মহম্মদ কামরুজ্জামান ও বাংলার সংখ্যালঘু আন্দোলন

মহম্মদ কামরুজ্জামান ও বাংলার সংখ্যালঘু আন্দোলন

মাহমুদুল হাসান

স্বাধীনতাত্তর ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিমরা পরিকল্পিত বঞ্চনার শিকার। রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-চাকরি প্রভৃতিতে ব্রাহ্মণ্যবাদের অধিপত্যতার কারণে, দেশ সহ বাংলার মুসলিমদের কোনঠাসা অবস্থা। এরপরেও সংখ্যালঘু সমাজ নিজেদের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে লড়াকু মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে চলেছে।

প্রাক স্বাধীনতা পর্বে, বাংলা তথা অখন্ড ভারতের ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনে অন্যতম ভূমিকা স্থাপন করেছিল জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ নামক সংগঠন ও উত্তরপ্রদেশের দারুল উলুম দেওবন্দের ওলামাদের অবদান সর্বজন স্বীকৃত। কিন্তু স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে এই সত্তর বছরের অধিককাল সময়েও, বাংলার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সার্বিক আর্থসামাজিক মানোন্নয়নের প্রশ্নে যে ভূমিকা ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত ছিল, তা এই সময়কালের সংগঠনগুলি পর্যাপ্ত চাহিদা পূরণ করতে সামর্থ হয় নি।

যদি পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু আন্দোলনের প্রেক্ষাপটের উপর ভিত্তি করে আলোচনা করতে গেলে মূলত জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ স্বাধীনতার প্রাক মূহুর্তে ও স্বাধীনতার পরে, বাংলায় যথেষ্ট ভূমিকা স্থাপন করতে না পারার কারণে, জমিয়তে উলামায়ে বাংলা সহ বেশকিছু আঞ্চলিক সংগঠন এর সৃষ্টি হয়। এ ক্ষেত্রে এই সমস্ত সংগঠনগুলিও ধারাবাহিকভাবে সুদীর্ঘ সময় পাওয়ার পরও একটা সময় নিষ্প্রভ হয়ে যায়। বিংশ শতাব্দীর শেষ একবিংশ শতাব্দীর সূচনা লগ্নে, সংখ্যালঘু মুসলিমদের জন্য সংগঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে, উল্লেখযোগ্য মুখ বা সংগঠন হিসাবে মোহাম্মদ কামরুজ্জামানের নেতৃত্বে সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশন, বাংলার সংখ্যালঘুদের আস্থা অর্জন করতে পারে। তৎসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, দলিত, আদিবাসীদেরকে নিয়ে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে নিজেদেরকে সৃজন করা, সরকারের জনবিরোধী নীতির দূর্বার সমালোচনা ও আন্দোলন করা, রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী মনোভাবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, সংখ্যালঘু- দলিত- আদিবাসীদের বিভিন্ন ইস্যুতে সোচ্চার হওয়া ও বিভিন্ন ইস্যু ভিত্তিক আন্দোলনে সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশন জনমানষে সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়। পশ্চিমবঙ্গ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মধ্যে বৃহত্তম অংশ মুসলিম হলেও, বৌদ্ধ- জৈন- খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারীরা সংখ্যালঘু সমাজের অন্তর্গত। বেঙ্গল বুদ্ধিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবা, পিস কাউন্সিল সহ অন্যান্য সংখ্যালঘু, দলিত, আদিবাসীদের সংগঠন গুলির সঙ্গে ও সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশন একাত্ম ভাবে আন্দোলনমুখী হয়েছে। আর ঠিক এমন সমূহ কারনে, বর্তমান একবিংশ শতাব্দীতে বাংলার সংখ্যালঘুদের কাছে এক বিশ্বাসযোগ্য স্থান অর্জন করেছে মোঃ কামরুজ্জামান এর নেতৃত্বাধীন সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশন। বাংলায় ধারাবাহিক আন্দোলনে দীর্ঘ ১৭ বছরের অধিক সময় এক বিশেষ অবদান রেখে চলেছে এই সংগঠনটি।

৩৪ বছরের বাম অপশাসন থেকে মুক্ত হতে, সংখ্যালঘুদের মধ্যে পরিবর্তনের বার্তা পৌঁছাতে ও সেই বিশ্বাসযোগ্যতা স্থাপনে সংখ্যালঘুদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা তৈরি করেছে সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশন। বর্তমান সরকারেরও বিভিন্ন নীতি ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে, এই সরকারের প্রথম থেকেই রাজ্যে একমাত্র সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশন সোচ্চার হয়েছে।

বিগত দিনে সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশন তার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘুদের অধিকাংশই যে ওবিসি কোটার অন্তর্ভুক্ত এবং পশ্চিমবঙ্গের ওবিসি সার্টিফিকেট প্রাপ্ত কর্মপ্রার্থীদের কেন্দ্রীয় অনগ্রসর কমিশনের তালিকা ভুক্ত করা, তা একমাত্র সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশনের আন্দোলনের ফল। এছাড়াও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ওবিসি কোটাকে অগ্রাহ্য করা, ইচ্ছাকৃত ওবিসি কোটায় অন্যদের অন্তর্ভুক্ত করার বিরুদ্ধে, জোরদার প্রতিবাদের মাধ্যমে সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশন সোচ্চার হয়ে, উপযুক্ত দাবি আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। আরো উল্লেখ থাকে যে পরিবর্তনের সরকার আসার পর রাজ্যের ১০ শতাংশ সংখ্যালঘুদেরকে ওবিসি কোটায় সংরক্ষণ দেওয়ার পরও, মেডিকেল বোর্ড সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় সেট কে অগ্রাহ্য করেছে বারবার। কিন্তু প্রতিটা ক্ষেত্রেই স্বাস্থ্য ভবন থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে স্মারকলিপি বা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে, কিছুটা হলেও সেই ১০ শতাংশ সংরক্ষন বাস্তবায়ন করার প্রয়াস নিয়েছে সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশন। বলাবাহুল্য ইনোসেন্স অব মুসলিমস’, জুলফিকার সিনেমা বাতিলের আন্দোলন, রোহিঙ্গা গণহত্যা বিরোধী আন্দোলন, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের দাবি-দাওয়া ভিত্তিক আন্দোলন, আলিয়া মাদ্রাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর অথবা মাদ্রাসার বিভিন্ন দাবি নিয়ে আন্দোলন, বর্তমানে মব লিঞ্চিং এর নামে দলিত, আদিবাসী বা সংখ্যালঘুদেরকে পিটিয়ে মারার বিরুদ্ধে বজ্রকন্ঠে সোচ্চার হওয়া, এমন প্রভৃতি বহু আন্দোলন কর্মসূচিতে সফল ভূমিকা স্থাপন করেছে যুব ফেডারেশন। বর্তমান সরকারের মেকি মুসলিম প্রীতির কঠোর সমালোচনা থেকে উপযুক্ত জবাব দেওয়া এবং সরকারকে মনে করিয়ে দেওয়া যে রাজ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ জনগোষ্ঠী মুসলিম সম্প্রদায় আজও অবহেলিত, তা মোঃ কামরুজ্জামান ও তার সহযোগীদের নিয়ে সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশন দাবী আদায়ের রূপরেখা ও গঠন মূলক কর্ম প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সংখ্যালঘু উন্নয়নে সরকারের গঠনমূলক ও ইতিবাচক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে, যুব ফেডারেশন সরকারের সর্বস্তরে সমন্বয় রেখে পূর্ণ সহযোগিতার মধ্য দিয়ে সরকারকে সঠিক পরামর্শ প্রদান করে। এছাড়াও সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপের সাধুবাদ জানাতে যুব ফেডারেশন কার্পণ্যতা করে না।

মোঃ কামরুজ্জামান কোন একক ব্যক্তি নয়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিদগ্ধ ব্যক্তিত্বের সমাহার। কখনও সালাউদ্দিন আহমেদ, শেখ গোলাম মইনুদ্দীন, ইফতিকার হোসেন, আব্দুল মোমেন, হাফেজ আজিজুদ্দিন আবার বর্তমানে অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, মোহাম্মদ নাজমুল আরেফীন, আইনজীবী আব্দুল হান্নান, বাবর হোসেন, শিক্ষক আলি আকবর, ফজলুর রহমান, আব্দুর রহিম, নূর হোসেন, খলিল মল্লিক, মাওলানা আনোয়ার হোসেন কাসেমী, একেএম গোলাম মোর্তজা, আশরাফ আলী প্রভৃতি আরো অসংখ্য ব্যক্তিবর্গের সম্মিলিত নাম মোঃ কামরুজ্জামান ও সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশন।

বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম সংখ্যালঘু সংগঠন হল সারা বাংলা সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশন। এর মধ্য দিয়েই মোঃ কামরুজ্জামান রাজ্যের সংখ্যালঘু জনমানষে অধিকারকে বুঝিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ন্যায় এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য, অন্যায়ের বিরোধীতার জন্য, সরকারের সংখ্যালঘু স্বার্থ বিরোধী নীতির সমালোচনা ও ন্যায্য অধিকার আদায় করার জন্য, আন্তর্জাতিক স্তরে বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন করে, তার মতো বহু কামরুজ্জামান তিনি আজ তৈরি করে দিয়েছেন। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে স্মরণ করি, দেগঙ্গা ব্লকের মহিদুল ইসলাম বৈদ্য করোনা কালীন সময়ে মৃত্যুবরণ করায়, সংগঠন তার অভাব বোধ করে। দেগঙ্গার মহিদুল ভাই ও আব্দুল হামিদ ভাইয়ের মৃত্যু সংগঠনের এক অপূরনীয় ক্ষতি। আল্লাহর কাছে তাদের রূহের মাগফিরাত কামনা করে, আগামী দিনে আরও শক্তিশালী সংগ্রামের প্রত্যাশা নিয়ে মোঃ কামরুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশনের সংগ্রামী ভাবনা বৃদ্ধি কামনা করি। যুব ফেডারেশনকে শক্তিশালী করতে বাংলার ছাত্র যুবদের এই সংগঠনের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই।