ধৃত হোমগার্ড এবং সিভিক ভলান্টিয়ারই আনিসের খোঁজে ওপরে ওঠেন! আসল মাথা কারা? তা নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন

 ধৃত হোমগার্ড এবং সিভিক ভলান্টিয়ারই আনিসের খোঁজে ওপরে ওঠেন! আসল মাথা কারা? তা নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন

নিউজ ডেস্ক বঙ্গ রিপোর্ট: চার জন নয়। ঘটনার রাতে আনিসের বাড়িতে গিয়েছিলেন ৯ জন পুলিশকর্মী। চার জন ভেতরে ঢুকলেও বাকি পুলিশকর্মীরা ছিলেন বাইরে, রাস্তায়। যে দু’জনকে ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁরাই সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠেছিলেন। আমতা থানার পুলিশকর্মীদের জিজ্ঞাসা করে এই তথ্যই জানতে পেরেছেন সিট–এর সদস্যরা।

 

রাজ্য পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘটনার কয়েক দিন আগে আনিস খান তাঁর ফেসবুকে একটি পোস্ট করেছিলেন। যা নিয়েই সমস্যা । সেই পোস্ট এবং তার আগে আনিসের বিরুদ্ধে হওয়া কয়েকটি মামলায় পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য খুঁজছিল।

 

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি রাতে পুলিশ জানতে পারে আনিস বাড়ি এসেছেন। সেইমতো পুলিশের একটি দল তাঁর বাড়িতে পৌঁছয়। বাইরে থেকে বেশ কয়েক বার ডাকাডাকি করার পর আনিসের বাবা সালেম খান দরজা খোলেন। এই হাঁকডাকে আনিস বুঝতে পারেন পুলিশ তাঁর খোঁজেই এসেছে। গা ঢাকা দেওয়ার জন্য তিনি সোজা তিনতলায় ছাদে উঠে যান।

 

ওই সূত্রটি জানিয়েছে, হোমগার্ড কাশীনাথ বেরা এবং সিভিক ভলান্টিয়ার প্রীতম ভট্টাচার্য এরপর সিঁড়ি দিয়ে যখন উঠছিলেন তখনই দুর্ঘটনা। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে দুর্ঘটনা জেনেও আনিসের বাবার ফোন পেয়ে পুলিশ সেই রাতে কেন গেল না। ওই সূত্রটি জানিয়েছে, যেখানে আনিসের বাড়ি, তার কাছেই একটা জলসা চলছিল। ঘটনা চাউর হয়ে গেলে এবং পুলিশ সেখানে যাওয়ার পর যদি পুলিশের ওপর হামলা হয় সেই ভয়েই ওই রাতে পুলিশ ফোন পেয়েও যায়নি। সকালের জন্য অপেক্ষা করেছে। তবে দূর্ঘটনার গল্প শোনানো হলেও আনিসের পরিবারের দাবি এটা পরিকল্পিত খুন। সেজন্য নিরপেক্ষ তদন্ত দরকার এবং বড়ো বড়ো মাথাদের গ্রেফতার করলে সব জানা যাবে।

 

আনিসের বাড়িতে এই অভিযানের বিষয়ে আমতা থানার ওসি দেবব্রত চক্রবর্তীর অনুমতি নিয়েই যাওয়া হয়েছিল বলে ওই সূত্রটি জানিয়েছে। যে পুলিশকর্মীরা ওইদিন রাতে আনিসের বাড়িতে গিয়েছিলেন তাঁরাও থানায় এসে সমস্ত ঘটনাই জানিয়েছিলেন। উত্তেজনা এড়াতেই প্রথমদিকে আনিসের বাড়ি যাওয়ার খবর পুলিশ চেপেছিল বলে ওই সূত্রটির দাবি।

 

পুলিশ-সিভিক বাহিনী আরটি ভ্যানে এসেছিল। তাও ইতিমধ্যে স্বীকার করেছে পুলিশ। তদন্তের পথেই এবার সামনে আসছে আরও বিস্ফোরক তথ্য। সারদা গ্রামের পাশে তাজপুরেই সেদিন রাতে গাড়ি রেখে আনিস খানের বাড়িতে ঢুকেছিল পুলিস-সিভিক বাহিনী। তাজপুরেই বাড়ি আমতার তৃণমূলী বিধায়ক সুকান্ত পালের।

 

বাড়ি লাগোয়া এমএনরায় হাইস্কুল চত্বরে সিসিটিভি ফুটেজ জবাব দিতে পারে অনেক কিছুই। যদিও ঘটনার ছয়দিন পরে আদৌ সেই ফুটেজ অক্ষত আছে কিনা তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ঘটনার পরে আনিস খানের বাড়ি লাগোয়া ক্লাবের সামনে নতুন আলোর স্তম্ভ বসেছে। সেখানেই তিন তিনটে সিসিটিভির ক্যামেরা লাগানো হয়েছে পুলিশের তরফে। সহজ কথায়, কে আসছে, কে যাচ্ছে, কী হচ্ছে সব নজর রাখছে পুলিশ। এদিন দুপুরে সেখানে দাঁড়িয়েই একাধিক গ্রামবাসী ক্ষোভের সঙ্গেই জানালেন, এখন এখানে সিসিটিভি লাগিয়ে কী হবে, যেখানে দরকার সেখানে কী আছে, সেসব ফুটেজ আগে দেখুক পুলিশ।

 

রাতেই আমতা থানার ওসি, পঞ্চায়েত প্রধানের পাশাপাশি তৃণমূলী বিধায়ককেও গ্রেপ্তারের দাবি তুলেছেন আনিস খানের বাবা সালেম খান। ‘আমরা থানায় গিয়েই এই দাবি জানিয়ে এসেছি আজকে’, বলেছেন তিনি।

 

শুক্রবারের সেই ভয়াবহ রাতে তৃণমূল বিধায়কের গ্রামেই গাড়ি রেখে মিনিট আটেক হাঁটা পথেই কি পুলিশ-সিভিক বাহিনী চড়াও হয়েছিল আনিস খানের বাড়িতে? গ্রামে ঢোকার সোজা রাস্তায় পশ্চিম খান পাড়ার মাঠে সেই রাতে চলছিল ধর্মীয় জলসা। নজর এড়াতেই কি তাহলে তাজপুরে বিধায়কের তল্লাটে নিশ্চিন্তে গাড়ি রেখে মধ্যরাতের ‘অপারেশন’ চালাতে হলো পুলিশকে?

 

সারদা গ্রামের দক্ষিণ খান পাড়ায় খুন হওয়া ছাত্রনেতা আনিস খানের বাড়ি। এটি কুশবেড়িয়া পঞ্চায়েত এলাকার মধ্যে পড়ে। সেই বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার দূরে তাজপুর গ্রাম। এটি তাজপুর পঞ্চায়েতের মধ্যেই পড়ে।

 

 

‘মাথা’ কোথায়? ‘মাথা’ কে? শুধু সারদা গ্রাম নয়, দক্ষিণ খান পাড়া গ্রামে পুকুর পাড়ে আনিসের বাড়ি চত্বরে ভিড় করা শত শত গ্রামবাসীর প্রশ্ন কেবল নয় এটা, গোটা রাজ্যের মানুষের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে- ‘মাথা’ কোথায়?

 

বৃহস্পতিবারই ছাত্রনেতা আনিস খান হত্যাকাণ্ডে ইতিমধ্যে ধৃত আমতা থানার হোমগার্ড কাশীনাথ বেরা এবং সিভিক ভলান্টিয়ার, আমতার পরিচিত তৃণমূল কর্মী প্রীতম ভট্টাচার্য পুলিশ হেপাজতে থেকেই সাংবাদিকদের কাছে প্রকাশ্যেই জানিয়েছেন, ‘আমাদের বলির পাঁঠা করে আনিসকাণ্ডের আগুনে জল ঢালা হচ্ছে। ওসির অর্ডারই ক্যারি করেছিলাম আমরা’। ধৃত পুলিশ কর্মীদের বয়ানেই স্পষ্ট, পুলিশই গিয়েছিল শুক্রবার রাতে আনিস খানের বাড়িতে, সিভিক পুলিশও ছিল। থানার বড়বাবুর নির্দেশেই গিয়েছিল! বারেবারে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করায় শেষমেশ চাপের মুখে এদিন রাতে আমতা থানার ওসি দেবব্রত চক্রবর্তীকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটিতে পাঠানো হয়।

 

কিন্তু আমতা থানার ‘বড়বাবু’ই এরাজ্যের বুকে সাম্প্রতিককালের সবথেকে চাঞ্চল্যকর, নৃশংস কাণ্ডের একমাত্র ‘মাথা’ কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে।

 

এখানেই সামনে আসছে তাজপুরের কালীতলা। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তেও এসেছে এই প্রসঙ্গ, গ্রামবাসীদের একাংশের অভিযোগও তাই।

 

তাজপুরেই সেদিন রাতে পুলিশের আরটি গাড়ি দাঁড়িয়েছিল। সেখান থেকেই নেমে পুলিশের পোশাকে একজন এবং সিভিক পুলিশের পোশাকে তিনজন চড়াও হয় আনিস খানের বাড়িতে।

 

ইতিমধ্যে ধৃত এবং বেপাত্তা থাকা সিভিক পুলিশের সঙ্গে তৃণমূল বিধায়কের ছবি সামনে এসেছে। বেপাত্তা থাকা সিভিক পুলিশরা এই বিধায়কের ঘনিষ্ঠ, গোটা আমতার মানুষজন জানেন। বলছেন প্রকাশ্যেই। সিভিক ঘনিষ্ঠতার ছবি ছাপিয়েই তদন্তের বাঁকে প্রবলভাবেই এবার আসছে তৃণমূলী বিধায়ক সুকান্ত পালের প্রসঙ্গ।

 

বিধায়কের বাড়ি থেকে খানিক দূরে রাতে হঠাৎ ‘অপারেশন’ চালাতে হচ্ছে পুলিশকে এবং তা তাঁকে না জানিয়েই, তৃণমূল প্রবল দাপটের জমানায় তা বিশ্বাস করা কঠিন বলেই গ্রামবাসীদের মত।

 

দক্ষিণ খান গ্রামে পাশাপাশি দু’টি পুকুরের মাঝ দিয়ে চিরে যাওয়া মাটির রাস্তা বেয়ে, পিচ রাস্তা হয়ে গলির ভিতরে আনিস খানের বাড়ি। এই বাড়ি থেকে স্থানীয় ক্লাবের পাশ দিয়ে সোজা রাস্তায় অনায়াসে চলে যাওয়া যায় তাজপুরের দিকে। আবার পুকুর পেরিয়ে পশ্চিম খান পাড়ার সামনে মাদ্রাসার গা বেয়ে বেরিয়ে যাওয়া এবড়ো-খেবড়ো মাটির রাস্তা ধরে মিনিট দশেক গেলেই তাজপুর কালীতলা। ওখানেই বাড়ি সুকান্ত পালের।

 

আনিস খানের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এটাই তাজপুর যাওয়ার সহজতম রুট! সেই রাতে এই রাস্তা দিয়েই কার্তিক প্রামানিক নামে এক সিভিক পুলিশকে ছুটতে দেখা গেছে বলেও দাবি একাংশের। আনিস হত্যা রহস্যে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে সেই অভিযোগ— বিধায়কের বাড়ির কাছেই থেমেছিল পুলিশের নৈশ টহলদারির গাড়ি। সেখান থেকেই হাঁটাপথে আনিসের বাড়ি।

শুধু তাই নয় দাবি উঠছে আনিসের মোবাইল যেমন তদন্তের আওতায়, তেমনই সেদিন রাতে থানার ওসি ও তৃণমূল বিধায়ক সুকান্ত পালের ফোনের কল রেকর্ডও খতিয়ে দেখা হোক।