ঘুটিয়ারী শরীফে ঐতিহাসিক গাজী বাবার মেলা উপলক্ষে ভীড় এড়াতে আগেই পরিদর্শনে মন্ত্রী গিয়াসউদ্দীন

    ঘুটিয়ারী শরীফে ঐতিহাসিক গাজী বাবার মেলা উপলক্ষে ভীড় এড়াতে আগেই পরিদর্শনে মন্ত্রী গিয়াসউদ্দীন

    সেলিম হাসান, বঙ্গ রিপোর্ট, ঘুটিয়ারি, ক্যানিংঃ ঐতিহাসিক ১৭ই শ্রাবনের দিন আধ্যাত্মিকতা পীর সৈয়দ শাহ মোবারক গাজী (গাজী বাবার) ঔরষ (মেলা) উপলক্ষে ভিড় এড়াতে রাজ্যের সংখ্যালঘু দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী গিয়াস উদ্দিন মোল্লা আগেভাগেই চাদর জড়িয়ে ফুল দিলেন পবিত্র গাজী বাবার মাজারে। কথিত আছে, বাদশাহ চন্দন সাহার ছেলে মধ্যযুগের পীর হজরত গাজী সৈয়দ মূবারক আলি শাহ(গাজীবাবা)ছিলেন দিল্লী নিবাসী। বেলে গ্রামের আদমপুরের জঙ্গলে তাঁর জন্ম। খুব ছোট্টবেলা থেকে তিনি ছিলেন সংসার বিমূখ।তাঁর দুটি পুত্র সন্তান জন্মেছিল। দুঃখী গাজী ও মেহের গাজী। মহান ‘আল্লাহ’র নৈকট্য লাভের আশায় সৈয়দ মোবারক শাহ গাজী সংসার ত্যাগ করে ঘুরতে ঘুরতে ঘুটিয়ারী শরীফের কাছে বিদ্যধরী নদীর তীরে নারায়ণপুর গ্রামে আশ্রয় নেন। “তারাহেদে” নামে একটি দিঘীর পাড়ে আস্তানা গাড়েন।

    জানা যায় তৎকালীন জমিদার রামচন্দ্র চাটুর্জ্যে তাঁকে এলাকা থেকে বিতাড়িত করেছিলেন। পরে তখনকার দিনে ধোয়াঘাটা নামক এলাকায় গিয়ে হেলা খাঁ নামে অপর এক জমিদারের কাছে আশ্রয় নেন।এরই কাছাকাছি কুড়ালীর সাপুর গ্রামে একটি মরা শেওড়া গাছের তলায় নিয়মিত বসতেন তিনি। বেশ কয়েকদিন পর আশ্চর্য্যজনক ভাবে ঐ মরা শেওড়া জীবিত হয়ে গাছের পাতা,ফল ,ফুলে ভরে যায়। স্থানীয় লোকজন তা দেখেই অবাক হয়ে যায়, সেই থেকেই তাঁকে শ্রদ্ধা করতে থাকেন।
    সেই সময় রাজা মদন রায় এক গুরুতর সমস্যায় পড়েন এবং জেল খাটতে হবে নিশ্চিত জেনে বিমর্ষ হয়ে পড়েন।

    সে যাত্রায় ত্রাতার ভূমিকা পালন করে মূবারক তাঁকে বাঁচিয়ে ছিলেন। রাজা মদন রায় খুশি হয়ে তাঁকে ঘুটিয়ারী শরীফে ৪৫২ একর জমি পাট্টা দিয়েছিলেন। গাজী বাবার বড় ছেলে দুঃখী তাঁর খোঁজ করতে করতে ধোয়াঘাটায় গাজী বাবার সন্ধান পায়। বাবা কে কাছে পেয়ে ছেলে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বাবার সাথে থাকতে শুরু করেন।
    ১৭০৭ সালে মহামারি হয়। সেই সময় অনাবৃষ্টির কারণে চাষ-আবাদ পুরো বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। গ্রামবাসীরা খুবই চিন্তিত হয়ে পড়ে, তাদের মধ্যে এক ব্যক্তি গাজী বাবার কথা বলেন। তখন গ্রামের সব লোকজন গাজী সাহেব কে গিয়ে বলেন “বাবাজী এখনও বৃষ্টি হল না ছেলেপুলেরা কি খাবে! খাওয়া না পেরে মারা পড়বো যে”।

    তিনি ব্যথিত হয়ে ৭ ই আষাঢ় ঘুটিয়ারী শরীফে আড়াই কুপ (আড়াই কোদাল) একটি পুকুর খনন করেন, এবং মহান ‘আল্লার’ কাছে বৃষ্টি প্রার্থনা করে একটি ঘরের মধ্যে দরজা বন্ধ করে ধ্যানে বসেন। সেই সময় ভক্তদের তিনি বলেছিলেন “যতদিন পর্যন্ত বৃষ্টি না হবে,ততদিন পর্যন্ত তাঁর ঘরের দরজা যেন কেউ না খোলেন।”

    সেই সময় একদল পাঠান তাঁর হাজত নিয়ে ধ্যানমগ্ন ঘরের বন্ধ দরজার সামনে উপস্থিত হয়েছিলেন পাহারায়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর মূবারকের কোনরুপ সাড়া না মেলায় অধৈর্য্য হয়ে তারা ঘরের দরজা ভেঙে ফেলেন।দেখা যায় ধ্যানমগ্ন অবস্থা মূবারক মারা গেছেন।সেই দিনটি ছিল ঐতিহাসিক ১৭ ই শ্রাবণ।
    তারপর প্রতি বছর ১৭ই শ্রাবণের দিনই আকাশ ভেঙে প্রচুর বৃষ্টি নামে।

    বর্ষার সময় ও যদি বৃষ্টি কম হয় বিভিন্ন এলাকার লোকজন আশায় থাকে ১৭ শ্রাবণ বৃষ্টি হবেই।সেই থেকে গাজীবাবার মৃত্যু দিনটি কে বহুকাল ধরে “গাজী সাহেবের মেলা” নামেই পালিত হয়ে আসছে। ওই দিনটিতে ভক্তরা শান্তির জন্য আয়োজন করেন ঔরষ মেলার। মেলায় দেশ-বিদেশ সহ ভারত বর্ষের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১৭ ই শ্রাবণ দিনটিতে লক্ষাধিক ভক্তদের সমাগম হয়।
    এছাড়াও সাধারণ লোকজন মনঃষ্কামনা পূরণের জন্য মাজার সংলগ্ন পুকুরে “মক্কা পুকুর” এ সিরনি ভাসিয়ে দিলে কিংবা লাল সুতো নিয়ে নিমগাছে বা মাজারে ঢিল বাঁধেন।
    বহুকাল ধরে আজও সেই রীতি নিয়ম মেনেই চলে আসছে দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার ঘুটিয়ারী শরীফের ঐতিহাসিক “গাজী সাহেবের মেলায়”।

    অন্যদিকে অন্যান্য বছরের ন্যায় মেলায় ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ মানুষের জনসমাগম হয়েই থাকে। ভীড় এড়াতে পবিত্র জুম্মাবার(শুক্রবার) ঘুটিয়ারী শরীফ গাজী বাবার মাজারে চাদর চড়িয়ে ফুল দিলেন রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ণের রাষ্ট্রমন্ত্রী গিয়াস উদ্দিন মোল্ল্যা। ঘুটিয়ারির ঐতিহাসিক গাজী বাবার মেলা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন “রাজ্য তথা সারা ভারতবর্ষে এক ঐতিহাসিক মিলন ক্ষেত্র গাজী বাবার এই ঔরষ মেলা।
    মেলার নিরাপত্তা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন “গাজী বাবার মেলায় কোন দিন ও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।তাছাড়াও আমাদের প্রচুর প্রশাসনিক কর্তা ব্যক্তিরা ছাড়াও রয়েছেন মেলা কমিটির লোকজন ও সজাগ ভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য রয়েছেন মেলার নিরাপত্তায়।”