ভারতে আধুনিক শিক্ষার পথিকৃৎ ছিলেন দেশের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ

ভারতে আধুনিক শিক্ষার পথিকৃৎ ছিলেন দেশের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ

মুহাম্মাদ আব্দুল মোমেন

ভারতের “চাইনিজ ম্যান” কিম্বা “সুপার ম্যান” হিসেবে অতি আদরণীয় উপাধী লাভ করেছিলেন অত্যন্ত রক্ষণশীল পরিবারের মধ্যে কঠোর ইসলামি অনুশাসনের মধ্যে বেড়ে ওঠা একজন মানুষ, যার প্রকৃত পরিচয় মাওলানা। মাওলানা নামের সঙ্গে এক শ্রেণির মানুষের মনের সঙ্গে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য জড়িয়ে রয়েছে। মাওলানা বলতে তারা বোঝে মধ্যযুগীয় পোশাক – আশাক শোভিত এবং জঙ্গলী চেহারার মানুষ। আধুনিক জ্ঞান ও মননের ধারেকাছেই তো নেই-ই, সাধারণ জ্ঞানগম্মি শূন্য। কিন্তু আজকের প্রতিবেদনটির উপজীব্যই হচ্ছে মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যাক্তির আধুনিক মননশীলতার সুফল।
আজ ১১ নভেম্বর। ১৮৮৮ সালের আজকের দিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। তাঁর এই জন্মদিনটিকে ভারত সরকার জাতীয় শিক্ষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। কিন্তু কেন একজন মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষের জন্মদিনকে সম্মান জানিয়ে শিক্ষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করতে হল? তার পশ্চাতের রহস্য অনুসন্ধান করা যাক।
মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত মাওলানা আবুল কালাম আজাদ স্বাধীন ভারতের কেবল প্রথম শিক্ষামন্ত্রীই ছিলেন না। ভারতীয় শিক্ষা জগতে তিনি যে বিপ্লব এনেছিলেন, তার সুফল প্রতিটি ভারতীয় আজও ভোগ করছেন ভবিষ্যতেও ভোগ করতে থাকবে, তা অস্বীকার করার ক্ষমতা কোন ভারতীয়ের নেই। ভারতীয় শিক্ষা ক্ষেত্রে তিনি যেধরনের নবতর সংযোজন ও সংস্করণের আমদানি করেছিলেন, সত্তর বছর পার করার পরেও আজও তাকে অপ্রাসঙ্গিক প্রমাণ করার হিম্মত কারো হচ্ছে না। তাই তো তাঁকে স্বাধীন ভারতে আধুনিক শিক্ষার প্রতিষ্ঠাতা আক্ষায়িত করা হয়।
তাঁর শিক্ষাচেতনা কেন আজও প্রাসঙ্গিক?

মাওলানা আজাদ ছিলেন একদিকে যেমন স্বাধীনচেতা দেশপ্রমিক, স্বাধীনতাসংগ্রামী ও দেশ সেবক৷ অপর দিকে তিনি ছিলেন ঐক্যবদ্ধ সমাজ গড়ার অন্যতম কারিগর এবং শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারক ৷ ধর্মীয় চেতনায় নিখাদ ধার্মিক হলেও সামাজিক ও দেশ চেতনার ক্ষেত্রে তিনি আধুনিক ও উদার। তাঁর সম্পর্কে এই বিশ্লেষণ কেবল গল্পকথা নয়। তার জীবণময় কর্ম ও লেখনী জ্বলন্ত শাক্ষ্য বহন করছে। মাওলানা আজাদের লেখা সাড়া জাগানো গ্রন্থ ‘ইন্ডিয়া উইন্স ফ্রিডম’ পড়লে তা উপলব্ধি করা যায়।
মাওলানা আজাদের আব্বা খায়রুদ্দিন সাহেবের ছিল ধর্ম ও মাজহাবের প্রতি কঠোর ভক্তি৷ তাই তিনি ছেলেকে ধর্মীয় শিক্ষা ব্যাতিত আর কোন শিক্ষার কথা ভাবেনই নি৷এমনকি সেই ধর্মীয় শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে এমনই সতর্কতা অবলম্বন করেন যাতে কোন সঙ্গতে ছেলে মাজহব চ্যুত না হয়ে যায়৷ তার জন্য তিনি তাঁর পুত্র আবুল কালাম মঈনুদ্দিন আহমেদকে শিক্ষাদানের জন্য কোনো প্রথাগত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিরাপদবোধ করেন নি৷ ফলে কঠোর অনুশাসনে নীজ গৃহাভ্যান্তরে নিজের পছন্দের বিজ্ঞ বিজ্ঞ আলিম উলামাদের দ্বারা সম্পুর্ণ মাদ্রাসার পাঠক্রম অনুসরণ করে শিক্ষাপ্রদানের ব্যবস্থা করেন৷ এর পাশাপাশি মূল স্রোতের শিক্ষার ব্যবস্থাও করেছিলেন৷
স্বাধীনতা সংগ্রাম ও গান্ধীজীর সাহচর্যঃ-
মাওলানা আবুল কালাম আজাদের সংগ্রামী ও কর্মজীবনের সূচনা হয় খিলাফত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে৷খিলাফাত আন্দোনের নেতৃত্ব দানকালে ঘটনাচক্রে গান্ধীজীর সংর্স্পর্শে আসেন৷ তিনি গান্ধীজীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর অহিংস পদ্ধতির সত্যাগ্রহ ও অসহযোগ আন্দোনে গান্ধীজীর অসহযোগী হয়েযান৷ আন্দোলনকে আরও প্রসারিত ও তীব্র করার জন্যে জনমত গঠনের উদ্দশ্যে ১৯১২ সালে কলকাতা থেকে উর্দ্দু ভাষায় “আল হিলাল” নামে পত্রিকা প্রকাশ করেন৷ এই পত্রিকার মাধ্যমে ইংরেজ সরকর বিরোধী জনমত গঠনমূলক প্রবন্ধ প্রকাশ করে ইংরেজ বিরোধিতায় জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। ইংরেজ সরকার তা জানতে পরে ১৯১৪ সালে ওই পত্রিকাটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে৷

আল হিলাল নিষিদ্ধ হওয়ার পরেও মাওলানা আজাদকে দমানো যায়নি৷ তিনি আবারও ” আল বালাগ” নামে আর একটি পত্রিকা প্রকাশ করতে থাকেন৷ তাতেও নিয়মিত ভাবে ইংরেজ বিরোধী প্রবন্ধ প্রকাশ করতে থাকলেন৷ ইত্যবসরে ১৯১৯ সালে ইংরেজ সরকার কালা কনুন “রাওলাট আইন” লাগু করে৷ আজাদ সেই আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে কারারুদ্ধ হন৷ তাঁকে রাঁচী জেলখানাতে বন্দি করে রাখা হয়৷

আজাদ ছিলেন জাতীয় ঐক্যে নিবেদত প্রাণ:
আবুল কালাম আজাদ হিন্দু – মুসলিম বিভেদের বিপক্ষেছিলেন৷ তাঁর পত্রিকা “আল হিলাল” ও ‘আল বালাগ” এর মধ্যমে ঐক্যের প্রচেষ্টা চালিয়ছিলেন৷ আবার যখন মুসলিম লীগ পাকিস্তানের ইস্যু তুলেছে আজাদ লীগের ইস্যুকে সাম্প্রদায়ক ইস্যু বলে উপেক্ষার মনোভাব দেখিয়েছেন৷এমনকি কঠোর সমালোচনাও করেছিলেন৷ দেশ ভাগেরও তীব্র বিরোধী ছিলেন৷ বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতায় আন্দোলরত অরবিন্দ ঘোষ ও শ্যামসুন্দর চক্রবর্তীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন৷জাতীয় ঐক্য ও দেশের প্রতি তাঁর আনুগত্যতার চরমতম মনোভাবের নমুনা পাওয়া যায় তাঁর এই উক্তিতে-“ভারতীয় হিসেবে গোটা ভারতবাসীর উন্নয়নই ভারতের প্রকৃত উন্নয়ন”৷ ফলে ধর্মীয় জিগির বাঞ্চনীয় নয়”৷

স্বাধীন ভারত ও আজাদের কীর্তি:
১৯৪৭ সালের ১৫ আগষ্ট স্বাধীন ভারতে গঠিত প্রথম মন্ত্রীসভায় তিনি শিক্ষামন্ত্রী মননীত হন৷ এই পদে তিনি আমৃত্যূ অর্থাৎ ২ ফেব্রুয়ারী ১৯৫৮ পর্যন্ত আসীন ছিলেন৷ এক দশকের অধিক কাল লিক্ষামন্ত্রী থাকার সুবাদে, ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় অসামান্য সংস্কার সাধন করেন।তাঁর সংস্কারগুলি গোটা গোটা বাক্যে উল্লেখ করলে এমন বলা যায় –

ভারতে প্রযুক্তিবিদ্যার উদ্ভাবক মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। করণ তিনিই ভেবেছিলেন মূলস্রতের শিক্ষার পাশাপাশি প্রযুক্তি শিক্ষায় শিক্ষিত না করতে পারলে দেশ সময়ের সাথে তালমিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারবেনা। তাই তিনিই উদ্বোগ নিয়ে “ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি” প্রতিষ্ঠা করেন।
অভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় নীতিনির্ধারক হলেন মাওলানা আজাদ। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ইউনিভার্সাল সিস্টেমে আনার প্রয়োজনীয়তা তিনিই অনুভব করেছিলেন। তাই তিনি ১৯৫৩ সালে ইউনিভার্সিটি গ্রাণ্ড কমিশন বা ইউজিসি গঠন করেন।
* আবশ্যিক সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার প্রবক্তা হলেন আজাদ। মাওলানা আবুল কালাম আজাদই ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত সমস্ত বাচ্চার অবৈতনিক ও আবশ্যিক শিক্ষানীতি নির্ধারণ করেছিলেন। ২০০৯ সালে ভারতের মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী কপিল সিব্বাল “ফ্রি এ্যণ্ড কম্পালসরি এডুকেশন এ্যক্ট” আইন করেছেন তা মাওলানা আবুল কালাম আজাদের দেখানো পথ অনুসরণ করে। ভারত সরকার ‘সর্বশিক্ষা অভিযান’ যা নাম পরিবর্তিত হয়ে ‘সর্বশিক্ষা মিশন’ বর্তমান সমগ্র শিক্ষা মাশন’ গঠিত হয় আবুল কালাম আজাদের নীতির প্রতিফলন ঘটাতে।

সুতরাং উল্লেখিত বিষয়গুলির কার্যকারিতা এবং গুরুত্ব আজও পর্যন্ত রয়েছে। অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের পরপরই মাওলানা আবুল কালাম আজাদ যে সমস্ত পরিকল্পনা এবং শিক্ষানীতি গ্রহণ করেছিলেন। ডিজিটাল জগতেও তা প্রাসঙ্গিক। অর্থাৎ ডিজিটাল বিশ্বে ডিজিটাল ইন্ডিয়ার অনুপ্রবেশ মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত মাওলানা আবুল কালামের পদাঙ্ক অনুসরণ করে।
ভারত সরকারের স্বীকৃতি ও সন্মানঃ
মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এমনই ব্যাক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন যে তার কীর্তিতে ভারত আলোর পথ দেখে উপকৃত হয়েছে।
১৯৯২ সালে ভারত সরকার তাঁকে মরনোত্তর ভারতরত্ন সন্মানে ভুষিত করে। এছাড়াও ১৯৮৯ সালের ১১ নভেম্বর তাঁর জন্ম শতবর্ষে, ভারত সরকার আজাদের সন্মানে কয়েকটি প্রকল্পের প্রচলন করেন। সেগুলো হচ্ছে – #মাওলানা আজাদ জাতীয় ফেলোশিপ। সংখ্যালঘু ছাত্র ছাত্রীদের পি এইচ ডি করার জন্যে পাঁচ বছর ধরে এই বিত্তি দেওয়া হয়।
মাওলানা আজাদ জাতীয় স্কলারশিপ-মাধ্যমিক পাঠরতা (নবম ও দশম শ্রেণী) ও মাধ্যমিক পাশ ছাত্রীদের উচ্চমাধ্যমিক পড়ার জন্য দু’বছরে বার হাজার টাকা দিয়ে থাকে।
২০০৮ সালে ভারত সরকার মাওলানা আবুল কালাম আজাদের জন্মদিন ১১ এর সন্মানে “জাতীয় শিক্ষা দিবস” হিসেবে ঘোষনা করে।!
মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এর অমর ও অতুলনীয় কীর্তির সম্মানে ভারত সরকার কর্তৃক প্রদত্ত সম্মানগুলো যে যথার্থ তা তাঁর কর্মজীবনের কীর্তিই বুঝিয়ে দেয়।