সংখ্যালঘুদের ন্যায় পাওয়া কঠিন! বাবরি মসজিদ নিয়ে কলম ধরলেন রাম পুনিয়ানী

    সংখ্যালঘুদের ন্যায় পাওয়া কঠিন! বাবরি মসজিদ নিয়ে কলম ধরলেন রাম পুনিয়ানী

     

    বঙ্গ রিপোর্ট ডিজিটাল ডেস্ক: ৬ ডিসেম্বর ১৯৯২-এর মতোই ৯ই নভেম্বরও এক মাইলফলক হয়ে গেল। ছয়ই ডিসেম্বর দিনের আলোয় যে মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছিল, তাকে রক্ষা করার জন্য বিজেপি নেতা এবং উত্তর প্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিং সুপ্রিম কোর্টে লিখিত আশ্বাস দিয়েছিলেন। যারা দেশের আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মসজিদ ভেঙেছিল, তাদের ইচ্ছাপূরণ করে ৯ই নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট মসজিদের জমিতেই বিশাল রামমন্দির নির্মাণের রাস্তা পরিষ্কার করে দিয়েছে।

    সম্ভবত এটাই প্রথম, যখন ঘোষিত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ভারতে সরকারি দেখভালে কোনও মন্দির তৈরি হবে। এটা কি সেই সাধারণতন্ত্র, ১৯৫০ সালে যার প্রতিষ্ঠা আমরা করেছিলাম?

    স্বাধীনতার পরেই দাবি উঠেছিল সোমনাথ মন্দির পুনর্নির্মাণের, যা মহমুদ গজনী প্রায় ধ্বংস করেছিলেন। রাষ্ট্রের তা ফের নির্মাণ করা উচিত, এমন দাবি ওঠে। গান্ধীজী সেই সময় বলেছিলেন, হিন্দুরা নিজেদের মন্দির নির্মাণ এবং পুনর্নির্মাণের কাজ নিজেরাই করতে সক্ষম। সরকার তা মেনে নিয়েছিল।

    যদিও কয়েকজন ক্যাবিনেট মন্ত্রী ওই বেসরকারি ট্রাস্টের সদস্য হয়েছিলেন, যে ট্রাস্টকে পুনর্নির্মাণের কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। মন্দির পুনর্নির্মাণের পর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি হিসাবে রাজেন্দ্র প্রসাদের উপস্থিত থাকার প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নেহরু।

    আজকে যা হচ্ছে তাতে স্পষ্ট যে, ধর্ম আমাদের রাষ্ট্রের ব্যবস্থার অন্দর পর্যন্ত অনুপ্রবেশ করেছে। উলটোদিক থেকে বললে এটাই সত্য যে, বেশ কিছু ক্ষেত্রে ধর্ম, সরকারের নীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে গেছে।
    বাবরি মসজিদ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের সংবিধান বিশেষজ্ঞরা এবং রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা এবং বিশ্লেষণ করবে। এটা স্বস্তি এবং প্রসন্নতার বিষয় যে এই রায়ের পরে দেশের কোথাও গণ্ডগোল বা হিংসা হয়নি। দেশের সবথেকে বড় রাজনৈতিক দল এবং বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলগুলি এই রায়কে মেনে শুধু নেয়নি, বরং একে ‘ভারসাম্যমূলক’ বলে স্বাগত জানিয়েছে। এই রায় কিভাবে এবং কেন ‘ভারসাম্যমূলক’ তা বোঝা কঠিন।

    মাননীয় বিচারপতিরা এটা মেনে নিয়েছেন যে, ওই মসজিদে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত নমাজ পড়া হতো। তাঁরা এটাও মেনেছেন যে মন্দিরের মূল গম্বুজের নিচে লুকিয়ে চুরিয়ে রামলালার মূর্তি রাখা হয়েছিল এবং তা অপরাধ হয়েছিল। বিচারপতিরা একথাও বলেছেন যে, মসজিদ ধ্বংস করা অপরাধ ছিল এবং তারপর সেখানে যে অস্থায়ী মন্দির বানানো হয়েছিল তা আদালতের স্থিতাবস্থা বজায় রাখার সিদ্ধান্তের বিরোধী।

    এটা খুবই মজাদার, যে রাজনৈতিক শক্তিগুলি এবং ব্যক্তিরা এই তিনটি অপরাধই করেছিল তারা সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে অত্যন্ত খুশি এবং বলছে, এটা প্রমাণ হয়ে গেল আমরা সঠিক ছিলাম। লালকৃষ্ণ আদবানিও এটাই বলেছেন। আদালত মন্দির নির্মাণের দায়িত্ব সরকারকে দিয়েছে কিন্তু মসজিদ নির্মাণের দায় সম্প্রদায়ের উপর ছেড়েছে।

    প্রাক্তন বিচারপতি অশোক গাঙ্গুলি একেবারেই সঠিক বলেছেন, ‘সংবিধানের ছাত্র হিসাবে আমার পক্ষে এই রায় মেনে নেওয়া মুশকিল।’ বিশিষ্ট সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং এনএএলএসএআর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফৈজান মুস্তফার মতে ‘অযোধ্যার রায় সাক্ষ্যবিধির ক্ষেত্রে একটি বড় ধাক্কা’।
    ২০১০ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট রায় ঘোষণার সময়ে বলেছিল, হিন্দুদের বিশ্বাস যে ওখানে রাম জন্মেছিলেন।

    হাইকোর্ট বিতর্কিত জমিকে তিন ভাগে ভাগ করে দেয়। সুপ্রিম কোর্টও এটা মেনেই চলেছে যে হিন্দুদের বিশ্বাস রাম ওখানেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু এই রায়ে যেটা ভিন্নতর, সেটা হলো সুপ্রিম কোর্ট এটা মানেনি যে মসজিদের জায়গায় একটা মন্দির ছিল এবং বাবরের সেনাপতি মীর বাকি তা ধ্বংস করেছিল। আর্কিওলকিজ্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার রিপোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, ওখানে আগে একটা অ-ইসলামিক কাঠামো ছিল কিন্তু সেটা রামমন্দির ছিল এবং তা ধ্বংস করে মসজিদ নির্মাণ হয়েছিল এইরকম কোনও প্রমাণ নেই।

    সুপ্রিম কোর্টের মূল যুক্তি হলো, মুসলিম পক্ষের থেকে এটা প্রমাণ করা যায়নি যে মসজিদের ভিতরের অংশে নমাজ পড়া হতো। এই যুক্তি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না, কারণ ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত এই জায়গাকে সকলেই মসজিদ বলে মানতো। অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্ট এই কথা বলেছে মসজিদের বাইরের প্রাঙ্গণ হিন্দুদের দখলে ছিল এটা তৎকালীন পর্যটকদের বিবরণ এবং অন্য প্রমাণ থেকে প্রতিষ্ঠা করা গেছে। সুতরাং, ওই স্থানে হিন্দুদের দাবি বৈধ।

    এই রায় হয়তো সমকালীন ভারতের একটি দুঃখজনক অধ্যায়কে বন্ধ করবে। রামমন্দির বিবাদই বিজেপি-কে একটা ছোট্ট দল থেকে দেশের সব থেকে বড় দলে পরিণত করেছে। সঙ্ঘ পরিবার লাগাতার এই প্রচার করেছে যে, মুসলিম শাসকরা মন্দির ভেঙেছে এবং রামমন্দিরের ধ্বংসস্তূপের ওপরে বাবরি মসজিদ তৈরি হয়েছে। এই প্রচার সমাজে মুসলিমদের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়েছে। এটা স্বস্তির যে, সুপ্রিম কোর্টের রায় এই অপপ্রচারকে ভুল প্রমাণ করেছে।

    এখন আমাদের দেশকে ১৯৯১ সালের আইনকে কার্যকর করা প্রয়োজন, যেখানে বলা হয়েছে ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট অনুযায়ী ধর্মীয় স্থলের স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে হবে। বাবরি মসজিদ ভাঙার সময়ে সঙ্ঘ পরিবারের স্লোগান ছিল, ‘ইয়ে তো কেবল ঝাঁকি হ্যায়, কাশী-মথুরা বাকি হ্যায়।’ এই স্লোগানকে চিরকালের মতো সমাধি দেওয়া প্রয়োজন। বিজেপির কাশী-মথুরা বলা বিনয় কাটিয়ারের মতো লোকেদের থেকে দূরত্ব তৈরি করা উচিত। তাহলেই আমরা দেশকে ওই রক্তপাত এবং উত্তেজনা থেকে বাঁচাতে পারব, যা বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময়ে হয়েছিল।

    এই সিদ্ধান্ত থেকে এটাও স্পষ্ট হয়েছে যে সংখ্যাগুরুবাদী রাজনীতিতে দেশে এমন বাতাবরণ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে যে, সংখ্যালঘুদের ন্যায় পাওয়া মুশকিল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সঙ্ঘ পরিবার যারা ক্ষমতায় আসার জন্য এ ধরনের বিষয়কে সামনে এনে দেশকে বিভাজিত করে এসেছে, এটা দেখার তারা সেখান থেকে সরে আসে কি না।

    সৌজন্যে:গণশক্তি