ইংরেজদের ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও রাঁধুনি বটুক মিঞার সততার জন্য গান্ধীজি মৃত্যু থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন

ইংরেজদের ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও রাঁধুনি বটুক মিঞার সততার জন্য গান্ধীজি মৃত্যু থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন

বঙ্গ রিপোর্ট ডিজিটাল ডেস্ক: ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি দিল্লির বিড়লা হাউসে গুলিবিদ্ধ হন জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী। সান্ধ্য প্রার্থনা সভা চলাকালীন নাথুরাম গডসে গুলি করেন মহাত্মাকে। কয়েক ঘণ্টা পরে জহরলাল নেহেরু ঘোষণা করেন, ‘আমাদের জীবন থেকে আলো চলে গেছে।’

টানা একবছর বিচার পর্ব চলার পর ১৯৪৯ সালের ১৫ নভেম্বর মহাত্মাকে হত্যা করার অপরাধে নাথুরাম গডসে এবং সহ-ষড়যন্ত্রকারী নারায়ণ আপ্তের ফাঁসির সাজা শোনায় আদালত। এদের নিয়ে চর্চা কম হয়নি। কিন্তু খুব কমই আলোচনায় এসেছে এক রাঁধুনির নাম যিনি শুধু মহাত্মার জীবন বাঁচাননি, তার জন্য কড়া মূল্য চুকিয়েছেন।

১৯১৭ সালের ১৫ এপ্রিলের দুপুর। বিহারের মতিহারি রেল স্টেশনে ভিড় জমিয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। মুজাফরপুর থেকে আসা ট্রেন থেকে দুপুর ৩ টের সময় স্টেশনে নামলেন মহাত্মা গান্ধী। জমির মালিকেরা জোর করে এলাকার কৃষকদের নীল চাষে বাধ্য করছিল। সেই খবর পেয়ে চাষীদের অবস্থা সরেজমিনে দেখতে এসেছিলেন গান্ধী।

‘চম্পারনের স্বতন্ত্র সেনা’ বই থেকে জানা যায়, সেদিন গান্ধীজির রাতের খাবারের নিমন্ত্রণ ছিল ব্রিটিশ ম্যানেজার আরউইনের বাসায়। এই ইংরেজ গান্ধী হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। ইংরেজদের পাকা ধানে মই দেওয়ায় আরউইন চেয়েছিল বিষ মেশানো খাবার খাইয়ে মহাত্মাকে হত্যা করতে। সেই মতো আরউইন তাঁর রাধুনি বটুক মিঞাকে নির্দেশ দেন গান্ধীকে বিষ মেশানো দুধ পরিবেশন করতে। এই কাজের জন্য অনেক টাকার লোভ দেখানো হয়েছিল বটুক মিঞাকে। এমনকি কাজ না করলে কঠোর শাস্তি দেওয়ার ভয়ও দেখানো হয়।

যখন সময় এল বটুক দুধ পরিবেশন করল। সঙ্গে ইঙ্গিতে গান্ধীকে জানিয়ে দেন দুধে বিষ মেশানো আছে। খেলেই সাক্ষাৎ মৃত্যু। গোটা ঘটনার সাক্ষী ছিলেন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ।ঘটনা বুঝতে পেরে দুধ খেতে অস্বীকার করেন গান্ধী। সে যাত্রা প্রাণ বাঁচে তাঁর। এতেই ইংরেজ আরউইনের সন্দেহ হয় রাঁধুনির ওপর। বটুককে চাকরি থেকে ছাঁটাই করে কারাগারে নিক্ষেপ করে আরউইন। চলতে থাকে অসহ্য নির্যাতন। বিহারের মোতিহারিতে বটুকের বাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় ব্রিটিশ সেনা। তাঁর পরিবারকে করা হয় গ্রামছাড়া।

সাহসী দেশপ্রেমিক বটুক মিঞার এই আত্মত্যাগ আড়ালেই ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মোতিহারি স্টেশন পরিদর্শনে আসেন রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ। তাঁকে দেখতে ভিড় জমিয়েছিল লক্ষ জনতা। হঠাত রাজেন্দ্র প্রসাদ লক্ষ্য করেন সেই ভিড় ঠেলে তাঁর দিকে এগিয়ে আসতে চাইছেন এক বৃদ্ধ। সেই বুড়ো মানুষটিকে চিনতে ভুল করেননি রাষ্ট্রপতি। এক ঝলকেই তিনি চিনতে পারেন বটুক মিঞাকে। তারপর? রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ নিজে ভিড় ঠেলে এসে জড়িয়ে ধরেন বৃদ্ধ বটুককে। মঞ্চে এনে তাঁকে বসান রাষ্ট্রপতির পাশের চেয়ারে।উপস্থিত জনতা কৌতূহলী হয়ে ওঠে।

কে এই বৃদ্ধ? স্বয়ং রাষ্ট্রপতি কিনা আদর করে মঞ্চে তুললেন তাঁকে! উপস্থিত জনতার কৌতূহল নিরসন করলেন রাজেন্দ্র প্রসাদ। গোটা ঘটনার বর্ণনা করেন রাষ্ট্রপতি। জানান, এই বৃদ্ধের জন্যই জাতির জনকের প্রাণ বেঁচেছিল একদিন। জাতির জন্যে এই আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে বটুক এবং তাঁর ৩ সন্তানকে জমি দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু আজও তা রয়ে গেছে খাতায় কলমে। বটুকের নাতি এখনও সরকারি সাহায্যের অপেক্ষায়।

এরপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। গান্ধির মৃত্যু হয়েছে। রাজেন্দ্র প্রসাদও চলে গিয়েছেন। বিনা স্বীকৃতিতেই মারা গেছেন বটুক মিঞাও। স্বাধীনতা সংগ্রামীর তাম্রপত্রও জোটেনি বীর বটুকের কপালে। জোটেনি এক ছটাক জমিও। ২০১০ সালে রাঁধুনি বটুকের কাহিনী প্রকাশ করে হিন্দুস্থান টাইমস। নড়েচড়ে বসে ভারত সরকার। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রতিভা প্যাটেল বটুকের বিষয় জানতে চেয়ে রিপোর্ট চেয়ে পাঠান। কিন্তু সেই রিপোর্টও আটকে গেছে লাল ফিতের গেরোয়।

জন্মভিটে মোতিহারির আজাগরি গ্রামে অযত্নে পরে রয়েছে বটুক এবং তাঁর স্ত্রীর কবর। বাল্মীকি টাইগার রিজার্ভ ফরেস্টের কাছে এক টুকরো জমিতে ঘর বেঁধে আছেন বটুকের নাতি। মজুরের কাজ করে কোনওরকমে দিন গুজরান হয় তাঁর। সেসময় যদি বটুক মিঞা না থাকতো তবে ভারতের ইতিহাস অন্যরকম হত।’ কিন্তু ইতিহাসে আজ উপেক্ষিত এরা।