ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের দায় কি শুধু সংখ্যালঘু মুসলিমদের ? 

ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সরকার গঠনের দায় কি শুধু সংখ্যালঘু মুসলিমদের ?

অধ্যাপক ডঃ মুহাম্মদ ইসমাইল 

আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বাইডেনের জয় ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরাজয় নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষ মহলে খুশির হাওয়া। কারণ বিশ্বের বিত্তশালী ও শক্তিধর দেশের নিরপেক্ষ আচরণ কমবেশি সকল দেশের ওপর প্রভাব পড়বে।তার পর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণ না পাওয়া এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ নিয়ে রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে। তার মধ্যে বিহার নির্বাচন নিয়ে দেশজুড়ে রাজনৈতিক মহল সরগরম ছিল বেশ কিছুদিন ধরে। বিজেপি বিরোধী সকল রাজনৈতিক দলের প্রত্যাশা ছিল বিজেপি সরকার করোনা মোকাবিলায় ব্যর্থ, পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে অবহেলা, অর্থনীতির দুর্দশা, মূল্যবৃদ্ধি, নানা সমস্যা নিয়ে ফলাফল বিজেপি বিরোধী দলগুলো ঘরে তুলবে। নির্বাচনী সম্ভাবনাময় ফলাফলে তার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল কিন্তু হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে আবার পুনরায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট যদিও বিরোধীরা দাবি করছেন বহু আসনে মহাজোট প্রার্থীদের কারচুপি করে হারানো হয়েছে।

 

 

 

তবে বিহার দেশের রাজনীতিতে বরাবর গুরুত্ব পূর্ণ রাজ্য ও বিহার একাধিক রাজনৈতিক দলের তীর্থভূমি। বিহারে তথা দেশে বরাবর জাতপাত, ধর্ম ও নানা স্হানীয় সমস্যার কথা বাচ বিচার করে রাজনীতি হয়। আরজেডির মত রাজনৈতিক দল যাদব সম্প্রদায়ের উপর নির্ভর করে, তেমনি জনতা দল উইনাইটেড কূর্মী সম্প্রদায়ের উপর নির্ভর করে,রামভিলাস পাশওয়ানের দল এলজেপি দলিত সম্প্রদায় অর্থাৎ পাশওয়ান সম্প্রদায়ের উপর ভর করে রাজনীতি করেন। তবে এবারের নির্বাচন ঘিরে কৌতূহল ছিল তুঙ্গে তার কারণ দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে নীতিশ সরকারের দুর্নীতি ও সরকারের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ, নানা সমস্যা, সরকারের নানা জনবিরোধী নীতি, নির্বাচন প্রাক্কালে দেওয়া নানা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়া,কালো টাকা উদ্ধার, ১৫ লক্ষ টাকা করে একাউন্টে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, বছরে দুই কোটি রোজগার, বিহারের জন্য বিশেষ আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণার প্রতিশ্রুতি কেন্দ্র সরকার অমান্য করেন ও সদ্য হয়ে যাওয়া বন্যায় বিহারে মানুষের দুর্গতি, বেকারত্ব মূল্যবৃদ্ধি, প্রভৃতি সমস্যা নির্বাচনে উঠে আসে।তাই স্বাভাবিক ভাবে বিরোধী শিবির ও মিডিয়া জগত ভেবেছিল মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে মত দান করবেন কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় আবার বিহার জুড়ে জাতপাত ও ধর্মের রাজনীতি হওয়ার কারণে নির্বাচনে অসংখ্য রাজনৈতিক দল ও অসংখ্য নির্দল প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নানা স্থানীয় সমস্যা ও জাত পাতের উপর ভিত্তি করে।এক একটি আসনে ১০ জন থেকে ২৬ জন কে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেখা যায় তাদের মধ্যে অনেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ভোট পেয়েছে। বিহারে তৃতীয় ও চতুর্থ শক্তি হিসাবে জোট করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেখা যায়।মজার ব্যাপার বিহার নির্বাচনে কয়েক দশক থেকে ব্রাহ্মণ রাজ মুক্ত এবং চালিকাশক্তি হিসেবে যাদব, কুর্মী, পাসওয়ান সম্প্রদায়। বিভিন্ন জনগোষ্ঠী তার নিজস্ব সম্প্রদায়ের নেতৃত্বাধীন পার্টিকে ভোট প্রদান করেন।

 

 

বিহারে নানা সম্প্রদায় ও জাতপাতের বিচার করলে যাদব সম্প্রদায়ের উপস্থিতি ১৬শতাংশ,কুর্মী ৪ শতাংশ, পাসওয়ান, দলিত, মহাদলিত ৭শতাংশ, মুসলমান ১৭শতাংশ।তবে দেশজুড়ে ধর্মের ভিত্তিতে রাজনীতি নতুন ঘটনা নয়। স্বাধীনতার পর থেকে ভারতের নির্বাচন প্রক্রিয়া লক্ষ করলে পরিষ্কার দেখা যায় কংগ্রেস, বিজেপি থেকে শুরু করে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল নির্বাচন করেন জাতপাত ও ধর্মের উপর ভিত্তি করে। ব্যতিক্রম দেখা যায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে, বরাবর সংখ্যালঘু অঞ্চলে নানা সম্প্রদায়ের প্রার্থী দেওয়া হয় এবং কিছু কিছু আসন সংরক্ষণ আওতাভুক্ত থাকে।বিভিন্ন রাজনৈতিক দল পরিকল্পনা করে ধর্ম ও জাতপাতের রেষারেষিটা দেখে নিজ নিজ দলের প্রার্থী নির্ধারণ করে।পুরো বিহার জুড়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া লক্ষ করলে দেখা যাবে শতাংশের বিচারে বেশি জনপ্রতিনিধি যাদব, কুর্মী ও নানা সম্প্রদায় থেকে কিন্তু ১৭ শতাংশ মুসলমান বসবাস করা সত্বেও মাত্র কয়েকজন বিধায়ক রয়েছে বিহার বিধান সভায়। তবুও মুসলমান অধ্যুষিত এলাকা থেকে ও লোকসভায় মাত্র ২-৩জন।

 

 

আসলে বিহার নির্বাচন মানে নানা সম্প্রদায়ের ক্ষমতা দখলের লড়াই কিন্তু সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বরাবর ছিল নিছক দর্শকের ভূমিকায় অথচ শতাংশের বিচারে সংখ্যা গরিষ্ঠ। তা নিয়ে শুধু বিহারে গুনজন চলছে তা নয়, কমবেশি দেশজুড়ে গুনজন চলছে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কৌশলগত ভাবে মুসলমান সংখ্যাধিক্য এলাকায় হিন্দু প্রার্থী দিচ্ছেন, অনেক সময় আসন সংরক্ষণের আওতাভুক্ত থাকছে এবং অনেক সময় নানা রাজনৈতিক দল মুসলমান প্রার্থী দিচ্ছেন ও হিন্দু ভোট একচেটিয়া পড়লে মুসলমান প্রার্থীরা পরাজয় বরন করছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর কৌশলগত কারণে দিন দিন রাজ্যের বহুস্তরের নির্বাচনে জনপ্রতিনিধি, বিধায়ক, সাংসদ ও নানা স্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। তা নিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের সামান্য অংশ বঞ্চনা হিসেবে দেখছেন।

 

 

মেরুকরণের রাজনীতি বর্তমানে প্রত্যক্ষভাবে করা হচ্ছে। বিহার নির্বাচন লক্ষ করলে দেখা যাবে যাদব, কুর্মীদের শক্তিশালী নেতৃত্ব থাকার সুবাদে তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি, বিধায়ক, সংসদ শতাংশের বিচারে বেশি অথচ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন স্তরে জনপ্রতিনিধি নগণ্য। বর্তমান বিহার নির্বাচনে সংখ্যালঘু বিধায়ক নগণ্য ১৭শতাংশ ভোট থাকা সত্ত্বেও তবে মজার বিষয় রাজনীতিতে এতদিন মুসলিম সম্প্রদায়ের কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না অথচ বিহারের প্রায় সকল সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক দল বিদ্যমান এবং বর্তমানেও নেই। তবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, আদিবাসী, দলিত সম্প্রদায়ের নানা সমস্যা নিয়ে আসাদুদ্দিন ওয়াইসি নানা সমস্যা নিয়ে বিহার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন কুড়িটি আসনে ও পাঁচটি আসনে জয় হয়েছে। তা নিয়ে রাজনৈতিক মহল সরগরম কারণ বিহার রাজনীতিতে সংখ্যালঘুরা ভোটের মেরুকরণ ঘটলে বহু রাজ্যে নামধারী ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলের দপ্তর বন্ধ হবে। তেমনি ভাবে বিহারে ও সংখ্যালঘুদের জন্য তাদের শতাংশ ছেড়ে দিতে হবে। বিভিন্ন নির্বাচন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলো উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে একটি রাজনৈতিক দলকে সাম্প্রদায়িক দল হিসেবে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করছেন এবং ভোট কাটোয়া পার্টি হিসেবে চিহ্নিত ও বিজেপির বি টিম বলে সাবিত করার চেষ্টা করছেন কিন্তু প্রশ্ন হলো দেশজুড়ে বিজেপির উত্থান ও শক্তি বৃদ্ধির জন্য দায়ী কে বা কারা? তবে কি দেশজুড়ে কংগ্রেস ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর পরাজয়ের প্রধান ভূমিকায় সংখ্যালঘু মুসলমানেরা। ধর্মনিরপেক্ষ নামধারী সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলোর আত্মবিশ্লেষণ দরকার কারণ তারাও যুগ যুগ ধরে পরোক্ষভাবে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করেছেন তা বর্তমানে সকলের কাছে পরিষ্কার। মানুষকে দীর্ঘ সময় ধোঁয়াশায় রেখে রাজনৈতিক তাস খেলার জন্য মূলত আজ নানা মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান ভারতে। স্বাধীনতার পর থেকে শাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলকে জিজ্ঞেস করা যেতে পারে নানা প্রশ্ন।দেশে আজও আদিবাসী, দলিত ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কম হওয়ার কারণ কি কি? দেশের এক শতাংশ মানুষের হাতে ৭৩% সম্পদ হস্তাগত কিভাবে? মুকেশ, আম্বানি, আদানি প্রভৃতি মানুষ শুন্য থেকে দেশের কয়েক শতাংশ সম্পদ কিভাবে অধিকার করল? অথচ দেশের অধিকাংশ মানুষ দুই মুঠো খাবার সংগ্রহ করতে পারছেনা তার দায়ভার কি সরকারের নয়? বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর সময় এসেছে কেন যুগ যুগ ধরে তাদের কোলে লালিত নানা ধর্ম ও জাতপাতের মানুষ তাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। কারণ মানুষ চাই আশ্রয়, উন্নয়ন, কেন বিহার,পশ্চিমবঙ্গের মত রাজ্যে বিজেপি ও মিমের মত উগ্র রাজনৈতিক দলের উত্থান হল। তা নিয়ে বিশ্লেষণ যেমন দরকার তেমনি দরকার কেন দেশজুড়ে নানা রাজনৈতিক দলগুলোকে গ্রাস করছে সাম্প্রদায়িক দল গুলো। শুধু কি ধর্মীয় সুড়সুড়ি? ধর্মনিরপেক্ষ দলের নেতারা কি সত্যি ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে না? বিহার ভোটে শত জ্বলন্ত সমস্যা থাকলেও আবার জাতপাত ও ধর্মের রাজনৈতিক জয় নিশ্চিত হলো।

 

 

ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতাদের ভাবার সময় এসেছে এবং দলের মধ্যে পরোক্ষভাবে পুষে রাখা সাম্প্রদায়িকতা দূর করতে হবে। সকলকে সাথে নিয়ে চলতে হবে এবং উন্নয়নে সকলকে শামিল করতে হবে। দেশে সংখ্যা লঘুদের গোলামে পরিণত করার চক্রান্ত চলছে। তা থেকে মুক্ত হয়ে সহমর্মিতার পরিবেশ গড়ে না তুললে জাতপাত ও সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মের রাজনীতি দিন দিন বৃদ্ধি পাবে। বিহারে ৩০ থেকে ৪৫ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত বিধানসভায় মুসলিম প্রার্থীরা ধর্মনিরপেক্ষ দলের প্রার্থী হয়েও ফেল করেছেন তা থেকে পরিষ্কার সংখ্যালঘুদের ভোট দিতে নারাজ হিন্দু দলিত, আদিবাসী ও পিছিয়ে পড়া মানুষেরা। তাই কৌশলগত ভাবে মুসলিমদের প্রার্থী করতে নারাজ রাজনৈতিক দলগুলো কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলেও মুসলিম প্রার্থীরা ধর্মনিরপেক্ষ দলের প্রার্থী হওয়া সত্বেও পরাজিত হচ্ছেন।

 

কিন্তু বিহারের পাশওয়ান সম্প্রদায় একটি মাত্র আসন পেলেও অন্য রাজনৈতিক দলকে পাসয়াওয়ান সম্প্রদায় ভোট দেয়নি এবং তারা তাদের ভোটের শতাংশ ধরে রেখেছেন। অথচ মুসলমানদের ১.৫শতাংশ বিশেষ দলের পক্ষে পড়ছে বলে দায়ী করা হচ্ছে এবং তার জোটে থাকা রাজনৈতিক দল গুলো শতাংশের বিচারের বেশি ভোট কাটলেও তা নিয়ে চর্চা হচ্ছে না।নিতিশ কুমারের দলে বেশ কয়েকজন সংখ্যালঘুরা প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও কেন একজনও পাস করলো না, তা নিয়ে চর্চা হচ্ছে না।তাই কোন রাজনৈতিক দলকে ভোট কাটুয়া পার্টি হিসাবে বিবেচনা করার পূর্বে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক নেতাদের আত্মা বিশ্লেষণ দরকার কেন ৭৩বছরের সংখ্যালঘু ভোট তাদের থেকে সরে যাচ্ছে।প্রয়োজন সংখ্যালঘুদের আর্থিক, সামাজিক, নিরাপত্তা সহ নানা বিষয় পর্যালোচনা করা।