বাবরী মসজিদ: দেশের মুসলিমরা রাজনৈতিক সন্ত্রাসের বলি হয়ে অবিচারের শিকার

বাবরী মসজিদ: দেশের মুসলিমরা রাজনৈতিক সন্ত্রাসের বলি হয়ে অবিচারের শিকার

বঙ্গ রিপোর্ট ডিজিটাল ডেস্ক: সাংসদ অধীর চৌধুরী দাবি করেছেন, ৫ তারিখে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের জায়গায় যে বিশাল রাম মন্দির নির্মাণের শিলান্যাস হবে (সংঘ পরিবারের ভাষায় ‘ভূমি-পূজন’) তাতে আমন্ত্রিত মেহমান হিসেবে আর কাউকে ডাকা হোক বা না হোক, একজনকে অবশ্যই ডাকতে হবে। আর তিনি হচ্ছেন বর্তমানে রাজ্যসভায় মনোনীত সাংসদ রঞ্জন গগৈ। কারণ রঞ্জন গগৈ সুবিচার বহির্ভূত রায় না দিলে ৫ তারিখে বাবরি মসজিদের জমিতে রাম মন্দিরের শিলান্যাস করা যেত না। সকলেই জানে, রঞ্জন গগৈ তখন ছিলেন ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি। তাই, বিরোধী দল কংগ্রেসের এক বিশিষ্ট নেতা দাবি করেছেন, যাঁর অবদানের জন্য ৫ আগস্ট বাবরি মসজিদের ভূমিতে রাম মন্দির নির্মাণের শিলান্যাস হচ্ছে, তাঁকে এই অনুষ্ঠানে দাওয়াত না দিলে চরম অন্যায় হবে। তাই বেশিরভাগ আইনবেত্তারা বলছেন, সত্যিকারের অর্থে বিচারপতি রঞ্জন গগৈ হচ্ছেন, রাম মন্দির নির্মাণের অন্যতম প্রধান কারিগর।

কারণ, প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ প্রকৃত অর্থেই এক অদ্ভুত রায় প্রদান করে যে জমিতে প্রায় ৫০০ বছর ধরে বাবরি মসজিদের অস্তিত্ব ছিল, সেই ভূমিকে দখলকারী হিন্দু পক্ষের হাতে তুলে দিয়েছেন। আর তার ফলেই ৫ আগস্ট গ্র্যান্ড রাম মন্দির নির্মাণের ‘ভূমিপূজন’ সম্ভব হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এই ভূমিপূজনে অংশগ্রহণ করার কথা রয়েছে। এক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে কী করে নরেন্দ্র মোদি একটি অন্য ধর্মের মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির নির্মাণের সূচনা করতে পারেন, তা নিয়ে অবশ্য হিন্দু-মসলিম নির্বিশেষে বহু বুদ্ধিজীবী ও আইন-বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন তুলেছেন। তবে এ সব প্রশ্ন নিয়ে সংঘ পরিবারের সদস্য থেকে সর্বোচ্চ নেতা কেউই যে জবাব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন না, তা অবশ্য বারবার প্রমাণিত হয়েছে। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হবে না বলেই সকলে আগাম জেনে নিয়েছে।

অবশ্য এই রায় বেরোবার পর পরেই ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি সহ বহু আইনবেত্তা বলেছেন, এই রায়ে সংখ্যালঘুদের প্রতি চরম অবিচার করা হয়েছে।

এই রায় বাবরি মসজিদের জমি তুলে দেওয়া হয়েছে লর্ড রামলালাকে। সুপ্রিম রামলালাকে একটি বৈধ এবং আইনসম্মত ব্যক্তি হিসাবে বিবেচনা করেছে। ২.৭৭ একর মসজিদের জমিকে রামলালার হাতে অর্পণ করেছেন। যদিও রামলালার পক্ষে জমিটির মালিক করা হয়েছে রামজন্মভূমি ন্যাসকে।

এ রায় সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের একজন সাবেক বিচারপতি এ কে গাঙ্গুলি বলেছেন, আমি খুবই হতভম্ব এবং বিচলিত বোধ করছি। ভারতের সংবিধান সকল নাগরিককে এই অধিকার দিয়েছে, যে প্রত্যেক ব্যক্তি সুবিচার পাওয়ার অধিকারী। কিন্তু এই মামলায় সংখ্যালঘুদের সুবিচার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। বিচারপতি গাঙ্গুলি আরও বলেছেন, এটাকে অস্বীকার করা যেতে পারে না, আর এটাকেও অস্বীকার করা যায় না, এই মসজিদটি (বাবরি মসজিদ) কিছু লুণ্ঠনকারী অবৈধভাবে ধ্বংস করেছে।

এ কে গাঙ্গুলি আরও বলেছেন, ‘এই তথ্য অস্বীকার করা যাবে না এবং এটাও অস্বীকার করা যাবে না, যে মসজিদটি লুণ্ঠনকারীরাই ধ্বংস করেছে। এমনকী সুপ্রিম কোর্টও তার রায়ে বলেছে, এই ধ্বংসকার্য আইনের শাসনকে চরমভাবে উল্লঙ্ঘন করেছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে স্বাভাবিক প্রশ্ন উঠবে, কাদের প্রতি অন্যায় করা হল?’ জাস্টিস গাঙ্গুলি নিজেই এর উত্তর দিয়েছেন, রায়ে সংখ্যালঘুদের প্রতিই কিন্তু চরম অন্যায় করা হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সম্বন্ধে প্রশ্ন তুলে বিচারপতি এ কে গাঙ্গুলি বলেছেন, রায়ে সুপ্রিম কোর্টই বলেছে, যেকোনও মন্দিরকে ধ্বংস করে এই মসজিদটি গড়া হয়নি। পুরাতত্ত্ব বিভাগ মসজিদের নিচে কোনও মন্দির ছিল বলে প্রমাণ পায়নি। আর এই মসজিদটি ধ্বংস করা ছিল ভারতের সংবিধানিক আইনের পুরোপুরি লঙ্ঘন। তাহলে কোন প্রমাণের ওপর নির্ভর করে বিচারপতিরা বললেন, যে হিন্দুদের ব্যাপক ধারণা হচ্ছে, যে এই জমির মালিক হচ্ছে রামলালা। সুপ্রিম কোর্টের উচিত ছিল সংখ্যালঘুদের বৈধ অধিকারকে রক্ষা করা। আর যদি সেটা না হয়, তাহলে আমাদের (নাগরিকদের) বৈধ অধিকার কোথায় যাবে।

সাংসদ আসাউদ্দিন বলেছেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত অবশ্যই সুপ্রিম বা অবশ্য পালনীয়, কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে সিদ্ধান্ত সব সময় নির্ভুল, এমনটা কিন্তু নয়।’

কপি: পুবের কলম