নবম শতকের চিকিৎসাবিজ্ঞান, ‘মেডিক্যাল এনসাইক্লোপিডিয়া’: ও মুসলিম চিকিৎসক আর রাজি

নবম শতকের চিকিৎসাবিজ্ঞান, ‘মেডিক্যাল এনসাইক্লোপিডিয়া’: ও মুসলিম চিকিৎসক আর রাজি

বঙ্গ রিপোর্ট ডিজিটাল ডেস্ক: বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের বিক্রিয়া ঘটিয়েই তৈরি হবে সোনা, এমন একটা স্বপ্ন দেখতেন অনেকেই। আজকের বিজ্ঞানীরা একথা নিছক হেসে উড়িয়ে দিলেও সেদিনের সেই অ্যালকেমিস্টরাই জন্ম দিয়েছেন আধুনিক বিজ্ঞানের ধারণার। সেই তালিকায় যেমন আছেন পাশ্চাত্যের নিউটন বা ভ্যান হেলমন্ট, তেমনই প্রাচ্যেও সেইসময় বিজ্ঞানচর্চার নানা নতুন দিক খুলে যেতে শুরু করেছে। ইতিহাস তার খানিকটা মনে রাখলেও সাধারণ মানুষের স্মৃতি থেকে সেসব অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছে। মানুষ তাই মনে রাখেননি আবু বকর মহম্মদ ইবন আল-রাজির নামও।

প্রাচ্যের তো বটেই, সারা পৃথিবীর চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাস লিখতে বসলে আল-রাজির নাম বাদ দেওয়ার কোনো উপায় নেই। বর্তমান তেহরানের কাছে রায়ী অঞ্চলে তিনি জন্মেছিলেন ৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে। ইরানে তখন পার্সি ও মুসলমানদের মধ্যে দীর্ঘ দ্বন্দ্ব উপস্থিত। আল-রাজি মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও পার্সিদের ইতিহাস ও জীবনযাত্রা তাঁকে যথেষ্ট আকর্ষণ করেছিল। তাই তাঁর শিক্ষা শুরু হয়েছিল প্রাকৃতিক দর্শন এবং সঙ্গীত শিক্ষার মাধ্যমে। এরপর পাশ্চাত্যের গবেষকদের অনুসন্ধানের কথা জানতে পেরে তিনিও শুরু করলেন সোনার সন্ধান। তবে অ্যালকেমির গোলকধাঁধায় বেশিদিন পথ খুঁজে বেড়াননি তিনি। কিছুদিনের মধ্যেই চিকিৎসা বিজ্ঞানকেই সাধনা করলেন। এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই সাধনায় নিরন্তর প্রয়াসী ছিলেন আল-রাজি।

কর্মসূত্রে শুরুতে তিনি ছিলেন রায়ী রাজদরবারের চিকিৎসক। তারপর চলে যান বাগদাদ। কর্মসূত্রে এশিয়ার নানা অংশে ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। তাঁর কাছেও দেশবিদেশ থেকে বহু রোগী এবং ছাত্র এসেছেন। চিকিৎসার পাশাপাশি তিনি চালিয়ে গিয়েছেন নিজস্ব গবেষণাও। অবশেষে রায়ী শহরেই ৯৩০ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যু হয় তাঁর।

আল-রাজির গবেষণার বিপুল পরিধির কথা একটি প্রবন্ধে আলোচনা সম্ভব নয়। তবে যে বিষয়টির কথা বলতেই হয়, তা হল তাঁর পদ্ধতিগত আধুনিকতা। জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে প্রতিটি রোগীর কেস হিস্ট্রি লিখে রাখতেন তিনি। এখনও তাঁর লেখা কিতাব আল-হাওয়াই ফি আল-তিব গ্রন্থে প্রায় ১০০০টি কেস হিস্ট্রি খুঁজে পাওয়া যায়। তৎকালীন ইতিহাসে প্রাচ্যের অন্য কোনো চিকিৎসক এমন আধুনিক পদ্ধতি মেনে কাজ করতেন বলে জানা যায় না। তাছাড়া ছাত্রদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য তিনি একটি পাঠ্যপুস্তকও লিখেছিলেন। পাঠ্যপুস্তক না বলে তাকে মেডিক্যাল এনসাইক্লোপিডিয়া বললেই ঠিক হবে। এটাই সেইসময় পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো মেডিক্যাল এনসাইক্লোপিডিয়া। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এমন কোনো ধারা নেই, যা সম্বন্ধে সেখানে আলোচনা করা নেই। সেইসঙ্গে স্নায়ু বিজ্ঞানের উপর তাঁর নিজস্ব গবেষণার কথাও লেখা আছে।

স্নায়ু বিজ্ঞানের জগতে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিলেন আল-রাজি। মনস্তত্ত্বের সঙ্গে স্নায়ু বিজ্ঞানের সম্পর্কের বিষয়ে তিনিই প্রথম দৃষ্টিপাত করেন। বহু মানসিক রোগীর চিকিৎসাও করেছেন তিনি। তাছাড়া তাঁর আরেকটি উল্লেখযোগ্য মৌলিক গবেষণা হল বসন্ত রোগের বিষয়ে। গুটি বসন্ত, জল বসন্ত এবং হাম; এই তিন রোগের পার্থক্য তিনিই প্রথম লক্ষ্য করেন। এই লক্ষ্য করেন যে, গুটি বসন্ত কখনও একই মানুষের শরীরে দুবার আক্রমণ করে না। জীবাণু এবং শারীরিক প্রতিরোধ সম্বন্ধে যখন নূন্যতম ধারণাও ছিল না, তখন এমন আবিষ্কারের কথা কল্পনা করাও কঠিন।

রাজির চিকিৎসাপদ্ধতিও তৎকালীন অন্য চিকিৎসকদের থেকে বেশ আলাদা ছিল। ওষুধের থেকে তিনি পথ্যের উপরেই জোর দিতেন বেশি। তাছাড়া চিকিৎসার প্রয়োজনেই নানাধরনের রাসায়নিক গবেষণার কাজ করতেন তিনি। এইভাবেই একদিন আবিষ্কার করে ফেললেন সবচেয়ে শক্তিশালী অ্যাসিড সালফিউরিক অ্যাসিড। এমনকি রোগীর শরীরে অস্ত্রপ্রচারের আগে তাকে অজ্ঞান করার প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করেছিলেন তিনি। আর এই কাজে আফিমের ব্যবহার করে তিনি শল্যচিকিৎসার জগতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটিয়ে ফেলেছিলেন।

মধ্যযুগের রাজনৈতিক অন্ধকারেও আল-রাজির মতো মানুষ বিজ্ঞানচর্চার আলো জ্বালিয়ে রেখেছিলেন। বহশ্রুত ইতিহাসে সেই কাহিনি হয়তো তেমন জায়গা পায়নি। কিন্তু আরব-তুরস্কের রাজনৈতিক সীমানা তো কবেই ভেঙেচুরে গিয়েছে। রাজাদের ইতিহাস আর কতদিন বাঁচে? কিন্তু বেঁচে থাকে বিজ্ঞান। আল-রাজির লেখা ২২৪টি বই এখনও চিকিৎসা বিজ্ঞানের জগতে এক অমূল্য সম্পদ। তাঁর নামের সঙ্গে অনেকে পরিচিত না হলেও, সেই গবেষণার সূত্রেই তো জন্ম নিয়েছে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান।