যাদের কেউ মনে রাখেনি: ‘জয় হিন্দ’ স্লোগানের স্রস্টা ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সহচর আবিদ হাসান

যাদের কেউ মনে রাখেনি: ‘জয় হিন্দ’ স্লোগানের স্রস্টা ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সহচর আবিদ হাসান

বঙ্গ রিপোর্ট ডিজিটাল ডেস্ক: ভারতের এই অস্থির সময়ে যখন কে বিশুদ্ধ হিন্দু, কার এ দেশে থাকার জন্মগত অধিকার আছে, আর কে-ই বা ‘জৈন পারসিক মুসলমান খৃস্টানী’, যাঁদের আমরা ইচ্ছা করলে দেশ থেকে বিতাড়িত করতে পারি, তাই নিয়ে প্রবল বিতর্ক ও মতভেদ চলছে, তখন আমার মনে পড়ছে নেতাজি সুভাষচন্দ্রের সহযোদ্ধাদের কথা, যাঁরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন। এঁদের অনেকের সঙ্গে ছিল আমার সাক্ষাৎ-পরিচয়। আজাদ হিন্দ ফৌজের এই সৈনিকেরা ছিলেন ইত্তেফাক-এতমাদ-কুরবানি (একতা-বিশ্বাস-বলিদান), নেতাজির এই মন্ত্রে অনুপ্রাণিত ভারতীয়।

মনে পড়ছে দু’জনের কথা। এক জন মিঞা আকবর শাহ, তিনি ব্রিটিশের চোখে ধুলো দিয়ে নেতাজির মহানিষ্ক্রমণের সময়ে অন্যতম সহযোগী। অপর জন আবিদ হাসান, যিনি প্রথমে ইউরোপে, পরে এশিয়ায়, এবং জার্মানি থেকে জাপান আসার সময়ে দীর্ঘ নব্বই দিন নেতাজির সর্বক্ষণের সঙ্গী।

মহানিষ্ক্রমণের পূর্বে নেতাজি আকবর শাহকে পেশোয়ার থেকে ডেকে পাঠালেন। তখন তিনি অসুস্থ, এলগিন রোডের বাড়িতে। ইংরেজ সরকার ভেবে রেখেছে, একটু শরীর ভাল হলে আবার জেলে পুরবে। নেতাজি অবশ্য ভ্রাতুষ্পুত্র শিশির কুমার বসুর সঙ্গে কলকাতা থেকে মহানিষ্ক্রমণের খুঁটিনাটি প্ল্যান করছেন রোজ। বললেন, কলকাতা থেকে গৃহত্যাগের ভার থাকবে শিশিরের ওপর আর পেশোয়ারে পৌঁছনোর পর আকবর শাহের ওপর। আকবর শাহকে সঙ্গে নিয়ে শিশির কিনলেন নেতাজির ছদ্মবেশ। আকবর শাহ ফিরে গেলেন পেশোয়ারে। নেতাজির পেশোয়ার থেকে আফগানিস্তান যাওয়ার ব্যবস্থা করে রাখলেন।

১৯৭৬ সালে শিশির বসু নেতাজি রিসার্চ বুরোতে আকবর শাহকে নিয়ে আসার জন্য অনেক চেষ্টা করেন। আকবর শাহ তখন সীমান্ত প্রদেশে নৌশেরায় তাঁর গ্রামের বাড়িতে, পাকিস্তান থেকে তাঁকে নিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব। শিশির বসু আপ্রাণ চেষ্টা করে তাঁর জন্য ভারতে আসার ভিসার ব্যবস্থা করলেন। আকবর শাহ জানালেন, তিনি আসছেন, এলগিন রোড তাঁর খুব আপন জায়গা। কিন্তু না, তাঁর আসা হল না। নৌশেরা থেকে লাহৌর বিমানবন্দরে পৌঁছনোর পর পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ জানালেন, ইতিহাস কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার জন্য তাঁর ভারতে যাওয়া চলবে না। যদি ওঁর কোনও মরণাপন্ন আত্মীয় ও দেশে থাকেন, তবেই যাওয়ার অনুমতি পেতে পারেন। কয়েক বছর পর এই জাতীয়তাবাদী স্বাধীনতা সংগ্রামীর সঙ্গে আমাদের দেখা হল ইংল্যান্ডে। আমাদের পুত্র সুগত তখন কেমব্রিজে। সে জানাল, জাফর শাহ বলে এক জনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে, তিনি আকবর শাহের পুত্র, আর তাঁর কাছে তাঁর পিতা আসছেন। জাফর শাহের গৃহে শিশির বসু এবং আকবর শাহের দেখা হল মহানিষ্ক্রমণ পর্বের চল্লিশ বছর পরে। চোখে ভাসছে সেই আবেগপূর্ণ দৃশ্য— দু’জন পরস্পরকে জড়িয়ে ধরেছেন। আমি বললাম, কী রকম আকস্মিক ভাবে আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। উনি হা হা করে হেসে বললেন, ‘‘ইংরেজরা কিন্তু বিশ্বাস করবে না। বলবে, আমরা গভীর ষড়যন্ত্র করে এখানে মিলিত হয়েছি।’’ শিশির কুমার অনেক দিন ধরে কলকাতা-গোমো-দিল্লি-পেশোয়ার-কাবুল নেতাজির মহানিষ্ক্রমণ পর্ব নথিভুক্ত করতে চেষ্টা করছিলেন। পেশোয়ার-কাবুল পর্বটি এই বার ঠিক জানা গেল। কী ভাবে বিশ্বাসঘাতক ভগৎ রাম জোর করে নেতাজির সঙ্গী হয়েছিলেন, আকবর শাহ তা লিপিবদ্ধ করলেন।

এ বার বলি নেতাজির আর এক মুসলিম সহযোগী আবিদ হাসানের কথা। আবিদ ছিলেন আমাদের একান্ত আপনজন। কত বার যে তিনি আমার অতিথি হয়েছেন! তাঁর মুখে নেতাজির কথা, আজাদ হিন্দ ফৌজের কথা কত যে শুনেছি! নেতাজি আবিদকে ডেকে বললেন, ভারতীয়েরা পরস্পর দেখা হলে সম্ভাষণ করতে পারে এমন একটা সম্ভাষণ খুঁজে বার করো। আবিদ দুষ্টুমি করে বললেন, ‘‘পেয়ে গিয়েছি, আমরা পরস্পর দেখা হলে বলব হ্যাল্লো।’’ নেতাজি রাগ করে বলেন, ‘‘আমি একটা সিরিয়াস বিষয়ে কথা বলছি।’’ আবিদ দেখলেন রোজ ব্যারাক থেকে বার হলেই সামনে বসে থাকা রাজপুত রাইফেলস-এর সৈনিকেরা তাঁকে বলে ‘‘জয় রাম জি-কি’’। আবিদের কানে খুব মিষ্টি লাগে। রাতের পর রাত জেগে তিনি ‘‘জয় রাম জি-কি’’ বলতে থাকেন, ভাবলেন ‘‘জয় হিন্দুস্তান কি’’ কেমন হয়? বা ছোট করে যদি বলা যায় ‘জয় হিন্দ-কি’? পর দিন সকালে সেনারা যখন ওঁকে ‘‘জয় রাম জি-কি’’ বলল, তিনি বললেন, ‘‘ওটা তো আগেকার দিনের। এসো আমরা জয় হিন্দ-কি বলি।’’ সেনারা মহা উৎসাহে বলে উঠল ‘‘জয় হিন্দ-জয় হিন্দ’’। আবিদ হাসান দৌড়লেন নেতাজির কাছে: পেয়ে গিয়েছেন। নেতাজি এবং অন্য অফিসারদের খুব পছন্দ হল।

সাবমেরিন যাত্রার গল্প শুনেছি ওঁর কাছে। সাবমেরিনের রান্নাঘরে দেখলেন একটু চাল আর ডাল আছে। নেতাজির জন্য অল্প খিচুড়ি বানালেন। খাবার টেবিলে নেতাজি জার্মান নাবিক অফিসারদের সঙ্গে ভাগ করে খিচুড়ি খেলেন। আবিদ আমাকে বলেছিলেন, নেতাজিকে নিয়ে আর পারি না। সামান্য চাল-ডাল সকলে মিলে খেলে দু’দিনেই শেষ হয়ে যাবে। সেই বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রার মধ্যে নেতাজি শান্ত ভাবে নিজের কাজ করতেন, আবিদ হাসানকে ডিকটেশন দিতেন। ইম্ফল থেকে রিট্রিট করার সময় তার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথাও তাঁর কাছে শুনেছি। আবিদ এক বার ভাবলেন, আমরা কেন মন্দির, মসজিদ, গির্জায় আলাদা ভাবে যাব? তিনি দুনিয়া কি মালিক-এর উদ্দেশে সকলে মিলে পাঠ করার এক প্রার্থনা লিখলেন। নেতাজির কাছে বকুনি খেয়েছিলেন। নেতাজি বলেছিলেন, ‘‘আবিদ ধর্ম আর রাজনীতি কখনও একসঙ্গে মিশিয়ে ফেলবে না। প্রত্যেকে তাঁর নিজের ধর্ম যেমন ইচ্ছা পালন করবেন। সবার উপরে আমরা ভারতীয়। আমরা ভারতের জন্য সংগ্রাম করছি।’’

নেতাজিকে শেষ দেখার দিনটির কথা বলতেন। সায়গল বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে আছেন, পাশে আছেন আয়ার-সহ আরও চার জন সঙ্গী। নেতাজিকে নিয়ে বিমান আকাশে উড়ে গেল। যত ক্ষণ দেখা যায়, একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন, ভেবেছিলেন সাবমেরিন যাত্রার মতো এই যাত্রায় নেতাজি ওঁকে সঙ্গী করবেন। কিন্তু নেতাজি বেছে নিলেন হবিবুর রহমানকে। মনের মধ্যে গভীর শূন্যতা, কবে দেখা হবে। নেতাজি বলে গিয়েছেন, শিগগিরই ওঁদের ডেকে নেবেন।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষে যখন নেতাজির কীর্তিগাথা সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ল, তখন সেই বালিকা বয়সে কলকাতার সব পার্কে-ময়দানে-সভাগৃহে ছুটেছি নেতাজির সহযোদ্ধাদের এক বার দেখব বলে। দেখা পেয়েছি হবিবুর রহমানের, দেখেছি সৌকত মালিককে, যিনি ভারতে প্রবেশ করে ইম্ফলের কাছে ময়রাং-এ জাতীয় পতাকা তুলেছিলেন। শাহ নওয়াজ তো আমাদের হিরো, ‘লাল কিল্লা সে আয়ি আওয়াজ’। সায়গল-ধিলোঁ-শাহনওয়াজ— তাঁদের এক জন হিন্দু, এক জন শিখ, এক জন মুসলিম। আলাপ হয়েছিল সিরিল জন স্ট্রেসি-র সঙ্গে, যিনি নেতাজির আদেশে সিঙ্গাপুরে আইএনএ স্মৃতিসৌধটি গড়েন, তিনি ধর্মে খ্রিস্টান।

সেনাদের ভারতীয় বাহিনীতে আর ফিরিয়ে নেওয়া হবে না যখন জানা গেল, অনেকেই তাঁদের জন্মস্থানে ফিরে গেলেন। দেশভাগ হয়ে গিয়েছে। যাঁদের জন্মস্থান পাকিস্তানে, তাঁরা ফিরে গেলেন সেই দেশে। কর্নেল আরশাদকে কলকাতায় এক বার আনতে পেরেছিলাম। জমান কিয়ানি ছিলেন পুরো ফার্স্ট ডিভিশনের কমান্ডার। মণিপুরের ব্রিটিশ শাসনমুক্ত এলাকা তিনি বেশ কিছু কাল ধরে রাখতে পেরেছিলেন। তিনি তাঁর আইএনএ জীবনের অভিজ্ঞতার কথা লিখে গিয়েছেন। সেই বইয়ের পাণ্ডুলিপি তিনি কলকাতার রিসার্চ বুরোতে পাঠিয়ে দেন। ভারতে সেই বই প্রকাশিত হয়। এই বীরযোদ্ধাদের পরিবার-পরিজন এবং পরের প্রজন্ম আজও নেতাজি সুভাষচন্দ্রের অনুগত। হবিবুর রহমানের স্ত্রী-পুত্রের সঙ্গে ইসলামাবাদে দিন কাটিয়েছি। লাহৌরে গেলে জমান কিয়ানির কন্যা ও জামাতা জাহিদা ও ফরিদের গৃহেই তো থাকি। ও দেশের গোয়েন্দারা এ সব ভাল চোখে দেখেন না।

নেতাজি সুভাষচন্দ্রের একান্ত অনুগত এই বীর সহযোদ্ধাদের কথা কি আমরা ভুলে যেতে পারি? তাঁদের আত্মত্যাগের মূল্যে এই উপমহাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। আজকের এই অস্থির সময়ে তাঁদের একতা-বিশ্বাস-বলিদানের কথা স্মরণ করি।

কলমে: কৃষ্ণা বসু, আনন্দবাজার পত্রিকা