রাশিয়ায় একডজন দেশকে হারিয়ে ক্যারাটেতে সোনা জিতে বিশ্বজয়ী বোলপুরের মেয়ে

রাশিয়ায় একডজন দেশকে হারিয়ে ক্যারাটেতে সোনা জিতে বিশ্বজয়ী বোলপুরের মেয়ে

নিজস্ব সংবাদদাতা, বঙ্গ রিপোর্ট, বীরভূম: উত্তরণের প্রথম সোপানে পা রাখা বাবার হাত ধরে। মেয়ের আত্মরক্ষা সব থেকে বেশী জরুরি স্ত্রী মধুমিতা ভট্টাচার্যকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন কামদেব ভট্টাচার্য। বাবার অনুপ্রেরণায় ক্যারাটে ক্লাশে আসা শুরু পারমিতার। সেদিনের গোয়ালপাড়া স্কুলের অষ্টম শ্রেনীর ছাত্রী পারমিতা আজ বিশ্বজয়ী। মেয়ের কৃতিত্বে আত্মহারা পিতা এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না তাঁর মেয়ে বিশ্ব বিজেতার খেতাব অর্জন করেছে।

বর্তমানে বোলপুর গার্লস এর একাদশ শ্রেনীর ছাত্রী তথা শান্তিনিকেতন থানার অন্তর্গত গোয়ালপাড়া এলাকার বাসিন্দা পারমিতার কৃতিত্বে গর্বিত স্কুলের শিক্ষিকা ও তার সহপাঠীরাও। জানা গেছে, সোতোকান ক্যারাটে ও জিৎকুনেডু, মার্শাল আর্টের এই দুই ইভেন্টে বিগত চার বছর ধরে ট্রেনিং নিয়ে চলেছে পারমিতা ভট্টাচার্য। প্রশিক্ষকের নির্দেশ মেনে কঠোর প্রশিক্ষণ নিয়ে রাজ্য ও জাতীয় স্তরে একাধিক পদক জিতে নিয়েছে সে। বর্তমানে তার ঝুলিতে আছে ব্রোঞ্জ, সিলভার ও গোল্ড মিলিয়ে পাঁচটি পদক।

২০১৭ সালে রাজ্য প্রতিযোগীতায় প্রথম ব্রোঞ্জ পদক পায় এই কৃতী খেলোয়াড়। এরপর ২০১৮র সেপ্টেম্বরে গুয়াহাটিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় স্তরের খেলায় দুটি রৌপ্য পদক ছিনিয়ে নেয় পারমিতা। এরপরের জয়টি আসে মাত্র দুমাস পরেই। ডিসেম্বরে মণিপুরে অনুষ্ঠিত জিৎকুনেডুর জাতীয় স্তরের খেলায় স্বর্ণ পদক পেয়ে রাশিয়ায় খেলতে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে সে।

আন্তর্জাতিক মঞ্চে পা রাখার জন্য শুরু হয় কঠোর প্রশিক্ষণ। একদিকে পড়াশোনা অন্যদিকে ক্যারাটে প্রশিক্ষন দুটোই সমানতালে বজায় রেখে পারমিতা আজ ভারতের গর্ব। এই বিশ্ব বিজেতার কাছ থেকেই জানা গেল তার সাফল্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে তার বাবা, মা ও তার প্রশিক্ষকের হাতে। খেলার জন্য বাবা, মায়ের সহযোগীতা না থাকলে আজ এই মঞ্চে জয়লাভ সহজ হত না।

পারমিতা জানান, ক্যারাটে শেখার জন্য গ্রামের অনেকে অনেক ব্যাঙ্গ করেছে কিন্তু আমার পরিবারের সবাই আমার পাশে থেকেছে। আজ এই পদক জয় আমার সমস্ত অপমানের জবাব। তার বাবা কামদেব ভট্টাচার্য বলেন, আমার মেয়ের যাবতীয় সাফল্যের কারণ তার অদম্য জেদ। আন্তর্জাতিক মঞ্চে খেলার জন্য ভোর চারটে থেকে উঠে প্রশিক্ষকের নির্দেশ মতো ট্রেনিং করত ও। সারাদিনে পড়াশোনার ফাঁকেই চার থেকে পাঁচ ঘন্টা প্র‍্যাকটিস এরজন্য সময় বের করে নিতো সে। তিনি বলেন, মেয়ে হয়ে ক্যারাটে শেখার জন্য যত বিভিন্ন জায়গায় ও অপমানিত হয়েছে ততই পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কিছু করে দেখানোর জেদ।

জানা গিয়েছে, ইতিমধ্যেই ব্ল্যাক বেল্টের অধিকারী পারমিতা নিজের সহপাঠীর সাথে দিনের পর দিন ঘটে চলা অন্যায়ের জবাবও দিয়েছে। পড়ে বাড়ি ফেরার পথে রাস্তায় এক ইভটিজারের অভদ্রতামির কথা জানতে পেরে সহপাঠীর দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় পারমিতা। বোলপুরের প্রান্তিকে রাস্তার ওপর ইভটিজারকে ধরে উত্তম মধ্যম দিয়ে ২০১৮র আগষ্টে প্রথম সংবাদের শিরোনামে উঠে আসে সে। তার প্রশিক্ষক কৌশভ সান্যাল বলেন, তখনই বুঝেছিলাম অনেক দূর যাবে এই মেয়ে।

তাই খেলাকেই পাখির চোখ করতে বলেছিলাম ওকে। রাশিয়া থেকে সোনার পদক জয়ের পর এবার আরো বড় মঞ্চে ওকে খেলানোর জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। সামনে আরো কঠিন পথ অপেক্ষা করছে ওর জন্য। তিনি বলেন অনেকেই এখন সখে ক্যারাটে শেখার জন্য আসে কিন্তু খুব কম ছেলে মেয়েদের মধ্যে লড়াকু মনোভাব থাকে। ক্যারাটের এই প্রশিক্ষক বলেন, পারমিতার সাথেই রাশিয়ায় খেলার জন্য যোগ্যতা অর্জন করেছিল তাঁরই আরো তিন ছাত্রী রীমা সাউ, অমৃতা মিশ্র ও সঞ্চারী ভট্টাচার্য। কিন্তু আর্থিক সমস্যার কারণে পিছিয়ে যেতে হয়েছে তাঁদের।

পারমিতার বাবা কামদেব বাবু ও মা মধুমিতা দেবীর একান্ত ইচ্ছার কারণেই অনেক আর্থিক সমস্যার মধ্যেও টাকা জোগাড় করে বিদেশে খেলতে গিয়েছিল পারমিতা। প্রশিক্ষক কৌশভ সান্যাল বলেন, পারমিতা খুব কৃতী খেলোয়াড়। গ্রাম বাংলা থেকে ক্যারাটেতে অনেক কৃতী খেলোয়াড় উঠে আসার সম্ভাবনাও আছে কিন্তু সরকারি সুযোগ সুবিধা না থাকার কারণে আর্থিক সমস্যার জন্য সবাই পিছিয়ে যায়। এই ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্টান অথবা সরকারি সাহায্য পাওয়া গেলে আরো ভালো ফল পাওয়া যাবে। জানা গেছে, গত চোদ্দ সেপ্টেম্বর থেকে সতেরো সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রাশিয়ায় অনুষ্টিত তাফিসা ওয়ার্ল্ড মার্শাল আর্ট গেম এন্ড ফেস্টিভ্যালে অংশগ্রহণ করে পারমিতা।

সাব জুনিয়র গ্রুপে প্রায় একডজন বিদেশী খেলোয়াড়কে হারিয়ে প্রথম স্থান অধিকার করে ভারতকে সোনা এনে দেন এই খেলোয়াড়। ফাইনাল রাউন্ডে ইন্দোনেশিয়াকে হারিয়ে সোনার পদক ছিনিয়ে নেয় পারমিতা। আগামী একুশ সেপ্টেম্বর বোলপুরে পা রাখছে এই কৃতী খেলোয়াড়। তাকে সংবর্ধনা জানাতে ইতিমধ্যেই তৈরি হচ্ছে একাধিক সামাজিক সংগঠন ও তার স্কুলের শিক্ষিকারা।

পারমিতার ক্যারাটের প্রশিক্ষক কৌশভ সান্যাল বলেন রাশিয়া থেকে ফেরার পর আরো বড় মঞ্চে ওকে খেলানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। অলিম্পিক বা তার সমতুল্য মঞ্চ থেকে স্বর্ণ পদক হাসিল করাই আমার লক্ষ্য। এর জন্য আরো কঠোর প্রশিক্ষণ নিতে হবে ওকে।