ওষুধ-ভ্যাকসিন নেই! নিজেদের করোনা নিজেরাই চিকিৎসা করছে অসহায় রোহিঙ্গারা

    ওষুধ-ভ্যাকসিন নেই! নিজেদের করোনা নিজেরাই চিকিৎসা করছে অসহায় রোহিঙ্গারা

    নিউজ ডেস্ক বঙ্গ রিপোর্ট: চিকিৎসার জন্য অর্থ নেই৷ ভ্যাকসিন নেওয়ার জন্য বা কোভিড টেস্ট করার জন্য নেই প্রয়োজনীয় নথিপত্রও৷ ওদের একটাই পরিচয়৷ ওরা রোহিঙ্গা৷ ওরা মজলুম৷ এই অতি মহামারির মধ্যে সারা দেশ যখন চিকিৎসার জন্য এখানে-ওখানে ছুটছে, ভ্যাকসিনের হাহাকার পড়ে গেছে, মায়ানমার থেকে মিলিটারির হাতে অত্যাচারিত হয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা এই শহরে ছায়ার মতো বসবাস করছে৷ উত্তরপূর্ব দিল্লির এমনই একটি শরণার্থী শিবির মদনপুর খাদার৷ সেখানে নেই টেস্টিং সেন্টার, ভ্যাকসিন বা চিকিৎসক৷

    সরকার দাবি করছে যে কোভিড টেস্টিং ও ভ্যাকসিন নেওয়ার ক্ষেত্রে যে গাইডলাইন রয়েছে তা তারা অনেকটাই হালকা করে দিয়েছে রোহিঙ্গাদের জন্য৷ কিন্তু এই শরণার্থীরা বলছেন যে আসলে গ্রাউন্ড স্তরে এসব কোনও কাজ করেনি৷ এই ক্যাম্পে প্রায় ২৭০ রোহিঙ্গা মুসলিম বসবাস করেন যারা জীবন বাঁচাতে মায়ানমার থেকে পালিয়ে এসেছেন৷ তারা অধিকাংশই এই বস্তিতে বসবাস করেন৷ তারা স্বশিক্ষিত হয়েছেন মহামারি সম্বন্ধে৷ এর লক্ষণগুলো কী তা জেনে এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে শিখেছেন আর নিজেরা ঘরেই এর প্রতিকারের ব্যবস্থা করেছেন৷ যেমন লবণ জল দিয়ে গার্গল করা৷ এরপর রয়েছে কোয়ারেন্টাইন৷ তারা তো বসতির মধ্যে থাকেন৷ তারপরও যখন কারও অবস্থা খারাপ হয়, তখন তাকে ক্যাম্পের মধ্যে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়৷

    এমনই একজন ব্যক্তি আমির৷ তিনি একজন দিনমজুর, যিনি দিনে গরম জল দিয়ে চারবার গার্গল করেন যাতে তার কাশি ভালো হয়৷ অন্য কোনও ওষুধ যেগুলো কোভিড হলে খাওয়ানো হচ্ছে সেসব তিনি পাননি৷ তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে কী করবেন তিনি জানেন না৷ তার আধার কার্ড নেই এবং এমনকী তার প্রতিবেশীদেরও নেই৷ তিনি জানাচ্ছেন, আমরা কী করতে পারি আমাদের? টেস্ট করানো সম্ভব হচ্ছে না৷ আবার ভ্যাকসিন পাচ্ছি না৷ প্রত্যেকটা কাজের জন্য দরকার সরকারি নথিপত্র যা আমাদের কাছে নেই৷ আমাদের এইখানে প্রায় কুড়ি-পঁচিশ জনের কোভিড লক্ষণ দেখা দিয়েছে৷ আমরা নিজেরা নিজেদের চিকিৎসা করছি৷ হাসপাতালে আমাদের কোনও স্থান নেই৷ সেখানে আমাদের জন্য কোনও চিকিৎসা নেই৷ গত মাসেই ৫০ থেকে ৬০ জন রোহিঙ্গার রোগ লক্ষণ দেখা যায়৷ সেটা কমে এখন ২০ থেকে ২৫ এর মধ্যে এসেছে৷

    বেসরকারি সংস্থাগুলোর মতানুযায়ী, এখন ভারতে প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গা বসবাস করছেন৷ তার মধ্যে দিল্লির মদনপুর, কালিন্দী, শাহিনবাগে রোহিঙ্গা বসবাস করছেন ৯০০ রোহিঙ্গা৷ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শরণার্থী তার স্ত্রীকে হারিয়েছেন ৬ মাস আগে৷ তিনি মনে করেন কোভিডেই তার স্ত্রী মারা গেছেন৷ কারণ যে সমস্ত লক্ষণগুলি ছিল, সেগুলো কোভিডের৷ স্ত্রীকে হাসপাতালে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছিল৷ কিন্তু চিকিৎসার আগেই সে মারা যায়৷ রাষ্ট্রসংঘ তাকে একটি কার্ড দিয়েছিল যে কার্ড দেখিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা করানো যায়৷ তবে সেই কার্ড অনেকেই দেখাতে ভয় পাচ্ছেন, কারণ তারা যদি চিহ্নিত হন রিফিউজি হিসাবে তবে তাদেরকে প্রত্যর্পণ করা হবে৷ নাসির (নাম পরিবর্তিত) নামে আরেকজন জানাচ্ছেন যে আমরা নিজেরাই কোয়ারেন্টাইনে থাকি৷ গরম জল লেবু দিয়ে খাই৷ পেঁয়াজ খাই৷ অনেকেরই শ্বাসকষ্ট হচ্ছে৷ জ্বর আছে৷ ঠান্ডা লেগেছে৷ কাউকে বলতেও ভয় পাচ্ছেন তারা৷ তবে এই যে তাদের কোভিড রয়েছে কি না, এটা যে শুধু তাদের জন্য ক্ষতিকর তা নয়৷ কারণ তাদের অনেকেই বিভিন্ন অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করে থাকেন৷ তবে তারা লকডাউনে কাজ হারিয়েছেন৷ আর কাজ পাচ্ছেন না৷ তবে যাঁরা কাজ এখনও করছেন, তারা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন৷ সুখের বিষয় এখনও পর্যন্ত মদনপুর খাদারে কোভিডে কেউ মারা যায়নি৷

     

    স্বাস্থ্যমন্ত্রক সাম্প্রতিক গাইডলাইনে জানিয়েছে, আইডি কার্ড ছাড়াও কোভিড ভ্যাকসিন দেওয়া হবে৷ কিন্তু কখন দেওয়া হবে৷ তার মধ্যে রোহিঙ্গারা রয়েছেন কি না এ বিষয়ে কোনও স্পষ্ট নির্দেশনা নেই৷ সেখানে ভবঘুরে, সাধুসন্ত, জেলবন্দি, মানসিক প্রতিবন্ধী ও যারা বৃদ্ধাশ্রমে রয়েছে, পথের ভিক্ষুকদের রাখা হয়েছে এবং তাদেরকে ভ্যাকসিন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে৷ কিন্তু তাদের মধ্যে রোহিঙ্গাদের নাম নেই।
    পুবের কলম