একজন শিক্ষাবিদ ও ধর্মনিরপেক্ষ শাসক ছিলেন সম্রাট আওরঙ্গজেব

একজন শিক্ষাবিদ ও ধর্মনিরপেক্ষ শাসক ছিলেন সম্রাট আওরঙ্গজেব

–তৈয়ব আলি মোল্লা

সম্রাট আওরঙ্গজেব ছিলেন মুঘল সম্রাটদের মধ্যে একজন বিদগ্ধ ও শিক্ষাবিদ ব্যক্তিত্ব।তিনি কোরআন, হাদীস ,ইসলামী দর্শন ও বিজ্ঞান গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন। ফলস্বরূপ তিনি “ফতোয়া এ আলমগিরি” রচনা করতে সমর্থ হন যা আজও প্রাসঙ্গিক।মুঘল সম্রাটদের মধ্যে তিনিই প্রথম যিনি শিক্ষার প্রসার ও উন্নয়নের জন্য শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিলেন ।( সূত্র–বিএড কলেজের পিএইচ ডি অধ্যাপক কতৃক ভাষণ)। দাক্ষিণাত্যে অবস্থানকালে তিনি গুজরাটের একটি বিস্তৃত অঞ্চলের শিক্ষার অনগ্রসরতার খবর পান। তিনি উক্ত অঞ্চলের শিক্ষার প্রসার ও উন্নতিকল্পে কয়েকজন দক্ষ রাজকর্মচারী নিয়ে একটি কমিশন গঠন করেন। পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা করে তার একটি রিপোর্ট তাঁর নিকট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন ।কমিশন নিরপেক্ষতার সঙ্গে সমীক্ষা করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সম্রাটের নিকট রিপোর্ট পেশ করেন ও নির্দিষ্ট সুপারিশ করেন। সম্রাট একজন দক্ষ স্পেশাল অফিসার কে সুপারিশ কার্যকরী করার জন্য পরিকল্পনা রচনা করতে নিয়োগ করেন। সম্রাট সুপারিশ কার্যকরী করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ফলে তাঁর শাসনকালে সেই এলাকায় শিক্ষার প্রসার ও উন্নয়ন হয়। তাঁর শাসনকাল ছিল (১৬৫৮–১৭০৭)। এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ ওঐতিহাসিক কার্যক্রম। আজও সমান প্রাসঙ্গিক। স্বাধীন ভারতে শিক্ষার উন্নয়ন ও প্রসারের জন্য বিভিন্ন সময়ে মুদা লিয়ার ,তারাচাঁদ ,Kothari প্রভৃতি কমিশন নিয়োগ করা হয়েছিল। তাঁদের সুপারিশ কার্যকরী করার মধ্য দিয়ে আধুনিক ভারতে বিজ্ঞান,প্রযুক্তি ও সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটেছে ।

 

শিক্ষাবিদ না হলে তাঁর শাসনকালে (১৬৫৮–১৭০৭)কোনো অঞ্চলের শিক্ষার অনগ্রসরতা নিয়ে ভাবতেন না ও কমিশন নিয়োগ করতেন না। এখানেই অন্যান্য মুঘলশাসকদের সঙ্গে আওরঙ্গজেব এর পার্থক্য।। ধর্মনিরপেক্ষ শাসক —–মুঘল সম্রাটদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচাইতে ধর্মনিরপেক্ষ শাসক। ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার আওরঙ্গজেব সম্পর্কে বিভিন্ন সমালোচনা করলেও তাঁর প্রশাসন ব্যবস্থার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।একমাত্র তিনিই প্রথম যিনি প্রশাসন ব্যবস্থায় যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগের দৃঢ়তা দেখিয়েছেন। তিনি নিজে মুসলিম শাসক হলেও এক্ষেত্রে কোনো সমঝোতা করেননি।দরবারের আমীর ওমরাহের সুপারিশ এর সঙ্গে কোনো সমঝোতা করেননি। তাঁর প্রশাসন ব্যবস্থায় হিন্দুদের বড়ো অংশ নিয়োগ পেয়েছেন যোগ্যতার ভিত্তিতে। ১৬৫৮ সনের ৩১ জুলাই যখন পিতা শাহজাহান আগ্রা দুর্গে বন্দি করেন তখন তাঁর হিন্দু রাজকর্মচারীর সংখ্যা ছিল ২১.৬%। পরবর্তী কালে ক্রমশই বাড়তে বাড়তে ৩১.৬%(এক তৃতীয়াংশ)।তিনি হিন্দুবিরোধী প্রমান হয় ? তাঁর সাম্রাজ্যের প্রশাসন পরিচালনায় নীতি নির্ধারকদের মধ্যে হিন্দুকর্মচারীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অর্থবিভাগের শীর্ষে ছিলেন দুজন হিন্দু কর্মচারী। যাঁরা তাঁর সিদ্ধান্তের সমালোচনাকরতেন তাঁদের শরীয়ত দিয়ে মোকাবিলা করতেন।তিনি বলতেন –সুযোগ্য ব্যক্তিকে নিযুক্ত করার কথা শরীয়তে আছে।তিনি বলতেন–যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ধর্ম কোনো মাপকাঠি হতে পারে না। দীর্ঘ ৫০ বৎসরের রাজত্বকালে যে সমস্ত হিন্দুব্যক্তিত্ব গুরুত্বপূর্ণ পদ অলংকৃত করেছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন যশোবন্ত সিং ,জয় সিং প্রভৃতি।যশোবন্ত সিং ,জয় সিং গুরুত্বপূর্ণ সেনাপতি পদে ছিলেন। ঐতিহাসিক রামসরণ শর্মা তাঁর গ্রন্থে দেখিয়েছেন সম্রাট আকবরের শাসনকালে(১৫৫৬–১৬০৫) “এক হাজারী” এবং তার চাইতে অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন মনসবদার ৪৭ জন। হিন্দু ছিলেন ১৪ জন। জাহাঙ্গীর এর রাজত্বকালে (১৬০৫-১৬২৫) তিন হাজারী এবং তার চাইতে উঁচু মানের মনসবদার ছিলেন ৪৭ জন। মাত্র ৬জন হিন্দু ছিলেন।আওরঙ্গজেব এর পিতা শাহজাহানের (১৬২৭–১৬৫৮)মোট মনসবদার ছিলেন আট হাজার।যার মধ্যে এক হাজারী ও তার বেশী ক্ষমতা বিশিষ্ট ২৪১ জন। ৫১ জন হিন্দু ছিলেন। আর “হিন্দুবিদ্বেষী” বলে পরিচিত আওরঙ্গজেব এর শাসনকালে (১৬৫৮–১৭০৭)মনসবদারদের সংখ্যা বেড়ে ১৪৫৫৬ জন।তাঁদের মধ্যে হিন্দু ছিলেন ১৪৮ জন।বিভিন্ন ঐতিহাসিক গবেষণায় প্রমাণিত সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে হিন্দু রাজকর্মচারীর সংখ্যা ছিল ২২.৪%.আওরঙ্গজেব এর পিতার শাসনকালে ২৪.৫%.আওরঙ্গজেব এর সময় বেড়ে ৩১.৬% . কী প্রমান হয় ?৫০ বৎসরের রাজত্বকালে তিনি বহু মন্দির ও মসজিদ তৈরিতে সরকারী কোষাগার থেকে আর্থিক সাহায্য করেছেন। আবার কিছু মসজিদ ও মন্দিরধ্বংস করেছেন রাজনৈতিক কারণে ,যাঁরা মসজিদ ও মন্দির কে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন। উদাহরণ স্বরূপ গোলকুন্ডার নবাব প্রজাদের নিকট থেকে যথাযথ ভাবে খাজনা সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু নবাব সম্রাট আওরঙ্গজেব কে খবর পাঠালেন যে প্রজারা প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য খাজনা দিতে পারেনি। তাই তিনি খাজনা দিতে পারবেন না। সম্রাটের সন্দেহ হয়। তিনি গোয়েন্দা লাগিয়ে জানতে পারলেন যে প্রজারা যথারীতি খাজনা দিয়েছেন। কিন্তু নবাব মিথ্যা বলছেন। তিনি জানতে পারলেন যে একটি মসজিদের অভ্যন্তরে খাজনার অর্থ লুক্কায়িত আছে। ফলে সম্রাট নবাবের বিরুদ্ধে অভিযান চালান ও মসজিদের অভ্যন্তরথেকে লুক্কায়িত খাজনা উদ্ধার করেন ,ফলে মসজিদ ধ্বংস হয়। তিনি ভারতবর্ষের বহু প্রসিদ্ধ মন্দির তৈরীতে আর্থিক সাহায্য করেছেন। শুধু তাই নয় মন্দির পরিচালনার জন্য হাজার হাজার একর নিস্কর জমি দেবত্র করেছেন। তিনি যদি শুধু মন্দির ধ্বংস তাহলে ৫০ বৎসরের রাজত্বকালে ভারতের মন্দিরগুলো স্বমহিমায় থাকতো কী?
তিনি “জিজিয়া কর ” চাপিয়ে ছিলেন বলে অনেকে সমালোচনা করেন।কিন্তু ” জিজিয়া কর” কোনো ধর্মীয় কর নয়। ইহা সামরিক ট্যাক্স।এটা সবার উপর প্রযুক্ত ছিল না। যাঁরা সামরিক ক্ষেত্রে সাহায্য করতেন না ,তাঁদের রাষ্ট্রের কারণে কর দিতে হতো।মুসলিমদের উপর “যাকাত ” বাধ্যতামূলক ছিল। আওরঙ্গজেব এর উপর যে সমস্ত সেরা ঐতিহাসিক গণ গবেষণা করেছেন,যেমন ডঃরাম পুনিয়ানী , ডঃ আন্দ্রে ট্রাসকে ,ডঃ রিচার্ড ইটন ,ডঃ রামসরণ শর্মা , ডঃ ইরফান হাবিব প্রমুখ। তাঁরা লিখেছেন যে আওরঙ্গজেব ধর্মভীরু ছিলেন। কিন্তু হিন্দু বিরোধী ছিলেন না। আসলে কিছু ঐতিহাসিক সম্রাট বাবর ও আওরঙ্গজেব কে হিন্দু বিদ্বেষী হিসাবে দাগিয়ে হিন্দু-মুসলিম মেরুকরণের অপচেষ্টা করে ।আওরঙ্গজেব এর উপর নিরপেক্ষ অধ্যয়ন প্রয়োজন। তবে তাঁকে বিচার করতে সমর্থ হবেন। অন্যথায় পথভ্রষ্ট হয়ে বিপথে চালিত হবেন ।।
(“বাংলার রেনেসাঁ ” পত্রিকায় ঐতিহ্য সংখ্যা-2022(বাদশাহ আওরঙ্গজেব) 5ই জানুয়ারীতে উপরোক্ত লেখাটি প্রকাশিত।)