নজরুল-পরবর্তী বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অনন্য ও শ্রেষ্ঠ গদ্যকার ছিলেন আবদুল আযীয আল আমান

নজরুল-পরবর্তী বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অনন্য ও শ্রেষ্ঠ গদ্যকার ছিলেন আবদুল আযীয আল আমান

বঙ্গ রিপোর্ট ডিজিটাল ডেস্ক: আবদুল আযীয আল আমান একজন ভারতীয় বাঙালি কথাসাহিত্যিক ও প্রকাশক। নজরুল-পরবর্তী বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অনন্য ও শ্রেষ্ঠ গদ্যকার, আবদুল আযীয আল আমান। ষাটের দশকে তিনি ‘কাফেলা’ নামক একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করেন যা বাংলা সাহিত্যের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আবদুল আযীয ১৯৩২ সালের ১০ই মার্চ তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের অবিভক্ত চব্বিশ পরগণা অধুনা উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার আমডাঙা থানার সোলেমানপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
লেখাপড়ার হাতেখড়ি গ্রামের নিজস্ব পাঠশালায়। ১৯৫৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ.। শিক্ষকতা ও অধ্যাপনা করেছেন গার্ডেন রীচ কলেজ ও ঢাকার জগন্নাথে। লেখালেখির সাথে যুক্ত হয়েছেন ছাত্রজীবনেই। তখনই লিখেছেন বিখ্যাত বই ‘পদক্ষেপ’। নিজ সম্পাদিত ‘জাগরণ’ ও ‘কাফেলা’ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে ঘনিষ্টতা গড়ে ওঠে সমকালীন শ্রেষ্ঠ লেখকদের সাথে। কবি নজরুলের লেখা নিয়ে নতুন ভাবনা ও পুনর্মূল্যায়ন করেছেন। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধের বই মিলিয়ে লেখকের প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৬০ এর বেশি।

তাঁর পিতার নাম ছিল মরহুম ওয়াসিমউদ্দিন (লোকে ওসিমুদ্দিন বলতেন)। মাতার নাম মরহুমা রজিমুন্নেসা। আজিজ সাহেবের বিয়ে হয় দক্ষিন ২৪ পরগণার মহেশতলা থানার নুঙ্গি-চপচান্দুল (বাটানগর) গ্রামের বিখ্যাত জমিদার সেখ গুল মাহমুদের একমাত্র কন্যা বেগম মরিয়ম আজিজের সঙ্গে।

মুর্শিদাবাদের একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। ছাত্র থাকাকালে তিনি চারণকবি গুমানী দেওয়ানের সান্নিধ্যে আসনে। পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালে তিনি তাঁকে নিয়ে একটি জীবনীগ্রন্থ রচনা করেন। ১৯৬৯ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ছয়টি গ্রন্থের একটি সংকলন রচনা করেন।এছাড়া ইসলাম সম্পর্কিত বেশ কিছু বই অনুবাদ ও রচনা করেন। তিনি বেদ, গীতা, ভাগবত, ধম্মপদের বাংলা অনুবাদেও ভূমিকা রাখেন।

১৯৮৩ সালে সস্ত্রীক পবিত্র হজ সম্পাদনার পর শুরু করেন বিখ্যাত এবং ঐতিহাসিক ‘কাবার পথে’ রচনা। ১৯৮৭-তে শুরু হয় বহু আকাঙ্ক্ষিত সিরাতগ্রন্থ রচনা ‘রাসূলুল্লাহ সা’। এই সময়ই লেখক নিজেকে বহির্জগত থেকে গুটিয়ে নিয়ে ‘দ্বীনি অধ্যয়ন’ ও লেখালেখিতে আবদ্ধ রাখেন। ১৯৯৪-এ মাদরাজে চোখের অপারেশনের আগ-মুহূর্তে নভেম্বরে লেখেন জীবনের শেষ প্রবন্ধ (যা ‘মাসিক মদীনা’তে মুদ্রিত হয়েছিল) ‘রাসূলুল্লাহ সা.-এর বিনয়’।
১৯৯৪-এর ১ লা ডিসেম্বর হঠাৎই হৃদরোগে আক্রান্ত হন লেখক এবং এ দিনই সকাল ১১:৫৫ মিনিটে মহান প্রভুর ডাকে সাড়া দেন।

সাপ্তাহিক ‘নতুন গতি’ (১৯৮৪), ‘হরফ প্রকাশনী’ করে সংবাদ সাহিত্য সংস্কৃতি, প্রকাশনী জগতের এক নতুন দিশা তৈরি করেছিলেন। শুধু কি তাই? শিক্ষকতার চাকুরি ছেড়ে দিয়ে সাহিত্য-সংস্কৃতি-সংবাদ- ও প্রকাশনা জগতে হিন্দু-মুসলিম- সমন্বয় ও দুই বাংলার সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বড় ভুমিকা তিনি পালন করেন। আমান সাহেবের জাগরণ-কাফেলা-নতুন গতি – হরফ ছিল সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রে একটি স্বর্ণযুগ। তৈরি করেছিলেন এক লেখক গোষ্ঠী যারা মূল স্রোতের সাহিত্য পত্রিকা বা প্রকাশকদের চ্যালেঞ্জ দিতে পারতেন।

এম আব্দুর রহমান, কবি মাহমুদুল হক, আব্দুর রাকিব, এ মান্নাফ, সৈয়দ আব্দুল বারি, আবু আতাহার, সৈয়দ আসরার আহমেদ, মহম্মদ আইয়ুব হোসেন, মাসুদ উর রহমান, ইবনে ইমাম, রফিকুল্লাহ, আব্দুর রউফ (নদীয়া), রবিউল হোসেন খান, খাজিম আহমেদ (বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ), আনোয়ার হোসেন, আব্দুর রেজ্জাক, হাফিজুর রহমান, এমদাদুল হক নুর, আব্দুর রব খান, ফিরোজা বেগম, আজরা বানু, মহম্মদ মতিউল্লাহ, আনজু বানু, সামশুল আলম, মুজতুবা আল মামুন সহ এক ঝাঁক কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক লেখককে আমরা পেয়েছি। কলেজ স্ট্রিটে হরফ প্রকাশনী করে মাত্র ৫ টাকা বা ১০ টাকায় রাম মোহন রচনাবলী, মধূসূদন রচনাবলী, দ্বিজেন্দ্র রচনাবলী ইত্যাদি তিনি পাঠকের হাতে তুলে দেন। হরফ প্রকাশনীর কর্ণধার হিসাবে তিনি কলকাতার কলেজ স্ট্রিট মার্কেটে একটি অভিনব দিক সৃষ্টি করেন।

পশ্চিমবাংলায় বাঙালী মুসলমানদের এখন শিক্ষার হার বাড়ছে ঠিক কথা। বাঙালী মুসলিমদের হাতে পয়সা হয়েছে। অনেক নন-মেনুফাকচারিং শিল্পের কোটিপতি মালিকও রয়েছেন ঠিকই। তারা মিডিয়া-সংবাদপত্র-পত্রপত্রিকার ব্যাপারে উদাসীন। এই দুঃখবোধও আব্দুল আজীজ আল আমানের মধ্যে ছিল। তাই গ্রামে গ্রামে ঘুরেও তিনি সাধারণ মানুষের সাহায্য নিয়ে হরফ-কাফেলাকে শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করিয়েছেন। যেমন তিনি লেখক গোষ্ঠী তৈরি করেছিলেন, তেমনি মূলস্রোতের লেখক সৈয়দ মুস্তফা সিরাজ, আব্দুল জব্বার, সুনীল-শীর্ষেন্দুদের সাথেও সম্পর্ক রাখতেন আমান সাহেব।

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের কয়েকটি বইও প্রকাশ করেন আমান সাহেব। আবার তাকে দিয়ে দুই বঙ্গের গল্পকারদের দিয়ে একটি গল্প সংকলনের বইও বের করেছিলেন। কলকাতার কলেজ স্ট্রিট এলাকারাই নয়, পশ্চিমবঙ্গ তথা পূর্ব ভারতে বাংলাভাষী মানুষের কাছে আব্দুল আজীজ আল আমান একটি জনপ্রিয় নাম। বাংলাদেশের সঙ্গে সেতু বন্ধন গড়তে এই মানুষটির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা ছিল। আল মাহমুদ, শামসুর রহমান, শহীদ কাদেরি, আল মুজাহিদী, ডঃ আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদ, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, বশির আল হিলাল, বদরুদ্দিন উমর, বুলবুল সারওয়ার- সবার সঙ্গেই তার যোগাযোগ ছিল। এটা বললে হয়তো অত্যুক্তি হবে না যে, আব্দুল আজিজ আল আমান হরফ-কাফেলা-নতুন গতি দুই বাংলার সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছেন। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় সেই সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব, সংগঠক ব্যক্তিত্ব আব্দুল আজীজ আল আমান দুই বাংলায় একরকম বিস্মৃত।

গ্রন্থপঞ্জি
কাব্য গ্রন্থ বা কবিতার বই সম্পাদনা
আমার বাগানে লাইলি
ফেরা
এই কণ্ঠ অন্য স্বর
ধবল জোছনার সম্রাট
আকণ্ঠ একরাতে

গল্প সংকলন বা গল্পের বই
সোলেমানপুরের আয়েশা খাতুন
শেখজি ও দ্বিতীয় পক্ষ
সালমা-শাহেদ-শিরিন
বাদামতলির মৃত্যু
আল আমানের প্রেমের গল্প
আল আমানের শ্রেষ্ঠগল্প
উপন্যাস সম্পাদনা
শাহানী একটি মেয়ের নাম
সাকিনার সংসার
হেমকপুরের কথকতা

ভ্রমণ কাহিনী
কাবার পথে (মক্কা পর্ব)
কাবার পথে (মদিনা পর্ব)

সম্পাদিত গ্রন্থ
আল কুরআন
রামমোহনের রচনাবলী
মধুসূদন রচনাবলী
দীনবন্ধু রচনাবলী
দ্বিজেন্দ্র রচনাবলী
বঙ্কিম রচনাবলী
বিষাদসিন্ধু
নজরুল রচনাসম্ভার
নজরুলগীতি
রাঙা জবা
নজরুলের ইসলামী সংগীত
শ্রেষ্ঠ নজরুল সংগীত
শ্রেষ্ঠ নজরুল স্বরলিপি
অপ্রকাশিত নজরুল
দ্বিজেন্দ্রগীতি
বেদ সংহিতা
বিদ্রোহী বিচিত্রা
নজরুল কিশোর সমগ্র
চার খলিফার বিচিত্র জীবনকথা
রচনাবলী সম্পাদনা
আল আমান রচনাবলী – প্রথম খন্ড
আল আমান রচনাবলী – দ্বিতীয় খন্ড
প্রবন্ধের বই সম্পাদনা
নজরুল পরিক্রমা
ধূমকেতুর নজরুল
রৌদ্রময় ভূখণ্ড
অনন্তের দিকে
পদক্ষেপ
সাহিত্যসঙ্গ
বিশ্বাসের ঘরবাড়ি

সিরাত (নবীর জীবনী) বা ইসলাম বিষয়ক কিশোর গ্রন্থ
আলোর রসুল আল আমীন
শিশুদের নবী
ছোটদের মহানবী
হযরত ইব্রাহিম (আঃ)
হযরত সালেহ (আঃ)
হযরত হুদ (আঃ)
আলোর আবাবিল
হযরত ফাতিমা (রাজিঃ)
বেহেস্তের পাখিরা
মক্কা মদিনার পথে
ধন্য জীবনের পুণ্য কাহিনী

তথ্যসূত্র: দিনকাল, উইকিপিডিয়া