রৌশনের আলোয় ভাসছে ইটাহার: চন্দ্রযান-২ অভিযানে ISRO -র একজন বিজ্ঞানী রৌশন আলী

রৌশনের আলোয় ভাসছে ইটাহার: চন্দ্রযান-২ অভিযানে ISRO -র একজন বিজ্ঞানী রৌশন আলী

বঙ্গ রিপোর্ট ডিজিটাল ডেস্ক: ইটাহারের রামনগরে চাঁদের রৌশন। চাঁদের আলোয় ভাসছে গোটা গ্রাম। খালবিল, জলাজমি আর আলপথ পেরিয়ে চাঁদ ছুঁতে গেছে এ গাঁয়েরই ছেলে রৌশন আলি। মাঝে আর মাত্র দুটি পক্ষ। তারপরই রৌশনদের পাঠানো চন্দ্রযান-২ মাটি ছোঁবে চাঁদের। স্বপ্নের উড়ান সফল। আজ তাই আনন্দ-জ্যোৎস্নায় বানভাসি গোটা গ্রাম।

প্রত্যন্ত কাদামাটির পথ পেরিয়ে ছোট্ট গ্রাম রামনগর। গ্রামের গা ছুঁয়ে ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ তোলে দুই নদী। পূর্বে সুই ,পশ্চিমে মহানন্দা। মাঠ জুড়ে সবুজ ফসল ফলে। তাই চাষবাসই প্রধান জীবিকা গাঁয়ের মানুষের। হাতে গোনা দু-একজন শিক্ষক বা সরকারি চাকরিজীবী যে নেই, তা নয়। তবে উচ্চ শিক্ষার হার যৎসামান্য। ইটাহার থানার কাপাসিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের এই অখ্যাত রামনগরেই জন্ম মহাকাশ বিজ্ঞানী রৌশন আলির। বাবা মৈফুদ্দিন আহমেদ স্বাস্থ্য দফতরের অবসরপ্রাপ্ত কর্মী। চূড়ামণ প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মী ছিলেন তিনি। মা আনেশা বিবি নিতান্তই গ্রাম্য বধূ। চার ভাইবোনের টানাটানির সংসারেই বড়ো হয়ে ওঠা রৌশনের।

হালের সু-টাই বাঁধা কিডসদের মতো কোনও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়েননি রৌশন। গ্রামের পাঠশালাতেই প্রাথমিক শিক্ষা। লণ্ঠনের মৃদু আলোয় মাটির দাওয়ায় বসে যখন সহজপাঠ মুখস্থ করত ছোট্ট ছেলেটা, ডোবার ধারে ঝোপঝারের অন্ধকারে তখন জোনাকিরা ঝিকমিক করত। কৃষ্ণপক্ষ চলে গেলে চাঁদ উঠত বাঁশবাগানের মাথায়। তখন কি অবচেতনেও কখনও ভেবেছিল, ভবিষ্যতে সেই চাঁদই হবে তাঁর গবেষণার বিষয় ? পাঠশালার পাঠ চুকিয়ে চার কিলোমিটার দূরে চূড়ামণ প্রহ্লাদচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন রৌশন। মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা এই স্কুলেই। বাবা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যেতেন সাইকেল চালিয়ে। প্রথম প্রথম কিছুদিন বাবার সাইকেলে উঠেই স্কুলে যেত রৌশন। পরের দিকে চার কিলোমিটার পথ হেঁটেই হাজির হত স্কুলে। ১৯৯৩ সালে মাধ্যমিক পাশ করার পর রৌশন বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক ও পিওর সায়েন্স নিয়ে স্নাতক পাশ করেন তৎকালীন রায়গঞ্জ ইউনিভার্সিটি কলেজ থেকে। এর পর মালদা পলিটেকনিক থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স করেন তিনি। স্বপ্নের হাতছানি আসে এর পরেই।

দূরভাষে রৌশন জানান, “ইসরোতে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে লোক নেওয়া হবে বলে একটি বিজ্ঞাপণ দেখে আমি আবেদন জানিয়েছিলাম। তারপর নির্দিষ্ট পরীক্ষা ও অন্যান্য টেস্টে উত্তীর্ণ হয়ে এই সংস্থায় গবেষণার সুযোগ পাই।”
ইসরোতে নিয়োগের পর সেখান থেকেই বি-টেক পাশ করেন রৌশন। এখন গবেষণার পাশাপাশি সেখানে এম-টেক পড়ছেন তিনি। চন্দ্রযান-২ “বাহুবলী” মহাকাশে পাঠানোর ক্ষেত্রে কী ভূমিকা ছিল তাঁর ? সরকারি গোপণ তথ্য যাতে ফাঁস হয়ে না যায় তার জন্য বাইরে বিস্তারিত কিছু জানানো বারণ। তাই প্রয়োজনীয় গোপনীয়তা বজায় রেখেই রৌশন শুধু বলেন, চন্দ্রযান-২ এর মেকানিক্যাল ও টেকনিক্যাল দিক সামাল দেওয়াই ছিল তাঁর দায়িত্ব। তাঁর সহযোগী হিসেবে ওই দায়িত্বে ছিলেন আরও ৯ জন বিজ্ঞানী।

গত সোমবার বাহুবলীর উৎক্ষেপণের খবর পৌঁছেছিল রৌশনের গ্রামের বাড়িতেও। বাবা মৈফুদ্দিন ও মা আনেশা সহ পরিবারের সকলেই টিভিতে দেখেছিলেন চন্দ্রযান-২ এর উড়ান। কিন্তু তাঁদের ঘরের ছেলে যে কতবড় একটি ঐতিহাসিক মুহুর্তের সাক্ষী, তা হয়তো অনুধাবন করতে পারেননি অজ গাঁয়ের এই মানুষজন। তাই খবরটি সংবাদ মাধ্যমের কাছে যথাসময়ে সঠিক ভাবে এসে পৌঁছায়নি। খবর যখন পৌঁছাল, তখন শ্রীহরিকোটার মাটি ছেড়ে রকেট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চন্দ্রযান-২ মহাকাশে পাক খাচ্ছে পৃথিবীর চারপাশে তারই কক্ষপথে।

ছোট থেকে কোলেপিঠে তো বটেই, পড়াশোনার দেখভাল করেও রৌশনকে মানুষ করেছেন তাঁর মামা গোলাম রব্বানি। পেশায় প্রাথমিক শিক্ষক হলেও গৃহশিক্ষতার সৌজন্যে বিজ্ঞানের ছাত্রও পড়ান রব্বানি। তাঁর কথায়, “ভাগ্নে প্রথম থেকেই মেধাবী ছাত্র ছিল। ঘোর গ্রামের অত্যন্ত প্রতিকুল পরিবেশে কষ্ট করেই পড়াশোনা করতে হয়েছে তাকে। আজ সে এমন একটি ঐতিহাসিক গবেষণায় সাফল্যের অংশীদার হয়েছে দেখে খুব ভাল লাগছে।”

তাঁর চিরকালীন পোশাক ঢোলা পাজামা আর ফতুয়াটা গায়ে চড়িয়ে বাবা মৈফুদ্দিন বললেন, “ছেলের জন্য গর্ব বোধ হচ্ছে। আমরা চিরকাল মাটিতে চোখ রেখে খেটে খাওয়া মানুষ। আমাদের ঘরের সন্তান যে এরকম মহাকাশের দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখবে বা চাঁদ নিয়ে গবেষণা করবে তা কোনওদিন কল্পনাও করিনি।”

ছেলের এই সাফল্যে কেমন লাগছে ? রত্নগর্ভা আনেশা নিরুত্তর। ফোর পাশ মায়ের মুখে শুধু চাঁদের হাসি। সেই হাসি ছড়িয়ে পড়ছে রামনগরের মুখে মুখে, মহানন্দার সাদা বালুর চরে। গোটা রামনগর এখন অধীর অপেক্ষায় — কবে ফিরবে গ্রামের সেই “চাঁদ কা টুকরা”।