অষ্টাদশ শতকের উল্লেখযোগ্য শিক্ষাব্রতী ছিলেন দানবীর হাজী মহম্মদ মহসীন

অষ্টাদশ শতকের উল্লেখযোগ্য শিক্ষাব্রতী ছিলেন দানবীর হাজী মহম্মদ মহসীন

(৩ জানুয়ারি ১৭৩২ – ২৯ নভেম্বর ১৮১২)

নিউজ ডেস্ক বঙ্গ রিপোর্ট: হাজী মুহম্মদ মহসীনের জন্ম ১৭৩২ সালে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে হুগলি শহরে।পিতা ছিলেন আগ মুহম্মদ ফয়জুল্লাহ। মায়ের নাম জয়নব খানম।
হাজী ফয়জুল্লাহর আদি নিবাস ছিল সুদূর পারস্যে। সেখান থেকে মহসীনের পূর্ব-পুরুষরা ভাগ্যের অন্বেষণে এসেছিলেন এ দেশে। তারপর স্থায়ী আবাস গড়ে তুলেছিলেন পশ্চিশবঙ্গে এই হুগলি শহর। হাজী ফয়জুল্লাহ যে সময়
হুগলিতে এসে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। তখন আগা মোতাহার নামে অপর এক ধনী ব্যবসায়ীও এখানে বসবাস শুরু করেন। তিনিও একদিন ভাগ্যের অন্বেষণে এসেছিলেন ভারতবর্ষে।

তখন দিল্লির বাদশা ছিলেন আওরঙ্গজেব। তিনিও ছিলেন খুব সম্ভ্রান্ত বংশের সন্তান। প্রথমে দিল্লিতে এসে বাদশার অধীনে খাজাঞ্চির পদে নিযুক্ত হন। তার কর্মদক্ষতায় বাদশাহ শিগগিরই তার প্রতি খুশি হলেন। বাদশা তখন
তাকে যশোর এবং নদীয়া জেলার অনেক জায়গীর দান করেন। এই জায়গীরদারি পেয়ে আগা মোতাহারও
দিল্লি থেকে চলে আসেন হুগলিতে এবং এখানে স্থায়ী ভাবে বসতি স্থাপন করেন। তারপর জায়গীরদারির পাশাপাশি শুরু করলেন লবনের ব্যবসা। এখানে আসার পর মোতাহার দোরদানা খানম নামের এক রমনীকে বিয়ে করেন। সুখেই কাটছিল তার সংসার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সুখ দীর্ঘস্থায়ী হলো না।

তাদের ঘরে কোনো সন্তান এলো না। তাই মোতাহার সন্তান লাভের আশায় আরেকটি বিয়ে করেন। দ্বিতীয় পত্নীর নাম ছিল জয়নব খানম। দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভে হয়তো কোনো সন্তান হবে এই আশায় তিনি আবারো দিন গুনতে লাগলেন। কিন্তু তারও সহসা কিছু হলো না। অবশেষে সব দিকে নিরাশ হয়ে তিনি পোষ্যপুত্র গ্রহণ করলেন। কিন্তু তাতেও তার মন ভরল না। এরপর শুরু হলো দুই স্ত্রীর ঝগড়া। মোতাহারের মন উঠল বিষিয়ে। মোতাহারের মনের যখন করুণ অবস্থা তখন ছোট স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নিল ফুটফুটে এক কন্যাসন্তান। এই কন্যার নাম ছিল মনুজান। ক্রমে মনুজানের বয়স বাড়তে লাগল। এক সময় পদাপর্ণ করল যৌবনে। একদিন পিতা কন্যাকে ডেকে বললেন, তোমার গলায় আমি একটি মাদুলি পরিয়ে দিয়ে গেলাম।

এর অনেক দাম। আমার মৃত্যুর পর খুলে দেখ। পিতার ইচ্ছাই ছিল মনুজানের কাছে আদেশের চেয়েও বেশি মূল্যবান। তাই তিনি পিতার আদেশ পালন করে চললেন। তার পর পিতার মৃত্যুর পর তিনি মাদুলিটি ভেঙে দেখলেন। দেখা গেল মোতাহার তার সমস্ত সম্পত্তিই দান করে গেছেন কন্যা মনুজানকে। জয়নব খানম দেখলেন স্বামী তাকে বঞ্চিত করে সব সম্পত্তি কন্যাকে দান করে গেছেন। তাতে তিনি খুব ক্ষুব্ধ হলেন। তাই সম্পত্তির লোভে তিনি কন্যাকে হাতে রাখার জন্য পারস্য থেকে আগত হাজী ফয়জুল্লাহ নামে এক সভ্রান্ত ব্যক্তিকে বিয়ে করলেন। মনুজানের তখন ১৩ বছর বয়স। তখনই ১৭৩২ সালে মুহম্মদ মহসীনের জন্ম হয়। বংশে একটি পুত্রসন্তান হওয়াতে সবাই খুশি।

সবচেয়ে বেশি খুশি হলেন মনুজান। তিনি সৎ ছোট ভাইকে নিয়ে যেন আনন্দে হাবুডুবু খেতে লাগলেন। অল্পদিনের মধ্যে মহসীনের মনের গভীরতার পরিচয় পেয়ে মাদ্রাসার ওস্তাদরা অবাক বনে গেলেন। চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল তার নাম-সুনাম। অবশেষে মহসীনের গুণের কথা মুর্শিদাবাদের নবাবের কানে গেল। তিনি ডেকে পাঠালেন এই প্রতিভাবান ছেলেকে। তারপর নবাবের অধীনে একটি উচ্চ সরকারি পদ গ্রহণের প্রস্তাব দিলেন।
কিন্তু মহসীন তা গ্রহণ করলেন না। ইতিমধ্যে পিতামাতার মৃত্যু হয়েছে।

বাড়িতে বোন একা রয়েছে। তাই মাতৃতুল্য বোনকে একা রেখে তিনি অন্য কোথাও আটকে থাকতে রাজি হলেন না।
এদিকে হুগলিতে মনুজানের ওপর বিপদ ঘনিয়ে আসতে শুরু করল। হুগলির বিশাল বাড়িতে থাকেন একলা যুবতী মেয়ে মনুজান। অপর দিকে বিশাল সম্পত্তি তার হাতে। তাই কিছু দুষ্ট লোক তার সম্পত্তি আত্মসাতের ষড়যন্ত্র পাকাতে লাগল। এই ষড়যন্ত্রের কথা টের পেয়ে ভয় পেয়ে গেলেন মনুজান। তিনি তখনই সবকিছু লিখে পত্র দিলেন মহসীনের
কাছে। পত্র পেয়ে বিপন্ন বোনকে রক্ষার জন্য দ্রুত হুগলি চলে এলেন মহসীন। মনুজান তখন ভাই মহসীনকে হুগলিতে থেকে বিষয় সম্পত্তি দেখাশোনার জন্য অনুরোধ।

১৮০৬ সালে তিনি তাঁর প্রায় সমস্ত ভূ–সম্পত্তি একটি ওয়াকফ দলিলের মাধ্যমে দান করে যান। তাঁর মৃত্যুর পরে সেই সম্পত্তির পরিচালনা নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম শুরু হয়। ১৮৩৫ সালে সকল আইনি ঝামেলা মিটিয়ে সরকার মহসিন ট্রাস্টের দায়িত্ব গ্রহণ করে। ১৮৩৫ সালেই এই ট্রাস্টের অর্থে প্রতিষ্ঠিত হয় হুগলী মহসিন কলেজ এবং এই কলেজের সাথে হাজী মুহসীনের অর্থে পূর্বে নির্মিত দুটি স্কুলকে মিলিয়ে দেয়া হয়। উল্লেখ্য এইটিই ভারতবর্ষের প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার কলেজ যেখানে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে যে–কেউ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারতো। এর আগে ১৮১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হিন্দু কলেজ ছিল শুধু ‘the sons of respectable Hindoos’ এর জন্য এবং ১৮১৮ ও ১৮২০ সালে প্রতিষ্ঠিত শ্রীরামপুর কলেজ ও বিশপস কলেজ ছিল খৃস্টান ধর্মাবলম্বীদের জন্য।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অক্ষয়চন্দ্র সরকার,স্যার উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী, শরৎচন্দ্র টট্টোপাধ্যায় প্রমুখ ভুবনবিশ্রুত বাঙ্গালিরা সবাই এই হুগলী মহসিন কলেজের ছাত্র ছিলেন। অবশ্য ১৮৩৫ সালে ইংরেজ সরকার এর নাম হুগলী মহসিন কলেজ রাখলেও কোনো অব্যাখ্যেয় কারণে দিনে দিনে মানুষের বলায় ও লেখায় এর নামটি দাঁড়ায় শুধু হুগলী কলেজ। মুহসীন শব্দটি ঝরে পড়ে যায়। ১৮৬০ সালের পরে কোনো কাগজপত্রে কিংবা সাইনবোর্ডে আর মুহসীন নামটা দেখাই যায় না। ১৯৩৬ সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় কলেজটি মূল নামে ফিরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং সে দাবি অনুযায়ী সরকারিভাবে পুনরায় কলেজটির নাম হয় হুগলি মহসিন কলেজ।

মহসিন ট্রাস্ট তথা মহসিন এনডাওমেন্ট ফান্ড এর সৃষ্টি শুধু হুগলি মহসিন কলেজ নয়। হুগলিতে একটি হাসপাতাল নিয়মিতভাবে এই অর্থে চলছে। মহসিনের সৈয়দপুর ট্রাস্ট এস্টেটের অধিকাংশ জমি ছিল যশোর ও খুলনায়। এই ট্রাস্ট এস্টেটের জমিতে অনেকগুলো দাতব্য হাসপাতাল, সরকারি অফিস,খুলনা–কলকাতা রেললাইন ছাড়াও গড়ে ওঠে অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। খুলনার দৌলতপুরের সরকারি ব্রজলাল কলেজের ৪২ একর জমির ৪০ একরই মহসিনের সৈয়দপুর ট্রাস্ট এস্টেটের জমি। ব্রজলাল কলেজের অনেক আগে ১৮৬৭ সালে মহসিন এনডাওমেন্ট ফান্ড এর অর্থে দৌলতপুরে তৈরি হয় একটি এ্যাংলো ভার্নাকুলার স্কুল। ১৯৩৯ সালে এর নামকরণ হয় দৌলতপুর মহসিন হাই ইংলিশ স্কুল। ১৮৮৬ সালে সরকারি অর্থে খুলনা জেলা স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু কিছুদিনেই স্কুলটি অর্থাভাবগ্রস্ত হয়ে পড়লে সরকারি সেই স্কুলটির জন্যও সরকার মহসিনের সৈয়দপুর ট্রাস্ট এস্টেট থেকে অর্থ মঞ্জুর করেন। এছাড়াও মহসিনের সৈয়দপুর ট্রাস্ট এস্টেটের অর্থে খুলনার দৌলতপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় মহসিন বালিকা বিদ্যালয়, ও মহসিন মহিলা কলেজ।

হাজি মুহাম্মদ মহসিন ১৮১২ সালে ২৯ নভেম্বর হুগলিতে ইন্তেকাল করেন। তাকে হুগলি ইমামবাড়ায় দাফন করা হয়।