সরকারের পাশাপাশি নিজেদের সার্বিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে বাংলার মুসলিম সমাজের জাগরণ সম্ভব

সরকারের পাশাপাশি নিজেদের সার্বিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে বাংলার মুসলিম সমাজের জাগরণ সম্ভব

 

পাঠকের কলমে, বঙ্গ রিপোর্ট: স্বাধীনতার পরবর্তী কালে ভারতের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে যা ভারতের সর্ব সাধারনের সার্বিক উন্নয়ন হয়েছে এবং বর্তমানে ভারত বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। সামরিক দিক দিয়েও ভারত বিশ্ব দরবারে তৃতীয় স্থান দখল করে আছে। সাম্প্রতিক IMF এর রিপোর্ট অনুসারে ২০২০-২১ অর্থবর্ষে ভারতের জিডিপি বৃদ্ধি ১০.৩ শতাংশ হ্রাস হবে এবং প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ অামাদের থেকে মাথাপিছু অায়ে এগিয়ে যাচ্ছে যা সমগ্র ভারতবাসীর Standard of life কোথাও যেন কমে আসছে তা সে হিন্দু হোক বা মুসলমান। যখন সমগ্র ভারতবাসী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তখন পশ্চিম বাংলার মুসলিম সমাজ বাদ যাবে না। পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার ২৭ শতাংশ মুসলিম বসবাস করেন, এই ২৭ শতাংশ মুসলমানদের নিয়ে বাংলার সব রাজনৈতিক দল গুলি ফুটবল খেলছে সেটা না বললেও বাংলার মুসলিম সমাজ হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছে।

স্বাধীনতার পর কংগ্রেস পরে ১৯৭৭ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বামফ্রন্ট পরে বাংলার বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীও বুঝতে ভুল করেননি যে ক্ষমতায় আসতে হলে বাংলার মুসলমানদের জুজু দেখিয়েই সরকারে আসতে হবে। বাংলার মুসলমানও তথাকথিত মুসলিম দরদী মমতা ব্যার্নাজিকে বাংলার মসনদে বসালেন। ২০০৬ সালে সাচার কমিটির রিপোর্ট দেখে ভারতের বিশেষ করে বাংলার মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের কপালে ভাঁজ পড়েছিল। সমীক্ষায় জানা যাই ভারতের মুসলিমদের শিক্ষার হার মাত্র ৫৭.৩ শতাংশ, হিন্দু(৬৩.৬%), জৈন(৮৬.৪%),খ্রিষ্টান (৭৪.৩%) বৌদ্ধ (৭১.৮%) যেখানে জাতীয় শিক্ষার হার ৭৪.৪ শতাংশ। ২০১৮-১৯ সালের All India survey on higher education এর সমীক্ষা অনুসারে উচ্চ শিক্ষায় মুসলমানদের অংশ গ্রহণ মাত্র ৫.২ শতাংশ, সেখানে তপশিলি জাতি (১৪.৯%) এবং তপশিলি উপজাতি (৫.৫%) তাহলে উচ্চ শিক্ষাতেও SC ST দের থেকেও মুসলিমরা পিছিয়ে।

সালটা ছিল ২০০৬ তখন বামফ্রন্ট সরকার তারপর ২০০৭-০৮ সালে সিঙ্গুর- নন্দীগ্রাম নিয়ে বাংলার উতপ্ত রাজনীতি সেই সুযোগে ২০১১ সালে বাংলার মসনদে বসলেন তথাকথিত মুসলিম দরদী মমতা ব্যার্নাজি। সরকার ৫ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর বাংলার মুসলিম সমাজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কি অবস্থা তা The SNAP – Pratichi survey পরিচালিত ” Living reality of Muslim in WB” নামে ২০১৬ সালে একটা সমীক্ষা আমাদের সামনে আসে। এই সমীক্ষা দেখেও বাংলার সচেতন মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের চোখ চড়কগাছ। সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থীদের মধ্যে
৩২.৩০ শতাংশ মুসলিম কিন্তু সেটা মাধ্যমিক স্তরে এসে ২৫.২৭ শতাংশ আবার উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে এসে দাঁড়ায় ১৯.৮৫ শতাংশ কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় কলেজে ১১ শতাংশ ভর্তি হলেও মেরেকেটে মাত্র ২.৭ শতাংশ ছাত্রছাত্রী স্নাতক বা স্নাতকোত্তর সম্পূর্ন করেন। শিক্ষার ক্ষেত্রে মুসলিমদের এত অনীহার কারণেই বা কি! এর মূল কারন হিসাবে বলা যায় তীব্র দারিদ্রতা।

পশ্চিম বাংলার মুসলিম সমাজ কতটা দারিদ্র্যতার শিকার সেটা একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।
The SNAP-Pratichi Survey বাংলার ৯৭০১৭ টি বাড়িতে সমীক্ষা করে জানতে পেরেছে গ্রামাঞ্চলের ৮০ শতাংশ মুসলিম পরিবার মাসে ৫০০০ টাকা বা তার কম আয় করে। এতেই মুসলিম পরিবারে অভাবের স্বাদ থেমে নেই, আরো জানা গেছে গ্রামাঞ্চলের ৩৮.৩ শতাংশ মুসলিম পরিবার প্রতিমাসে মাত্র ২৫০০ টাকা বা তার কম আয় করে। কি ভাবছেন এটা তো আপনার প্রতিমাসের চা,পান সিগারেটের খরচ! ভাবুন এই আয়ে বিবি বাচ্চার ক্ষুদার্ত পেটের খাদ্য জোগাবে নাকি পেটে বিদ্যা জোগাবে!

উপরিউক্ত আলোচনায় আমরা দেখতে পেলাম বাংলার মুসলিম সমাজ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাবে অনেক পিছিয়ে। কিন্তু আমরা বাংলার মুসলিম সমাজের নেতা বলে যাদের জানি তারা কিভাবে এই অবস্থার পরিবর্তন করা যায় সে বিষয়ে কতটা সচেতন তা নিয়ে সন্দেহ আছে! আমরা দেখছি তিনারা যেন কোথাও কখনো প্রাকৃতিক দূর্যোগের গভীর অপেক্ষায় অপেক্ষিত কারণ তিনারা ঐ গরীব মানুষদের কাছে গিয়ে দু কেজি চাল, ডাল,আলু দিয়ে ছবি তুলে সোসাল মিডিয়াতে পোস্ট করবেন বা কখনো কলকাতার রাজপথে কয়েক হাজার মুসলিম যুবকদের জামায়েত করে জ্বলাময়ী ভাষণ দিয়ে পরে বড়ো নেতা হয়ে কোনো রাজনৈতিক দলের হাতের পুতুলে পরিণত হয়ে যাবেন। আপনার কি মনে হয় মুসলিম সমাজের উন্নয়ন শুধু ত্রিপল,চাল,ডাল, আলু দিয়ে সম্ভব! মুসলিম নেতাদের প্রশ্ন করুন তাঁরা কটা স্কুল কলেজ? দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য কোনো কর্মসংস্থানের ব্যাবস্থা করেছে? সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য কটা কোচিং সেন্টার পরিচালনা করে??

যাক এবার মূল কথায় আসি মুসলিম সমাজকে মূলস্রোতে নিয়ে আসতে প্রচুর অর্থ ব্যয় ও সময় সাপেক্ষ। তাই আমার মতে ছোট ছোট উদ্দেশ্য নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে, যদি মুসলিম বুদ্ধিজীবী মহল মনে করে প্রাইমারি শিক্ষা থেকে স্নাতক পর্যন্ত গরীব বাচ্চাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করবে দেখা যাবে এতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন এবং সময় সাপেক্ষ।

আমার ব্যক্তিগত মতানুসারে যে সব মুসলিম মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা ইতিমধ্যেই বিভিন্ন বিভাগে স্নাতক পাশ করে বেকারত্বের বেড়াজালে জর্জরিত, তাদের কোচিং এর ব্যবস্থা করে সরকারি চাকরিতে মুসলিমদের অংশগ্রহণ বাড়ানো। এটা মনে রাখা উচিৎ যে সব মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা এই কোচিং-এ পড়াশোনা করে সরকারি চাকরি পাবে তাদের এই কোচিং এ মুক্তহস্তে দান করতে বা কোনো গরীর বাচ্চাকে নিজের খরচায় পড়াতে কণ্ঠিত বোধ করবে না। সরকারি কাজে সিন্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা মুসলিম দের হাতে থাকা প্রয়োজন তা সম্ভব শুধুমাত্র রাজনৈতিক বা সিভিল সার্ভিস পরিক্ষার মাধ্যমেই। আজকের আলচ্য বিষয় যেহেতু রাজনৈতিক নয় তাই এটা না হয় অন্য কোনো একদিন হবে।

রাজ্য সরকার WBCS পরিক্ষার মাধ্যমে সিভিল সার্ভেন্ট নিয়োগ করে। UPSC পরিক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সারা ভারতবর্ষ জুড়ে অনেক কোচিং সেন্টার আছে যা বিনা খরচায় থাকা খাওয়া ও কোচিং এর ব্যবস্থা করে তার ফল আমরা হাতে নাতে দেখলাম এক সপ্তাহ ধরে মিডিয়াতে চলেছিল ‘UPSC জিহাদ ‘❗
এরপর দেখছি আমাদের রাজ্যে যতজন ডাক্তার আছেন তার বেশীর ভাগই আল আমিন মিশনের ছাত্রছাত্রী। এ বছরও তার ফল আমাদের ভাই বোনেরা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, যা শুধু আল আমিন মিশন থেকেই ৫০০ এর বেশি ছাত্রছাত্রী ডাক্তারী পড়ার সুযোগ পেয়েছে।

উপরিউক্ত দুটি বিষয়ের ফলাফল আমরা দেখলাম যে কোনো বিষয়ের উপর গুরুত্ব আরোপ করলে তার ফলাফল কি! আমাদের রাজ্যেও মুসলিম WBCS অফিসারের সংখ্যা খুবই নগন্য। আল আমিন মিশনও WBCS কোচিং এর ব্যবস্থা করেছে কিন্তু JEE,NEET এ যে গুরুত্ব দেয় সেই গুরুত্ব আরোপ করেনা তাই তার ফলও চোখে পড়ার মতো নয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের Ministry of Minorities Dept. আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এর মাধ্যমে ৪০ জন ছাত্রছাত্রীদের WBCS কোচিং এর ব্যবস্থা করে আসছিল কিন্তু করোনা ভাইরাস এসে রাজ্য সরকারের ক্লাবের অনুদান, দূর্গাপূজা কমিটির অনুদান,পুরোহিত ভাতার টাকা খাক না খাক WBCS কোচিং এর টাকা খেয়ে নিয়েছে তাই আর ২০২০-২০২১ সালে কোচিং দেওয়া যাবে না, কারণ দুধেল গরুরা তো এমনিতেই ভোট দেবে বেশি কথা বললে বিজেপির ভয় দেখিয়ে দেবে!

আর কত দিন বাংলার মুসলিম বুদ্ধিজীবী মহল শুধু সরকারের দয়া মায়ার দিকে চাতক পাখির মত তাকিয়ে থাকবে!
এবার তো সময় এসেছে সামগ্রিক ভাবে মুসলিম উন্নয়নের জন্য শুধু ত্রিপল, চাল,ডাল,আলু না দিয়ে UPSC এর মত WBCS এরও বিনা খরচায় মুসলিম ছাত্রছাত্রীদের জন্য কোচিং এর ব্যবস্থা করার।

কলমে: আমিরুল মল্লিক
গ্রাম- সামন্ত বেড়া
পোঃ- পিয়ার বেড়া
থানা- সোনামুখী
জেলা- বাঁকুড়া
পিন- ৭২২২০৮
(লেখার মতামত লেখকের ব্যক্তিগত).