স্বাধীনতা দিবসের দোরগোড়ায়: স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে উপেক্ষিত রয়ে গেল মুসলিম বীর বিপ্লবীরা

স্বাধীনতা দিবসের দোরগোড়ায়: স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে উপেক্ষিত রয়ে গেল মুসলিম বীর বিপ্লবীরা

বঙ্গ রিপোর্ট ডিজিটাল ডেস্ক: আর কিছু দিন পরেই আবার আমাদের দুয়ারে কড়া নাড়বে স্বাধীনতা দিবসের পদধ্বনি। কিন্তু দিনের পর দিন এক অশুভ চক্রান্তে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস বিলুপ্ত করা হচ্ছে। দেশের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এক সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন ইতিহাস সরবরাহ করা হচ্ছে‌। তাদের কাছে বার্তা দেওয়া হচ্ছে ‌ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলিমদের কোন অবদান নেই!!

আসুন আমরা ইতিহাস ঘেঁটে একটু সত্য ভাবনা এই প্রজন্মের কাছে সম্প্রীতির ইতিহাস তুলে ধরি। ভারতের ইতিহাসে স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলিমদের কোন অবদান নেই । তা এখনকার শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তক পড়লে বোঝা যায় । এই শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বহু লোকই প্রশ্ন তোলে মুসলমানদের এই দেশে থাকা উচিৎ নয়, কারন তারা স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ গ্রহন করেনি ।

এই বিষয় কে সামনে রেখে আজকের এই প্রতিবেদন। সত্য ইতিহাস বলছে মুসলিমদের তাজা রক্তে এই ভারত মুক্তি পেয়েছে । জেল খাটা ১ কোটি মুসলমানের আত্ম বলি দান ও ফাঁসি হওয়া ৫ লক্ষ মুসলমানের প্রানের বিনিময়ে আজ ভারত স্বাধীন ।সেই চেপে যাওয়া ইতিহাসের মুছে যাওয়া কিছু নাম জানানোর চেষ্টা করলাম ।

মাওলানা কাসেম , উত্তর প্রদেশর দেওবন্দ মাদ্রাসাকে ব্রিটিশ বিরোধী এক শক্তিশালী কেন্দ্র হিসাবে গড়ে তোলেন । সেই দেওবন্দ মাদ্রাসায় আজও কোরানের তালিম দেওয়া হয় ।

ভারতের বর্তমান ইতিহাসের পাতা ওল্টালে যাদের নাম অবশ্যই পাওয়া যায় তারাহল – গান্ধীজি, নেতাজী সুভায, অরবিন্দ, জোহরলাল, মোতিলাল..।
এদের সমতুল্য নেতা আতাউল্লা বুখারী, মাওলানা হুসেন আহমাদ, মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মাওলানা গোলাম হোসেন প্রমুখ( এনারা বহু বার দীর্ঘ মেয়াদী জেল খেটেছেন)

ইংরেজ বিরোধী কর্যকলাপের জন্য যার নামে সর্বদা ওয়ারেন্ট থাকতো । সেই তাবারক হোসেনের নামও ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যায় না ।

তৎকালিন সময়ে সারা হিন্দুস্থানের কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট ছিলেন । যার সংস্পর্শে আসলে হিন্দু মুসলিম নব প্রান পেতেন, সেই হাকিম আজমল খাঁ কে লেখক বোধ হয় ভূলে গিয়েছেন ।

মহাত্মা গান্ধী, জহরলাল যার সাহায্য ছাড়া চলতেনই না । যিনি না থাকলে গান্ধী উপাধি টুকু পেতেন না । সেই মাওলানা আজাদকে ইতিহাসের পাতা থেকে বাদ দেওয়া হল।

মাওলানা মহম্মদ আলি ও শওকত আলি । ৫ বার দীর্ঘ মেয়াদী জেল খেটেছেন । ‘ কম রেড ‘ ও ‘ হামদর্দ ‘ নামক দুটি ইংরেজ বিরোধী পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন । তাদের নাম ইতিহাসের ছেড়া পাতায় জায়গা পায় না ।

খাজা আব্দুল মজীদ ইংল্যান্ড থেকে ব্যারিস্টার হন । জওহরলালের সমসাময়িক কংগ্রেসের কর্মী ছিলেন । প্রচন্ড সংগ্রাম করে তার এবং তার স্ত্রী উভয়ের জেল হয় । ১৯৬২ সালে তার মৃত্যু হয়। ইতিহাসের পাতায়ও তাঁদের নামের মৃত্যু ঘটেছে ।

ডবল M. A এবং P.H.D ডিগ্রিধারী প্রভাবশালী জেল খাটা সংগ্রামী সাইফুদ্দিন কিচলু । বিপ্লবী মীর কাশেম, টিপু সুলতান , মজনু শা , ইউসুফ… এরা ব্রিটিশদের বুলেটের আঘাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলাও ইতিহাসের পাতা থেকে নিশ্চিহ্ন হলো কিভাবে..?

সর্ব ভারতীয় নেতা আহমাদুল্লাহ । তৎকালীন সময়ে ৫০ হাজার রুপি যার মাথার ধার্য করেছিল ব্রিটিশরা । জমিদার জগন্নাথ বাবু প্রতারনা করে, বিষ মাখানো পান খাওয়ালেন নিজের ঘরে বসিয়ে । আর পূর্ব ঘোষিত ৫০ হাজার রুপি পুরষ্কার জিতে নিলেন ।
মাওলানা রশিদ আহমদ । যাকে নির্মম ভাবে ফাঁসি দিয়ে পৃথিবী থেকে মুছে দিলো ইংরেজরা । ইতিহাস লেখক কেন তার নাম মুছে দিলেন ইতিহাস থেকে ।

জেল খাটা নেতা ইউসুফ, নাসিম খাঁন, গাজি বাবা ইয়াসিন ওমর খান তাদের নাম আজ ইতিহাসে নেই কেনো…?

ভারত স্বাধীনতা লাভ করার পরে, কুদরাতুল্লা খানে মৃত্যু হল কারাগারে । ইতিহাসের পাতায় তার মৃত্যু ঘটলো কিভাবে…?

নেতাজী সুভাষ বসুর ডান হাত আর বাম হাত যারা ছিলেন..। ইতিহাসে তাদের নাম খুঁজে পাওয়া যায় না । তারা হলেন আবিদ হাসান শাহনাওয়াজ খান , আজিজ আহমাদ, ডি এম খান , আব্দুল করিম গনি , লেফট্যানেন্ট কর্নেল , জেট কিলানি , কর্নেল জ্বিলানী প্রমুখ ..। এদের অবদান লেখক কি করে ভুলে গেলেন…?

বিদ্রোহী গোলাম রব্বানী, সর্দ্দার ও হয়দার, মাওলানা আক্রম খাঁ , সৈয়দ গিয়াসুদ্দিন আনসার । এদের রক্ত আার নির্মম মৃত্যু কি ভারতের স্বাধীনতায় কাজে লাগেনি…?

বিখ্যাত নেতা জহুরুল হাসানকে হত্যা করলে মোটা অঙ্কের পুরষ্কার ঘোষনা করে ইংরেজ সরকার।

মাওলানা হজরত মুহানী এমন এক নেতা, তিনি তোলেন সর্ব প্রথম ব্রিটিশ বিহীন চাই স্বাধীনতা ।

জেলে মরে পচে গেলেন মাওলানা ওবায়দুল্লাহ, তার নাম কি ইতিহাসে ওঠার মতো নয়…!?

হাফেজ নিশার আলি যিনি তিতুমীর নামে খ্যাত ব্রিটিশরা তার বাঁশের কেল্লা সহ তাকে ধংব্বস করে দেয়…। তার সেনাপতি গোলাম মাসুমকে কেল্লার সামনে ফাঁসি দেওয়া হয়…।

কিংসফোর্ড কে হত্যা করতে ব্যার্থ ক্ষুদিরামের নাম আমরা সবাই জানি , কিংসফোর্ড হত্যাকরী সফল শের আলী বিপ্লবীকে আমরা কেউ জানিনা ।

কলকাতার হিংস্র বিচার পতি জর্জ নরম্যান হত্যাকরী আব্দুল্লার নামও শের আলীর মতো বিলীন হয়ে আছে..।

বিখ্যাত নেতা আসফাকুল্লা ।
ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বীর আব্দুস সুকুর ও আব্দুল্লা মীর এদের অবদান কি ঐতিহাসিক ভূলে গেছেন।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছলে বলে কৌশলে ভারতের শাসনক্ষমতা দখল করেছিল মুসলিমদের থেকে। তাই মুসলিমরাই প্রথম ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে হিন্দুরা এই আন্দোলনে যোগদান করেন। উভয় সম্প্রদায়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় স্বাধীনতা সংগ্রামের গতি বৃদ্ধি পায়। শেষ পর্যন্ত বেনিয়া ইংরেজরা এদেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। স্বাধীন হয় ভারত। কিন্তু দুঃখের বিষয়, স্বাধীন ভারতের সরকারি পাঠ্যবইগুলোতে স্বাধীনতা সংগ্রামী মুসলিম নেতৃত্বের নাম দূরবীক্ষণ দিয়ে খুঁজতে হয় ! ফলে, নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স বইপুস্তক না ঘাঁটলে তাঁদের নাম জানা যায় না। তাই এখানে
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন – নেতৃত্ব দিয়েছেন, শহীদ হয়েছেন, নির্বাসিত হয়েছেন – এমন অর্ধশত মুসলিম নেতার নাম তুলে ধরা হলো :

1. নবাব সিরাজ-উদ্-দৌলা
2. শের-ই-মহিশুর টিপু সুলতান
3. শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ্ মুহাদ্দিস দেহলবী
4. মুহাদ্দিস শাহ্ আবদুল আযীয দেহলভী
5. শহীদ সৈয়দ আহমদ
6. মাওলানা বেলায়েত আলী সাদিকপুরী
7. বাহাদুর শাহ্ জাফর
8. আল্লামা ফজলে হক খয়রাবাদী
9. শাহজাদা ফিরোজ শাহ্
10. শহীদ মাওলাবী মুহাম্মদ বাকির
11. বেগম হযরত মহল
12. মাওলানা আহমাদুল্লাহ্ শাহ্
13. নবাব খান বাহাদুর খান
14. আযীযান বাঈ
15. মাওলাবী লিয়াকত আলী ইলাহাবাদী
16. হাজী ইমদাদুল্লাহ্ মুহাজির মক্কী
17. মাওলানা মুহাম্মদ ক্বাসিম নানুতবী
18. মাওলানা রহমাতুল্লাহ্ কিরানভী
19. শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমূদুল হাসান
20. মাওলানা উবাইদুল্লাহ্ সিন্ধী
21. মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গোহী
22. মাওলানা আনওয়ার শাহ্ কাশ্মিরী
23. মাওলানা বরকাতুল্লাহ্ ভোপালী
24. মাওলানা কিফায়েতুল্লাহ্
25. মাওলানা আহমদ সাঈদ দেহলভী
26. মাওলানা হুসাঈন আহমদ মাদানী
27. মাওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর
28. মাওলানা হাসরত মোহানী
29. মাওলানা আরিফ হিসবী
30. মাওলানা আবুল কালাম আজাদ
31. মাওলানা হাবিবুর রহমান লুধিয়ানভী
32. ডক্টর সাইফুদ্দীন কিচলু
33. মাসীহুল মুলক হাকীম আজমল খান
34. মাওলানা মাজহারুল হক
35. মাওলানা জাফর আলী খান
36. আল্লামা ইনায়েতুল্লাহ্ খান মাশরিকী
37. ডক্টর মুখতার আহমদ আনসারী
38. জেনারেল শাহনাওয়াজ খান
39. মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ মিয়াঁ
40. মাওলানা হিফজুর রহমান স্যোহারভী
41. মাওলানা আবদুল বারী ফিরিঙ্গিমহল্লী
42. খান আবদুল গফফার খান
43. মুফতী আতীকুর রহমান উসমানী
44. ডক্টর সৈয়দ মাহমূদ
45. খান আবদুস সামাদ খান আচাকজাঈ
46. রফী আহমদ কিদ্ওয়াঈ
47. ইউসুফ মেহর আলী
48. শহীদ আসফাকুল্লাহ্ খান
49. ব্যারিস্টার আসিফ আলী
50. মাওলানা আতাউল্লাহ্ শাহ্ বোখারী

এখানে মাত্র পঞ্চাশ জনের নাম উল্লেখ করা হলো। এঁদের ছাড়াও মীর নিসার আলী (তিতুমীর), হাফেজ গোলাম মাসুমের মতো আরও হাজারো মুসলিম স্বাধীনতা সংগ্রামে নিজেদের তাজা রক্ত ঝরিয়েছেন। শহীদ হয়েছেন। বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা।