লাগাতার বঞ্চনার শিকার রাজ্যের মাদ্রাসা শিক্ষা ও আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়

লাগাতার বঞ্চনার শিকার রাজ্যের মাদ্রাসা শিক্ষা ও আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়

কলমে শিক্ষক সেখ সাইদুল হক

মাদ্রাসা শব্দটি হলো আরবি শব্দ। মানে হলে শিক্ষা কেন্দ্র বা জ্ঞান অর্জন কেন্দ্র। আমাদের দেশে মাদ্রাসা শিক্ষা শুরু ও বিস্তার লাভ করে মূলত মধ্য যুগে। মুসলিমদের ভারত আগমণের পর। সারা দেশের মতো অবিভক্ত বাংলাতে মক্তব ও মাদ্রাসা গড়ে উঠেছিল ব্যক্তি বদান্যতায়। আরবি-ফরাসীর পাশাপাশি পরবর্তী পর্যায়ে এগুলিতে উর্দু বা বাংলা শিক্ষার প্রচলন শুরু হয়। এগুলি কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকারী আনুকুল্য পেতে থাকে। ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে ১৭৮০ সালে সরকারী ব্যবস্তাপনায় ও ব্যয়ে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা গড়ে উঠে। বাংলায় মাদ্রাসা শিক্ষার ইতিহাস নিয়ে বহু আলোচনা ও লেখালেখি হয়েছে ও হচ্ছে। এখানে ঐ প্রসঙ্গে আর না গিয়ে বর্তমানে তৃণমূল জামানায় কিভাবে রাজ্যের মাদ্রাসা ও আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা বঞ্চনার শিকার তার ওপর আলোকপাত করব। প্রাসঙ্গিক ভাবে বাম জামানার কিছু কথা উল্লেখ করতেই হবে।
মাদ্রাসার প্রকার ভেদ-
বর্তমানে রাজ্যে যত মাদ্রাসা আছে তাকে মূলত পাঁচটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে (১) হাই মাদ্রাসা (জুনিয়ার সহ) (২) সিনিয়র মাদ্রাসা (৩) অনুমোদন প্রাপ্ত আনএডেড মাদ্রাসা (৪) মাদ্রাসা শিক্ষা কেন্দ্র (৫) খারিজী মাদ্রাসা।
প্রথম চার ধরনের মাদ্রাসা পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা শিক্ষা পর্ষদের অনুমোদনপ্রাপ্ত। এগুলির পাঠ্যসূচি এবং পাঠ্যক্রম হাইস্কুলের পাঠ্যসূচির সমতুল। কেবল বাড়তি ১০০ নম্বরের এ্যারাবিক ও ইসলামিক স্ট্যাডিজ পড়ানো হয়। আনএডেডগুলি বাদ দিয়ে বাকী প্রথম তিন ধরমের মাদ্রাসাগুলির জন্য রাজ্য সরকার অর্থ ব্যয় করে। রাজ্যে বর্তমানে ৬১৪টি হাই ও সিনিয়র মাদ্রাসা আছে এর মধ্যে ২১টি এখন নন-ফ্যানশানাল ছাত্র শিক্ষক কিছুই নেই। ২৩৪টি আর্থিক অনুদানহীন অনুমতিপ্রাপ্ত মাদ্রাসা আছে। হাজারের কাছাকাছি মাদ্রাসা শিক্ষা কেন্দ্র আছে। খারিজী মাদ্রাসাগুলি সম্পূর্ণভাবে বেসরকারী উদ্যোগে গড়ে উঠেছে। এগুলিতে পুরোপুরি ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া হয়। খারিজী মাদ্রাসার সংখ্যা কত তার নির্দিষ্ট কোন পরিসংখ্যান নাই। তবে একটি বেসরকারী সমীক্ষা মতে এই সংখ্যা পাঁচ হাজারের ওপর।
বাম জামানায় মাদ্রাসা শিক্ষা –
রাজ্য সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরটি তৈরী হয় বাম সরকারের জামানায়। সপ্তম বামফ্রন্ট সরকারের আমলে গঠন করা হয় মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের অধীন পৃথক মাদ্রাসা শিক্ষা ডাইরেক্টরেট। মাদ্রাসা শিক্ষার অধুনিকীকরণের ও উন্নয়নের লক্ষ্যে বাম সরকার ১৯৭৭ সালে মোস্তাকাবিন কাশেমের নেতৃত্বে এবং ২০০১ সালে প্রাক্তন রাজ্যপাল ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এ. আর. কিদোয়াই-এর নেতৃত্বে কমিটি গঠন করে এবং তাঁদের সুপারিশগুলি কার্যকরী করে। ১৯৭৭ সালে মাদ্রাসা ছিল ২৩৮টি। বাম জামানায় তা বেড়ে হয় ৬০৯টি। এর বাইরে বাম সরকার হাজারেও বেশী মাদ্রাসা শিক্ষা কেন্দ্র চালু করে। মাদ্রাসাগুলির আর্থিক দায় ভার রাজ্য সরকার গ্রহণ করে। মাদ্রাসা শিক্ষাকে মাধ্যমিকের সমতুল মর্যাদা দেওয়া হয়। মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগের জন্য ২০০৮ সালে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন তৈরী করা হয়। এগুলিকে সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দেওয়া হয়। মাদ্রাসাগুলিতে সংখ্যালঘু অংশের বাদ দিয়ে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর বহু ছেলে মেয়ে ভর্তি হয়। ১৯৭৭ সালে যেখানে মাদ্রাসাগুলিতে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ১৫৬৫ জন। ২০১০-১১ সাতে তা বেড়ে হয় ৪ লক্ষ ৫০ হাজার। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশী ছাত্রী (প্রায় ৬০ শতাংশ)। সাচার রিপোর্টেই উল্লেখিত হয়েছে সারা দেশে যেখানে বিদ্যালয়ে যাওয়ার মধ্যে মাত্র ৩ শতাংশ পড়ে মাদ্রাসায়। পশ্চিমবঙ্গে সেখানে পড়ে ১৫ শতাংশ। বাম জামানায় এ রাজ্যের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রশংসিত হয়েছে।
তৃণমূল জামানায়-
তৃণমূলের জামানায় গত ১১ বছরে রাজ্যে মাদ্রাসার সংখ্যা বেড়েছে মাত্র ৫টি। অর্থাৎ ৬০৯ হতে হয়েছে ৬১৪টি। যে ২০০টি নিউ সেট আপ মাদ্রাসার কথা এই সরকার বলছে তার অনুমোদন হয় বাম জামানাতেই। গত ১১ বছরে এর মধ্যে কয়টি চালু হয়েছে? ঐগুলির জন্য ১০০০টি শিক্ষক-শিক্ষিকার পদ অনুমোদিত হয় বাম জামানায়। আজ পর্যন্ত কতগুলি পদপূরণ হয়েছে? মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেই তৃণমূল সুপ্রীমো বলেছিলেন ১০ হাজার মাদ্রাসাকে অনুমোদন দেওয়া হবে। কতগুলি দেওয়া হয়েছে? মাত্র ২৩৪টি। তাও এদেরকে কোন আর্থিক অনুদান দেওযা হয় না। কেন? কেন এগুলি আজও চরম বঞ্চনার শিকার? এখানকার প্রায় ২৫০০ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষাকর্মী চরম বঞ্চনার শিকার। ছাত্র-ছাত্রীরা মিড-ডে মিলের বরাদ্দ পর্যন্ত পায় না। যে ৪০৫টি মাদ্রাসা শিক্ষা কেন্দ্র বাম জামানার শেষে অনুমোদনের প্রক্রীয়ায় ছিল তা আজও অনুমোদন পায়নি। মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগের জন্য ২০০৮ সালে বাম জামানায় মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন তৈরী হলো। ২০১৩ সালে রাজ্য সরকারের গাফিলতিতে এবং ইচ্ছাকৃত অবহেলা করে বিষয়টি নিয়ে তৎপর না হওয়ায় হাইকোর্ট মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে বাতিল করলো। এর বিরুদ্ধে রাজ্য সরকার ডিভিশনে আবেদন করল না। উল্টে লুটে পুটে খাবার জন্য মাদ্রাসাগুলিতে পরিচালন সমিতির মাধ্যমে নিয়োগ হবে তার একটি মেমোও প্রকাশ করে দিল। মাদ্রাসা শিক্ষকদের একটি সংগঠন সুপ্রীম কোর্টে গিয়ে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে পুনরায় লাগু করার উদ্যোগ গ্রহণ করল। আর যারা এই লুটে পুটে খাওয়ার উদ্যোগ ও পদক্ষেপ নিয়েছিল বর্তমান সরকার তাদেরকে এখন সব গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাচ্ছে। ঐ আলোচনা না বাড়িয়ে বর্তমানে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি কি ধরণের বঞ্চনা এই সরকার করে চলেছে তার কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি।
ক) বাংলার শিক্ষা পোর্টাল – এই রাজ্যের সমস্ত স্কুলগুলি ২০১৯ সাল থেকেই বাংলা শিক্ষা পোর্টালের অন্তর্ভূক্ত। কিন্তু মাদ্রাসাগুলি অন্তর্ভূক্ত হলো ২০২১ সালে। কেন ২ বছর পর? তাও সমালোচনার মুখে পড়ে। স্কুলগুলির যখন শিক্ষা পোর্টালে অন্তর্ভূক্ত হয় তখন বিভিন্ন কর্মশালা ও ট্রেনিং ক্যাম্প হয়। অথচ মাদ্রাসাগুলি যখন যুক্ত হলো তখন কোন ট্রেনিং না করে প্রধান শিক্ষকদের হোয়াটস এ্যাপে গ্রুপে ম্যাসেজে করে জানান হলো আপনাদের ছাত্র-ছাত্রীদের সমস্ত ডেটা বাংলার শিক্ষা পোর্টালে অমুক তারিখ হতে এন্ট্রি করুন। কিন্তু কিভাবে এন্ট্রি করা হবে তার কোন আলোচনা শিবির হলো না। ২০১১ শিক্ষাবর্ষ শেষ হতে চলল। এখনো মাদ্রাসুগলির জন্য প্রদত্ত বাংলার শিক্ষা পোর্টাল তথৈবচ।
খ) ট্যাব গ্রান্ট (তারুণ্যের স্বপ্ন প্রকল্প) – রাজ্য সরকার ২০২১-এর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের অতিমারি করোনার প্রেক্ষাপটে অনলাইনে পড়াশোনা করতে ট্যাব বা স্মার্ট ফোন কেনার জন্য এককালীন অনুদান দশ হাজার টাকা দিচ্ছে। স্কুল এবং মাদ্রাসায় উচ্চমাধ্যমিক কাউন্সিল একটাই। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ। দুক্ষেত্রেই একই সিলেবাস, বই পত্তর একই, বিষয় অনুমোদনের একই জায়গা। অথচ দেখা গেল ঐ টাকা স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের পাওযার কোথাও কোথাও এক পক্ষ কাল বা এক মাস পরে, কোথাও এখনও পায়নি মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রীরা। কেন এই রকম বঞ্চনা? অ্যাকাউন্ট বিভ্রাটে যারা টাকা পায় না তারা বারবার জানাচ্ছে কিন্তু তারা আর পাচ্ছেই না। স্কুলগুলির এই ধরণের ঘটনায় বিদ্যালগুলি ইমেল করে জানালে সংশোধন হয়ে যাচ্ছে। অথচ মাদ্রাসাগুলির ক্ষেত্রে ঠিকমতো উদ্যোগ ডাইরেক্টর অব মাদ্রাসা এডুকেশন গ্রহণ করছে না। আবার বলা হচ্ছে গতবারের টাকা এখন আর পাওয়া যাবে না। কিন্তু কেন? দায়টা কার? ঐ সরকারী দপ্তরটি কি করছে?
গ) বই পত্র, খাতা, ব্যাগ, ড্রেস, জুতো – স্কুল-মাদ্রাসা সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সমস্ত ছাত্র-ছাত্রী সবাই বিনাপয়সায় বইখাতা পেয়ে থাকে। স্কুলগুলির ক্ষেত্রে নভেম্বর বা ডিসেম্বরের মধ্যভাগে পৌঁছালেও মাদ্রাসাগুলির ক্ষেত্রে পেতে দুই/তিন মাস দেরী হয়ে যায়। একই অবস্থা একাদশ-দ্বাদশের ক্ষেত্রে।
জামা জুতো ব্যাগ স্কুলগুলি বছরের শুরুতে পেলেও মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রীদের তা পেতে বছরের শেষ হয়ে যায়। ড্রেসের ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের ইউনিফর্ম কোড মানা হয় না। স্কুলের ক্ষেত্রে যেখানে টেলার্স স্কুলে স্কুলে এসে ছাত্র-ছাত্রীদের পোশাকের মাপ নিয়ে পোশাক তৈরী করে মাদ্রাসার ক্ষেত্রে সেটা ভাবাই হয় না। ফলে বহু ছাত্র-ছাত্রীর ড্রেসের সাইজ মেলেই না। প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি মাদ্রাসা ছাত্র-ছাত্রীর জুতো সাইজ মেলে না। আগে ড্রেসের টাকা মাদ্রাসাতে যেত। নিজেই এখন দপ্তর কনট্যাক্ট দিয়ে করাচ্ছে। কেন? সিনিয়ার মাদ্রাসায় ছাত্ররা হাফ প্যান্ট পড়ে না। অথচ তাই দেওয়া হলো, কেন?
ঘ) ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত – সরকারী নির্দেশ অনুসারে হওয়া উচিত ৩৫ : ১। কিন্তু মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তর দিনাজপুর যেখানে মাদ্রাসার সংখ্যা সর্বাধিক সেখানে এই অনুপাত গড়ে ১০০ : ১। বহু মাদ্রাসায় দীর্ঘদিন শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পদ খালি পড়ে আছে। শিক্ষকের অভাবে মাদ্রাসাগুলি ধুঁকছে। গুণমান কি জায়গায় দাঁড়াবে? অনুমোদিত পদগুলির এখনও প্রায় অর্ধেক ফাঁকা। বহু মাদ্রাসায় শিক্ষা কর্মী পদ ফাঁখা। ৩৬৭টি মাদ্রাসায় প্রধান শিক্ষক নেই। এদিকে সরকারের কোন নজর নেই।
ঙ) ন্যাস (NAS)- গত অক্টোবর মাসের প্রথম হতে National Achievement Test (NAS)এর কথা বিদ্যালয়গুলিতে আলোচিত হচ্ছে। অথচ মাদ্রা শিক্ষা ডাইরেক্টর বলছেন তিনি নিজেই জেনেছেন নভেম্বর মাসে। কি বঞ্চনা বুঝুন। রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় শিক্ষা দপ্তরকে বুঝায় নি যে রাজ্যে মাদ্রাসা শিক্ষার আলাদা দপ্তর আছে।

চ) উৎশ্রী – স্কুলগুলিতে উৎশ্রী চালু হলো। ইতিমধ্যে কিছু শিক্ষক ট্রান্সফার পেয়ে বাড়ীর কাছাকাছি চলে গেল। মাদ্রাসায় সেটাও শুরুই হলো না। এটা কেন হবে? রাজ্য সরকারের কেমন সংখ্যালঘু দরদ? কেন এই দ্বিচারিতা?
বাম জামানায় মাদ্রাসা বোর্ড স্বচ্ছতার সাথে দুরন্ত গতিতে কাজ করতো। আর এখন। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। কখনও প্রশাসক দিয়ে চালানো হচ্ছে। কোন দিশা নেই। আসামে বিজেপি সরকার মাদ্রাসা বোর্ড তুলে দিয়ে মাদ্রাসাগুলির মাদ্রাসা নাম মুছে দিয়ে সেগুলিকে শিক্ষা বোর্ডের অধীনে নিয়ে এলো। আর এরাজ্যে মুখে না বললেও সেই দিকে সরকার আগাচ্ছে। এখনই পারবে না। কিন্তু সরকার মাদ্রাসাগুলিকে অপাংক্তেয় করে রেখে দিয়ে এগুলির মর্যাদা ও গুরুত্বকে নষ্ট করে দিতে চাইছে। এই শিক্ষা ব্যবস্থাকে দ্বিতীয় শ্রেণীর পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাইছে যাতে অভিভাবকরা ছাত্র-ছাত্রী না পাঠায় এবং মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা শুকিয়ে মরে। ২০১০ সালে বামফ্রন্ট সরকার মাদ্রাসা শিক্ষক নিয়োগ ও বদলীর বিধি তৈরী করে। ইতিমধ্যে শিক্ষার অধিকার আইন লাগু হয়। তারপর এন.সি.টি.ই. ছয়বার বিধি তৈরী করেছে। তার সাথে সঙ্গতি রেখে গত ১১ বছরে তৃণমূল সরকার কোন বিধি তৈরী করে নি। ফলে সমস্যা তৈরী হচ্ছে।

আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় – বর্তমানে প্রায় দুই বছরের বেশী সময় ধরে গর্বের প্রতিষ্ঠান আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অচলাবস্থা তৈরী হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, শিক্ষাকর্মীরা আন্দোলন করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ভুলণ্ঠিত হচ্ছে।
উচ্চ শিক্ষা এবং প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষায় সংখ্যালঘুদের অংশগ্রহণ বাড়াতে বাম জামানায় ২০০৮ সালে গঠিত হয় আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। কলকাতা মাদ্রাসা কে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এ পরিবর্তিত করা হয়। তিনটি ক্যাম্পাসে বাম জমানাতেই শুরু হয় পঠন পাঠান। দ্রুত মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক শিক্ষিকা নিয়োগ করে তালতলা ক্যাম্পাসে বিএড, পার্ক সার্কাস ক্যাম্পাসে আরবী সহ কলা বিভাগ এবং নিউটাউন মেন ক্যাম্পাসে বিজ্ঞান, কারিগরি ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ পূর্ণ কদমে চালু হয়ে যায়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সহ সব অংশের ছাত্র ছাত্রীরা এখানে পড়াশুনা করে। বর্তমানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর এবং গবেষক মিলিয়ে প্রায় ছয় হাজার ছাত্র ছাত্রী আছে।
সেই গর্বের প্রতিষ্ঠান আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এ এখন তৈরি হয়েছে অচলাবস্থা। ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ, অস্থায়ী ও অশিক্ষক কর্মচারী রা বেতন পাচ্ছেন না, টাকার অভাবে বিদ্যুৎ বিল মেটাতে না পারায় সিইএসই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেব বলেছে। এসবের মূল কারণ রাজ্য সরকার ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ আটকে রেখেছে। উল্লেখ্য যে এই বিশ্ববিদ্যালয সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও শিক্ষা দপ্তরের অধীন। ২০১৬ সালে তৎকালীন উপাচার্য-এর অগণতান্ত্রিক পরিচালন নিয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। তৃনমূল সরকারই ঐ উপাচার্যকে নিয়োগ করেন। বিক্ষোভের ফলে তৎকালীন উপাচার্য পদত্যাগ করলে রাজ্য সরকার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপককে উপাচার্য নিয়োগ করে।

বর্তমান অচলাবস্থার যে কারনের কথা শোনা যাচ্ছে তা হলো সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও শিক্ষা দপ্তর কারিগরি প্রশিক্ষণের জন্য কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের অর্থ বরাদ্দ মিলিয়ে কয়েক কোটি টাকা ঐ বিশ্ববিদ্যালয়কে দেয়।এই প্রশিক্ষণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের চুক্তি হয়। চুক্তি মোতাবেক প্রশিক্ষণের অর্থ বিশ্ববিদ্যালয় দেবে এবং ঐ সংস্থা নিয়োগের উদ্যোগ নেবে। কিন্তু ঐ সংস্থা প্রথম কিস্তির অর্থ নিয়েও নিয়োগের কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করে নি। বিশ্ববিদ্যালয় তাই দ্বিতীয় কিস্তির টাকা আটকে দেয়। খবরে প্রকাশ শাসক দলের ঘনিষ্ঠ কেউ কেউ ঐ বেসরকারী সংস্থার সাথে নানা ভাবে যুক্ত থাকায় সরকার হতে উপাচার্য কে অর্থ মিটিয়ে দেবার জন্য চাপ তৈরি করা হয়। সরকার ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ না দিয়ে উল্টে নিয়োগ দূর্ণীতির ও অর্থ ব্যয়ে অসঙ্গতির কথা তুলে সংখ্যালঘু দপ্তরের প্রধান সচিব মাধ্যমে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে এই সমস্ত নিয়োগ ও অর্থ ব্যয় হয়েছে বর্তমান সরকারের জামানায়, আবার সেই সরকারই দূর্ণীতির কথা তুলে তদন্ত কমিটি তৈরি করেছে। বরাদ্দ আটকে রেখেছে। তৃনমূলীদের নিজেদের ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে ঝামেলায় শিকার হচ্ছে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে পঠনপাঠন, গবেষণা।

আরো যে কারনের কথা শোনা যাচ্ছে তাহলো ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ একরের মতো যে জায়গা পার্ক সার্কাস এলাকায় আছে তা সরকার নিতে চায়। আরো শোনা যাচ্ছে সম্প্রতি এই বিষয়ে মুখ্য সচিব ঐ দপ্তরের প্রধান সচিব, এবং উপাচার্য কে নিয়ে একটি সভা করেছেন যেখানে মাননীয় এক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী নাকি উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু অচলাবস্থা কাটেনি। বাম জামানায় তৈরী গর্বের এই প্রতিষ্ঠান বর্তমান জামানায় বদনামের শিকার হচ্ছে।

বর্তমানে ছাত্র ছাত্রীরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। অধ্যাপক অধ্যাপিকারাও আন্দোলনে সামিল হয়েছে। অথচ অচলাবস্থা নিরসনে রাজ্য সরকার আন্তরিক কোন উদ্যোগ নেয় নি। দ্রুত বকেয়া ও পাওনা টাকা দেবার কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ঐ জমি কোনভাবেই হাসপাতাল বা অন্য কোন সরকারী দপ্তরকে না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ এবং হোস্টেল ও গবেষণা কেন্দ্র নির্মাণে লাগানো হোক। আলিয়া মাদ্রাসার সমস্ত সম্পত্তি আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কে হস্তান্তর করা হোক। তদন্ত রিপোর্ট দ্রুত প্রকাশ করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

আসলে ঘটনা প্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে সরকার চাইছে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কে সংখ্যালঘু দপ্তর থেকে উচ্চ শিক্ষা দপ্তরে নিয়ে আসতে। মাদ্রাসার মতোই আলিয়া তে সমস্ত জনগোষ্ঠীর ছেলে মেয়েরা পড়ে। শিক্ষক শিক্ষিকারাও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর। তথাপি আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় সংখ্যালঘু ছাত্র ছাত্রীদের ভরসাস্থল। সরকার সেই জায়গাটা ভেঙে দিতে চাইছে।

পরিশেষে বলা যায় এই সরকারের সংখ্যালঘুদের শিক্ষার বিস্তার ও তার উন্নয়নে কোন আন্তরিকতা নেই।তার চেয়ে বেশি আগ্রহী সংখ্যালঘু ভোটের প্রতি। তাই চাই চমকদারিত্ব। একদিকে বিজেপি কে বাড়তে সাহায্য করে সংখ্যালঘু দের মধ্যে ভীতি তৈরি করো, অপরদিকে ঐ অংশের যুবকদের মধ্যে একটি অংশ কে উচ্ছৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলো।যারা শিক্ষা নয়, তোলাবাজিতে অভ‌্যস্ত হবে, আবার দলের হয়ে ভোট করবে। তাই সময় এসেছে এই সব ভাঁওতা ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার এবং জনগনকে সচেতন করার।