সম্প্রীতির মানুষ ছিলেন বীরভূমের গল্পকার সাহিত্যিক আব্দুল মান্নাফ

সম্প্রীতির মানুষ ছিলেন বীরভূমের গল্পকার সাহিত্যিক আব্দুল মান্নাফ

তৈমুর খান, বঙ্গ রিপোর্ট: “স্বাধীনতার দীর্ঘ ব্যবধানেও সংমিশ্রণ চরিত্র নিয়ে সাহিত্য সাহিত্যচর্চার ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারলে পারস্পরিক ব্যবধান বিচ্ছিন্নতাবাদ ধর্মের গোঁড়ামি ও অন্ধসংস্কারের শিকার হতে হতো না। সংমিশ্রণ চরিত্র নিয়ে যে সাহিত্য নেই তা নয়, সংখ্যা আঙুলে গোনা যায়। তবু আশার কথা এই, হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লেখকগণ ইদানিং মুসলিম সমাজ নিয়ে লেখালেখি শুরু করেছেন।

উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের উভয়ের জন্য হৃদয়ানুভূতির বাস্তব প্রকাশ আছে আনাচে-কানাচে, গ্রামে-গঞ্জে ; সাহিত্যে তার ব্যাপক প্রতিফলন চাই।” “সম্প্রীতির গল্প” (প্রথম প্রকাশ ১৯৯১) গ্রন্থের ভূমিকায় একথা উল্লেখ করেছেন লেখক এ মান্নাফ। আজীবন তাঁর এটিই ছিল একমাত্র লক্ষ্য। মানুষকে মানুষের সাথে মিলিয়ে দেওয়া। সহজ মনের, সহজ ভাবের, সহজ ভাষার কথাসাহিত্যিক ছিলেন এ মান্নাফ। একখানা ফতুয়া অথবা পাঞ্জাবি এবং ধুতি পরে গ্রাম-গঞ্জের সাহিত্য অনুষ্ঠানগুলিতে উপস্থিত হতেন। নিরীহ অতিসাধারণ জীবনযাপনের মধ্যেও খুঁজতেন মহান মানবিক শক্তির বিস্ময়কর প্রাচুর্য। খুব সহজেই মিশে যেতে পারতেন সাধারণ মানুষের সাথে। তাদের সুখ-দুঃখের অংশভাগী হতেন। যতটা পারতেন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন।

তাদের কথাই লিখতেন তাঁর ছোটগল্পগুলিতে। কখনও লিখতে লিখতে তাঁর চোখও ভিজে যেত। অনুভূতির প্রগাঢ় এরকম সমন্বয় খুব কম লেখকের জীবনেই দেখেছি। আলোচনায় স্বীকার করে নিয়েই বলতেন, “ ওদের কথা লিখতে গিয়ে আমিও ওদের মতো হয়ে যাই।” নিজের শরীরে ক্যান্সার ধরা পড়ার পরও একদিন বললেন, “ও কিছু না, ঠিক ভালো হয়ে যাব।” সহজ সরল অনাড়ম্বর মানুষটিকে বাংলা ভাষার পাঠক নিশ্চয়ই মনে রেখেছেন।

এ মান্নাফ ওর্ফে আব্দুল মান্নাফ (১৯৩৯ —২০০৭) জন্মগ্রহণ করেছিলেন বীরভূম জেলার ভাঁড়কাটা গ্রামে। পিতা এবাদৎ মোল্লা ছিলেন অত্যন্ত সৎ মানুষ। কথাসাহিত্যিক এ মান্নাফও এই সততা নিয়েই বড়ো হয়েছেন। চন্দ্রগতি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে সিউড়িতেই স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। ছোটগল্পকার হিসেবেই সারাবাংলায় তাঁর পরিচিতি সর্বজনবিদিত। “ঝর্ণা” পত্রিকায় “নার্স” নামে গল্প দিয়েই তাঁর সাহিত্যজীবন শুরু হয়। তারাশঙ্করের পরে বীরভূমের গল্পকার হিসেবে এ মান্নাফেরই নাম উঠে আসে।

দু’হাজারের বেশি গল্প লিখেছেন তিনি। “হিসেব নিকেশ”, “সম্প্রীতির গল্প”, “ভাবনার বৃত্তে”, “হারেসার মুরগী”, “বেলা বয়ে যায়”, “রাধা বেঁচে আছে”, “ইচ্ছাপূরণ” এরকম পঁচিশটিরও বেশি গল্পগ্রন্থ আছে। দুটি বিখ্যাত প্রবন্ধের বই হল —“লেখকের উৎস সন্ধানে” এবং “বীরভূমের পীরস্থান” । শেষের বইটিতে পীরবাবাদের “মাজার” গড়ে ওঠার কাহিনি সেইসঙ্গে নানা কিংবদন্তি, লোকশ্রুতির সংগ্রহ বেশ তথ্যসমৃদ্ধ রচনায় পরিণত করেছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি সংস্করণও হয়ে গেছে বইটির।

এ মান্নাফ অবলীলায় লিখতে পারতেন ছোট থেকে বড়ো, গদ্য থেকে গল্প। ছোট ছোট বিষয়, কথায় কথায় ছবি, স্মৃতি-বিস্মৃতি, চারপাশের অভিজ্ঞতায় নানা আলো-ছায়ার বিন্দুগুলি সিন্ধুর রূপ পেত তাঁর কাছে। মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, দুঃখ-দুর্ভোগ, ইচ্ছাপূরণের বাসনা গল্প হয়ে উঠত। তিনি বিকৃতি বা যৌনাচার বা যৌনতার আলো-আঁধারিতে জীবনকে দেখেননি। বরং তুচ্ছের মধ্যেও মাহাত্ম্য, ক্ষুদ্রের মধ্যেও অসামান্যকে দেখতে পেয়েছেন। মানুষের প্রতি ভালবাসা, বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং মানবিকতাকে সম্মান জানানোর আদর্শেই অবিচল থেকেছেন।

১৯৯৮ সালে “কফিহাউস” পত্রিকা “সম্প্রীতির মানুষ” অভিজ্ঞানে তাঁকে ভূষিত করে। “চতুরঙ্গ” পত্রিকায় “নসিবিবির ঝুড়ি” গল্পটি বিশেষ আলোড়ন তুলেছিল। এমন কোনও লিটিল ম্যাগাজিন নেই যাতে তিনি লেখেননি। বাংলা ও বাংলার বাইরের সমস্ত সমস্ত ম্যাগাজিনেই তাঁর লেখা দেখা গেছে। কিন্তু “আনন্দবাজার” বা “দেশ” পত্রিকার দাক্ষিণ্য কখনও তাঁর জীবনে জোটেনি।

বহু দূর পথ হেঁটেছেন তিনি, হৃদয়ে কান পেতে মানুষের মনের কথা শুনেছেন। বাংলার আমজনতার জীবনের সঙ্গে তাঁর গল্পের মর্মকথা এখনও বেজে ওঠে । যদি কখনও তাঁর সৃষ্টি নিয়ে মূল্যায়ন হয়, তবে জানা যাবে কীরকম অজস্র অনুভূতির শেকড় ছড়িয়ে আছে মানুষের মনের মাটিতে। আধ্যাত্মিক মননে তিনি হজরত মুহাম্মদ, নানক, শ্রীচৈতন্য, শ্রীরামকৃষ্ণ, মা সারদা, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নজরুলের ভক্ত ছিলেন। তাঁদের আদর্শ তাঁর জীবনেও প্রতিফলিত হত। অসম্ভব প্রাণখোলা, দরদি মানুষটি লিটিল ম্যাগাজিনগুলির অভিভাবকে পরিণত হয়েছিলেন।