খিলাফত আন্দোলনের নেতা মহম্মদ আলি ও শওকাত আলী আজীবন স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন

খিলাফত আন্দোলনের নেতা মহম্মদ আলি ও শওকাত আলী আজীবন স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন

বঙ্গ রিপোর্ট ডিজিটাল ডেস্ক: মাওলানা মুহাম্মদ আলি জওহর  ও মাওলানা শওকত আলী উচ্চ শিক্ষিত, স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতা। দুজনেই খিলাফত আন্দোলনের মূল নেতৃবৃন্দের অন্যতম ছিলেন। মহম্মদ আলি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রেসিডেন্টও হয়েছিলেন। শওকত আলি তার ভাই মুহাম্মদ আলিকে উর্দু সাপ্তাহিক হামদর্দ ও ইংরেজি সাপ্তাহিক কমরেড প্রকাশ করতে সাহায্য করেন। তারা আজীবন দেশের স্বাধীনতার জন্য ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। যারাা ইতিহাসে “আলী ভ্রাতৃদ্বয়়়” নামে পরিচিত।

মুহাম্মদ আলি ১৮৭৮ সালে ১০ ডিসেম্বর উত্তর প্রদেশের রামপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মাওলানা শওকত আলি ও জুলফিকার আলির ভাই। পিতার অকালমৃত্যুর পর তিনি দারুল উলুম দেওবন্দ, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় ও ১৮৯৮ সালে অক্সফোর্ডের লিঙ্কন কলেজে আধুনিক ইতিহাস অধ্যয়ন করেন।

ভারত ফিরে মুহাম্মদ আলি রামপুর রাজ্যের শিক্ষা নির্দেশক হিসেবে দায়িত্বপালন করেন। পরে তিনি বড়োদরা সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। তিনি একজন লেখক ও বক্তা হয়ে উঠেন। ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় প্রধান ইংরেজি ও ভারতীয় সংবাদপত্রে তিনি অবদান রাখেন। ১৯১১ সালে তিনি উর্দুতে হামদর্দ ও ইংরেজিতে দ্য কমরেড নামক সাপ্তাহিক চালু করেন। ১৯১৩ মুহাম্মদ আলি দিল্লী ফিরে আসেন।

আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণের জন্য মুহাম্মদ আলি কাজ করেছেন। এসময় তার নাম ছিল মোহামেডান এংলো-ওরিয়েন্টাল কলেজ। তিনি ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার একজন সহপ্রতিষ্ঠাতা। এটি পরে দিল্লীতে স্থানান্তর করা হয়।

১৯০৬ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা বৈঠকে মুহাম্মদ আলি অংশগ্রহণ করেন। ১৯১৮ সালে তিনি এই দলের প্রেসিডেন্টের দায়িত্বপালন করেন।

১৯১৯ সালে ইংল্যান্ডে মুসলিম প্রতিনিধিদলে তিনি প্রতিনিধিত্ব করেন। এ দলের উদ্দেশ্য ছিল তুরস্কের সুলতান ও মুসলিমদের খলিফাকে যাতে মোস্তফা কামাল আতাতুর্ক‌ ক্ষমতাচ্যুত না করেন সে বিষয়ে প্রভাবিত করার জন্য ব্রিটিশ সরকারকে রাজি করানো। ব্রিটিশরা তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। ফলে খিলাফত কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটি ভারতের মুসলিমদের সরকারের প্রতিবাদ ও বয়কটে নেতৃত্ব দেয়।

এসময় মাওলানা মুহাম্মদ আলি ১৯২১ সালে মুসলিম জাতীয়তাবাদিদের নিয়ে একটি বোর্ড গঠন করেন এতে ছিলেন মাওলানা শওকত আলি, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, হাকিম আজমল খান, মুখতার আহমেদ আনসারি। এছাড়া মহাত্মা গান্ধীও এতে ছিলেন। গান্ধী মুসলিমদের সাথে ঐক্যের নিদর্শন হিসেবে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও হাজার হাজার হিন্দুর সমর্থন অর্জন করেন। একইসাথে মুহাম্মদ আলি গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে সমর্থন দেন এবং ভারতজুড়ে কয়েকশত প্রতিবাদে উৎসাহ দেন। ব্রিটিশ সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে। খিলাফত সম্মেলনের সময় রাজদ্রোহী বক্তৃতার দায়ে তিনি দুই বছরের জন্য কারারুদ্ধ হন।

১৯২৩ সালে মাওলানা মুহাম্মদ আলি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯২১ সালে ব্রিটিশ সরকার করাচির খালিকদিনা হলে আদালত স্থাপন করে। এতে তাকে আড়াই বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়। ১৯৩১ সালের ৪ জানুয়ারি মুহাম্মদ আলি মৃত্যুবরণ করেন। তার ইচ্ছানুযায়ী তাকে জেরুজালেমে দাফন করা হয়। কুব্বাত আস সাখরার কাছে তার কবরে উৎকীর্ণ রয়েছে, “এখানে শায়িত আছে সাইয়িদ মুহাম্মদ আলি আল হিন্দি”।

শওকত আলি ১৮৭৩ সালে উত্তর প্রদেশের রামপুরে  জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ করেন। তিনি ক্রিকেটের ভক্ত ছিলেন ও বিশ্ববিদ্যালয় দলের অধিনায়ক হতেন। মহাত্মা গান্ধী তাকে রাজনীতিতে নিয়ে আসেন।
শওকত আলি ১৮৯৬ থেকে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত যুক্ত প্রদেশে সরকারি চাকরিতে বহাল ছিলেন।

১৯১৯ সালে রাজদ্রোহ অভিযোগ ও প্রতিবাদ সংগঠনের কারণে কারাগারে থাকার সময় তিনি খিলাফত সম্মেলনের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। অসহযোগ আন্দোলনের সময় মহাত্মা গান্ধী ও কংগ্রেসকে সমর্থন করার কারণে ১৯২১ থেকে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত তিনি কারাগারে ছিলেন। তার ভক্তরা তাকে ও তার ভাইকে মাওলানা উপাধি দেয়। ১৯২২ সালের মার্চে তিনি রাজকোট কারাগারে ছিলেন।

কংগ্রেস ও এর অহিংস নীতির সমর্থক হলে তিনি ও তার কিছু সহকর্মী স্বাধীনতার জন্য বিপ্লবী আন্দোলনকেও সমর্থন করেন। তিনি শচীন্দ্রনাথ সেনালকে অস্ত্র সরবরাহ করেছিলেন।তিনি ও তার ভাই মহম্মদ আলি কংগ্রেস ও গান্ধীর নেতৃত্বের ব্যাপারে নেতিবাচক দিকে সরে আসেন। মাওলানা মুহাম্মদ আলি কারাগারে থাকায় শওকত আলি ও বেগম মুহাম্মদ আলি নেহেরু রিপোর্টের উপর সর্বদলীয় সম্মেলনে কেন্দ্রীয় খিলাফত কমিটির ৩০ সদস্যসহ খিলাফত কমিটির নেতৃত্ব দেন। এদের মধ্যে ছিলেন মুহাম্মদ ইফরান, মহিউদ্দিন আজমেরি, ইয়াসিন নুরি, এস. কে. নবিবউল্লাহ, গুলশার খান, মুহাম্মদ ইবরাহিম, মনজুর আলি তাইব, মুসা খান, আজাদ সুবহানি, মুহাম্মদ জাফরি, লাল বাদশাহ, আবদুল মজিদ দারিয়াবাদি, রউফ পাশাম, মুহাম্মদ উসমান, আবদুল মজিদ, ড. মাগফুর আহমেদ আজাজি, হাশিম আবদুর রহমান, খাজা গিয়াসউদ্দিন, ইলাহি বখশ, আবদুল মহসিন মুহাম্মদ সাজ্জাদ, সুলাইমান কাসিন, আলি মুহাম্মদ জালালউদ্দিন, আবদুল রউফ, ফাতেহ মুহাম্মদ, মুহাম্মদ জান, আহমেদ ভামরিওয়ালা, আবদুল আহাদ খান, হেমায়েতউল্লাহ, মুহাম্মদ বখশ ও জাহিদ আলি।

১৯২৮ সালে তিনি নেহেরু রিপোর্টের বিরোধিতা করেন এবং মুসলিমদের জন্য পৃথক নির্বাচনের দাবি জানান। খিলাফত কমিটি শেষ পর্যন্ত নেহেরু রিপোর্ট প্রত্যাখ্যান করে। তিনি লন্ডনে প্রথম ও দ্বিতীয় গোল টেবিল সম্মেলনে অংশ নেন। তার ভাই ১৯৩১ আলে মৃত্যুবরণ করলে তিনি কাজ চালু রাখেন এবং জেরুজালেমে বিশ্ব মুসলিম সম্মেলন সংগঠিত করেন।

১৯৩৬ সালে মাওলানা শওকত আলি নিখিল ভারত মুসলিম লীগে যোগ দেন এবং মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর একজন ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্রে পরিণত হন। ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত তিনি কেন্দ্রীয় আইনসভার সদস্য ছিলেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্য ভ্রমণ করেন এবং ভারতীয় মুসলিমদের জন্য সমর্থন তৈরী করেন।

মাওলানা শওকত আলি ১৯৩৯ সালের ৪ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন।

বাই আম্মা (আবেদি বেগম) : সওকাত আলি ও মহাম্মদ আলির জননী ছিলেন। ১৯২১-এর ডিসেম্বরে তার সন্তানদের বন্দিত্বের সংবাদ তিনি খুশি মনে গ্রহণ করেন। গুজব ছড়িয়েছিল যে তার পুত্র মহাম্মদ আলি রাজভিক্ষায় জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন, তখন তিনি বলেছিলেন- “মহাম্মদ আলি ইসলামের পুত্র, সে কখনোই ক্ষমা ভিক্ষা চাইতে পারে না। যদি সে এটা করে থাকে, তাহলে আমার বুড়ো হাত তাকে দমণ করার জন্য যথেষ্ট।” তিনি নিজে চরকায় কাটা সুতার পোষাক পরতেন এবং অন্যদেরকেও খাদি পরতে উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির জন্যকঠোর পরিশ্রম করেন এবং এটাকে তিনি ঈমাণের অঙ্গ বলে মনে করতেন।

সূত্র উইকিপিডিয়া