আমেরিকান শিল্পী-লেখক ড্যানিয়েল লোডুকা: নাস্তিকতার ভাবনা থেকে কোরআনের টানে ইসলাম গ্রহণ

আমেরিকান শিল্পী-লেখক ড্যানিয়েল লোডুকা: নাস্তিকতার ভাবনা থেকে কোরআনের টানে ইসলাম গ্রহণ

বঙ্গ রিপোর্ট ডিজিটাল ডেস্ক: ড্যানিয়েল লোডুকা তরুণ প্রজন্মের একজন শিল্পী ও লেখিকা। তিনি জীবনঘনিষ্ঠ ছবি আঁকেন। ইসলাম বিষয়ে লেখালেখি করেন। ২০০৩ সালে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর আরবি ও ইসলামিক স্টাডিজের ওপর বিএফএ করেছেন। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের একটি গণমাধ্যমের ফিচার লেখক হিসেবে কর্মরত আছেন।ইউরোপিয়ান বংশোদ্ভূত আমেরিকান। ক্যাথলিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি।

আমি কখনোই আল্লাহকে খোঁজার গরজ অনুভব করিনি। যখন কিছুই করার থাকত না, তখন কোনো পুরনো বই বা ভবন দেখে সময় কাটাতাম। কখনো কল্পনাও করিনি আমি মুসলমান হব। আমি খ্রিস্টানও হতে চাইনি।

যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের প্রতিই আমার তীব্র বিতৃষ্ণা ছিল। প্রাচীন কোনো গ্রন্থ আমার জীবনযাপনের পথ-নির্দেশ করবে, তা নিয়ে ভাবিইনি। এমনকি কেউ যদি আমাকে কয়েক কোটি ডলার দিয়েও কোনো ধর্ম গ্রহণ করতে বলত, আমি সরাসরি অস্বীকার করতাম।
আমার প্রিয় লেখকদের অন্যতম ছিলেন বার্টান্ড রাসেল। তার মতে, ধর্ম হলো কুসংস্কারের চেয়ে একটু ভালো, সাধারণভাবে লোকজনের জন্য ক্ষতিকর, যদিও এর ইতিবাচক কিছু বিষয়ও আছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্ম ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি জ্ঞানের পথ বন্ধ করে দেয়, ভীতি আর নির্ভরতা বাড়িয়ে দেয়। তাছাড়া আমাদের বিশ্বের যুদ্ধ, নির্যাতন আর দুর্দশার জন্য অনেকাংশে দায়ী ধর্ম।

আমার মনে হতো, ধর্ম ছাড়াই তো ভালো আছি। আমি প্রমাণ করতে চাইতাম, ধর্ম আসলে একটা জোচ্চুরি। ধর্মকে হেয় করতে আমি পরিকল্পিত কাজ করার কথা ভাবতাম।

হ্যাঁ, সেই আমিই এখন মুসলমান।
আমি ঘোষণা দিয়েই ইসলাম গ্রহণ করেছি। আর সেটা না করে উপায়ও ছিল না। আমি অনুগত হয়েছি, ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছি।

অতীতের দিকে তাকিয়ে আমি দেখি, ইসলামের পথে আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল কয়েক বছর আগে। একটি ধর্মবিরোধী প্রকল্পে কাজ শুরু করার পর। তখন কল্পনাও করতে পারতাম না, একদিন আমি কোনো ধর্ম গ্রহণ করব এবং তা পালন করব। তবে আমার ভেতর প্রচণ্ড রকম কৌতূহল কাজ করত। আমার মনে সব সময় প্রশ্ন তৈরি হতো। এমন সব প্রশ্ন, যার উত্তর জানা ছিল না। সত্যি আমি সুখী ছিলাম। হঠাৎ করেই আমি মৃত্যু ও জীবনের ছন্দঃপতন নিয়ে ভাবতে শুরু করলাম। মনে আছে, আমি দীর্ঘ সময় জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতাম আর ভাবতাম আমার আগে কত প্রজন্ম চলে গেছে এবং আমার পরেও আরো কত প্রজন্ম গত হবে।

এরপর ‘ক্রস কান্ট্রি’-এর জন্য একজন বন্ধুর সঙ্গে এক মাসের হাইকিং ও ক্যাম্পিংয়ের জন্য বের হলাম। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমি সৃষ্টির মহিমা অবলোকন করতে পারলাম। অ্যারিজোনার কোনো এক স্থান থেকে আমি মা-বাবাকে লিখেছিলাম, পৃথিবীর যে বিস্ময়কর সৌন্দর্য আমি দেখছি—একজন শিল্পী হিসেবে বলতে পারি, তার চেয়ে সুন্দর ও মহৎ কিছু আমার পক্ষে তৈরি করা সম্ভব নয়।

এই সফরের পরপরই ১১ সেপ্টেম্বরের বিভীষিকাময় হামলা হয়। শ্রেণিকক্ষের জানালা দিয়ে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে দ্বিতীয় বিমানের হামলার দৃশ্য আমি নিজ চোখে দেখেছি। আমি নিশ্চিত নই যে ১১ সেপ্টেম্বরের আগে আমি ইসলামের নাম শুনেছিলাম কি না? তবে এই সন্ত্রাসী হামলার পর জানতে পারলাম এর পেছনে একটি ভিনদেশি ধর্মকে দায়ী করা হচ্ছে—যাকে ইসলাম বলা হয়। ধীরে ধীরে ধর্মের প্রতি আমার বিদ্বেষ বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে আমি রাজনীতি, রাজনৈতিক দর্শন ও সমকালীন ঘটনাপ্রবাহের ওপর পড়াশোনা শুরু করি। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, ধর্ম মানবসৃষ্ট তা আমি প্রমাণ করব। রাজনৈতিক চিন্তা থেকেই তার জন্ম। এ জন্য ধর্মীয় সাহিত্য অধ্যয়ন শুরু করি। বাইবেল, ভগবতগীতা ও ত্রিপিটক পড়ি। এরপর কোরআন সংগ্রহ করতে ক্যাম্পাসের এমআইটিতে যাই। কয়েক মুসলিম শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয়। তারা আমাকে কোরআনের একটি অনুবাদ উপহার দেয়। এক বছর ধরে আমি একটু একটু কোরআন অধ্যয়ন করি।

গবেষণার কাজে আমি আমেরিকার দখলকৃত একটি শহরে (সম্ভবত ইরাকে) গেলাম। আমি যে শহরে ছিলাম ২০ দিন পর সেখানে কারফিউ তুলে নেওয়া হয়, যেন মানুষ খাবার সংগ্রহ করতে পারে। মানুষ রাস্তায় নেমে এলো। কোলাহলপূর্ণ একটি রাস্তায় আমি চমৎকার একটি আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমার সঙ্গে থাকা সাংবাদিককে বললাম, সংগীতটি চমৎকার। তিনি হেসে বললেন, এটি সংগীত নয়, কোরআনের তিলাওয়াত। আমি বিস্মিত হলাম। এটি সেই কোরআন—যা এক বছর ধরে আমি শুনছি এবং তা এখনো আমার কাছে সংরক্ষিত। কোরআনের শব্দমালা আমার ভেতরে প্রোথিত আকঙ্ক্ষার মতো জ্বলে উঠল। কোরআনের তিলাওয়াত এবং মুসলিমদের মধ্যে এক সপ্তাহের অবস্থানে ইসলাম সম্পর্কে জানার আগ্রহ অদম্য হয়ে উঠল। কোরআনের প্রতি আকর্ষণও প্রবল হয়ে উঠল। একসময় কোরআনে মগ্ন হয়ে গেলাম।