বসিরহাটের দিনমজুরের ছেলে জিন্না বল হাতে কেকেআর ক্যাম্পে: স্বপ্ন দেশের হয়ে খেলার

বসিরহাটের দিনমজুরের ছেলে জিন্না বল হাতে কেকেআর ক্যাম্পে: স্বপ্ন দেশের হয়ে খেলার

 

নিউজ ডেস্ক বঙ্গ রিপোর্ট: স্বপ্নটার বয়স অবশ্য বেশি নয়। মাত্র বছর পাঁচেক। ভারত শেষবার বিশ্বকাপ জেতার আগে পর্যন্ত জিন্নার কাছে ক্রিকেট ছিল এক ধোঁয়াশা। ক্রিকেট মানে তাঁর কাছে ছিল ধান কাটা হলে সেই জমিতে গাছের ভাঙ্গা ডাল দিয়ে খেলা। আর গ্রামে যাঁদের বাড়িতে টিভি আছে তাঁদের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে দেখা। এতটুকুই ছিল তাঁর খেলার পরিধি।

ভারত বিশ্বকাপ জেতার পর ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নের জাল বোনা শুরু। অনটনের সংসারে লেগে থাকা নিত্য টানাপোড়েনের পিছুটান, অন্য দিকে হতদরিদ্র বাবার কাজে সাহায্য করার বদলে ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন। এরকম পরিবারের কাছে এই ধরণের সাধ থাকলেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় সাধ্য।

 

জিন্না নিজের এই অনটন, নিত্য দারিদ্র্যের খুঁটিনাটিই পেস বোলিংয়ের অস্ত্র করে নিয়েছেন। পুরো নাম জিন্না মন্ডল। বয়স ১৯ বছর। বাড়ি বসিরহাটের বিবিপুরে। এই প্রত্যন্ত গ্রামে ক্রিকেট অনুশীলন অসম্ভব এক স্বপ্ন। ক্রিকেট খেলাটাও যেন রূপকথা!

জিন্নার ক্রিকেটের হাতেখড়ি গ্রামের রাস্তায় পড়ে থাকা মুচি ডাব আর লেবু নিয়ে। সেখান থেকে টেনিস বলে হাত পাকিয়ে পাড়ার মাঠে খেলা শুরু। যদি ক্রিকেটার হতে পারি ঘরে অভাব অনটন আর কিছুই থাকবে না এমনই চিন্তা ভাবনা থেকে খেলার শুরু করে এই বোলার।

এরকম গ্রামে না আছে ভালো কোচ না ক্রিকেট কোচিং সেন্টার। টেনিস বলে ভাল খেলেই এলাকার এক ক্রিকেটপ্রেমীর নজরে পড়ে জিন্না। এরপর সম্বরণ বন্দ্যোপাধ্যায় অ্যাকাডেমিতে ট্রায়াল। তার খেলা দেখে বিনা পয়সায় খেলা শেখাতে রাজি হন কোচেরা। বাড়ি থেকে কলকাতায় অনুশীলন! দূরত্ব অনেক। পদে পদে বাধা।

 

নিজের বড়ি থেকেই কাকড়া মির্জানগর স্টেশন দূরত্ব সাত কিলোমিটার। তবে ক্রিকেটের প্রতি নিখাদ প্যাশন থেকেই সমস্ত প্রতিকূলতা হাসিমুখে আপন করে নিয়েছেন। বন্ধুর পথেই চরৈবৈতি মন্ত্রে দীক্ষা নিয়েছেন। মাঝরাতে গ্রামের কেউ এখন হুড়মুড়িয়ে সাইকেল চালানো দেখে অবাক হন না। সকলেই জানেন, জিন্না সাইকেল চালিয়ে ফার্স্ট ট্রেন ধরতে ছুটছে।

 

ভোররাত থেকে দুপুর গড়িয়ে যাওয়ার পরও মাঠে জনমজুরের কাজ করেন উনিশ বছরের যে তরুণ, সেই জিন্না মণ্ডল গত দু’বছর আগে ইডেনে আইপিএলের নেটে সকলকে চমকে দিয়েছিল।

 

কখনও মইন আলি, কখনও শুভমান গিলদের সঙ্গে উপড়ে দিয়েছেন ডেভিড মিলারের উইকেটও। পিঠ চাপড়ে সাবাশি দিয়েছেন কেকেআর কোচ জাক কালিস। খেলার খুঁটিনাটি টিপস দিয়েছেন কেকেআরের তারকারা। কলকাতা, পঞ্জাব ছাড়াও হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে বল করে নজর কেড়েছেন পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চির লম্বা ছিপছিপে ছেলেটি।

সম্বরণ তাকে ডাকেন জোরে বোলার বলে। জিন্নার কথায়, জোরে বোলার মানে যে জোরে বল করে যেখানে আস্তে বল করার কোন জায়গা নেই। বাবা দিনমজুর। পেট চালাতে রাত জেগে মাছ ধরতে হয় জিন্নাকে।

 

গত বছর লকডাউন এবং করোনা অতিমারীর জন্যে খুব দুর্দশায় দিন কেটেছে। দর্জি দাদার কাজ নেই। নিজের বলতে কিছুই নেই জিন্নার। পরের জায়গায় থাকেন। এত বিপত্তি সামলেও এই পেসার যখন বোলিংয়ের রান আপ নেন সকলেই তাকিয়ে থাকেন মন্ত্রমুগ্ধের মত।

 

জিন্না এ বছর সই করেছে সেন্ট্রাল ক্যালকাটা ক্লাবে। এক পলক দেখলে মনে হবে সে বাঁহাতি। ভুল ভাঙ্গে ডেলিভারির সময়। বাম হাত থেকে বল চলে আসে ডান হাতে। বর্তমানে সে কালীঘাট ক্লাবে প্র্যাক্টিস করছে। কালীঘাট ক্লাবেরই কোচ সৌরভ সরকার। বছর দুয়েক আগে নিউ জিল্যান্ড সফরে যাওয়ার আগে ঋদ্ধিমান সাহা নেটে তাঁর কাছে কয়েকজন ভালো পেসার চেয়েছিলেন। সৌরভ বল করতে দিয়েছিলেন জিন্নাকে। বল দেখে তাতে খুশি হয়েছিলেন ঋদ্ধিও। এরপর কেকেআরের সঙ্গে প্র্যাক্টিস শুরু।

 

অদম্য জেদ, ফিটনেস আর মানসিক জোর এই তিনটেই যেন প্রধান অস্ত্র এই বোলারের। আর কিছুদিনের মধ্যেই শুরু হবে আইপিএল। এবারেও তার অপেক্ষায় দিন গুনছে। IPL- র বড় মঞ্চে নেট বোলার হওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে ভবিষ্যৎ আরও সমৃদ্ধ করতে চায় জিন্না।

 

বলের গতি বাড়ানোর দক্ষতা রপ্ত করতে চায় সে। ডেল স্টেইনের বল করা কাছ থেকে দেখে মুগ্ধ। আপাতত ক্লাব ক্রিকেটে সুযোগ পাওয়ার আশায় দিন গুনছে বছর উনিশের পেসার। প্রাথমিকভাবে বাংলা দলে জায়গা করে নেওয়া তাঁর লক্ষ্য। এরপর জাতীয় দল।

চাষের মাঠ থেকে মিলার, পীযূষ চাওলার উইকেট। ক্রিকেটের নেশায় মত্ত এই যুবক যেন গদ্যময় ইতিহাস রচনা করতে চাইছে। তার বলের গতি উপড়ে ফেলতে চাইছে কঠিন সময়ের উইকেট।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস