯৪৮ সালে পূর্ব-পাকিস্তান (বাংলাদেশ) বাংলায় ভাষার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। কিন্তু ২১ মার্চ ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। এরফলেই সাথে সাথে শুরু হয় প্রতিবাদ। ১৯৫২ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারি সকালে ১৪৪ ধারা অমান্য করে রাজপথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বেরিয়ে এলে পুলিশ তাদের ওপর গুলি চালায়। এ-র ফলেই আবদুস সালাম, আবুল বরকত, আবদুল জব্বার সহ কয়েকজন ছাত্রযুবা হতাহত হন। এই ঘটনার প্রতিবাদে পরেরদিন ২২শে ফেব্রুয়ারি অত্যাচার, জুলুমকে উপেক্ষা করেও ছাত্রদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ জানাতে আবারও রাজপথে নেমে পড়ে।
১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে সভা আর মিছিলে ভরে গেলে চালানো হয় গুলি এবং শহীদ হন কয়েকজন ভাষা সংগ্রামী। এরই প্রেক্ষাপটে মাওলানা ভাসানির নেতৃত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্র ভাষা পরিষদ ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে “ভাষা দিবস” পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।

১৯৯৯ সালের ২৮ অক্টোবর ইউনেস্কোর সাধারণ পরিষদে শিক্ষামন্ত্রী একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ’ ঘোষণা করার প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। এ প্রস্তাবের পক্ষে ২৭টি দেশ সমর্থন দেয়। ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোর ৩১তম সম্মেলনে “২১শে ফেব্রুয়ারি” কে “আন্তর্জাতিক মার্তভাষা দিবস ’ হিসেবে পালনের স্বীকৃতি পায়। এরই হাত ধরে আজ বাংলা ভাষা পৃথিবীর মধুরতম হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি আমরা আন্তরের আন্তরিক পবিত্রতা ও শভ্রতা দিয়ে শহীদের বেদিতে ফুল দিয়ে মাতৃভাষা দিবস পালন করি। আমাদের সাথে পৃথিবীর আরও ১৮৮ টি দেশ এই দিনটকে স্মরণ করে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে। কিন্তু শুধুমাত্র বছরে একটি দিন পালনই আমাদের ভাষাদিবস পালনের পূর্ণতা আনতে পারবে? না! কক্ষণোই নয়। শত শহীদের রক্ত ঝরিয়ে আমাদের এই ভাষা। এর চেয়ে বড় পাওয়া, বড় চাওয়া আর কি আছে আমাদের? সত্যিই বাঙালী গর্বিত জাতি। আমরা গর্বিত আমাদের মাতৃভাষার জন্য, আমরা গর্বিত আমাদের শহীদ ভাইদের জন্য। শহীদরা আমাদের পৌঁছে দিয়েছেন বিশ্বের সম্মান জনক স্থানে। সার্থক হয়েছে তাঁদের রক্তদান। তাইতো আজও আজ আকাশ বাতাস মুখরিত হয়ে কলতানে ভেসে ওঠে,,,

“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি?”

জুলফিকার মোল্যা
হোসেনপুর, বসিরহাট