মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে অজ্ঞ সাম্প্রদায়িক ব্যাক্তিদের অপ্রচারের জবাব দিচ্ছে অমুসলিমরাই

মাদ্রাসা নিয়ে অজ্ঞ সাম্প্রদায়িক ব্যাক্তিদের অপ্রচারের জবাব দিচ্ছে অমুসলিমরাই

নিজস্ব প্রতিবেদক: মাদ্রাসা নিয়ে আবারও অপ্রচার শুরু হয়েছে। মাদ্রাসা সামনে রেখে এক শ্রেণীর মানুষ সাম্প্রদায়িকতার বাতাবরণ তৈরি করার চেষ্টা হচ্ছে। মাদ্রাসাকে ফের সন্ত্রাসবাদীদের আঁতুর ঘর বলে প্রচার করা হচ্ছে। মাদ্রাসায় নাকি জঙ্গি তৈরি হয়। দেশে নাকি এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন নেই। বৃহস্পতিবার মাদ্রাসা শিক্ষা পর্যদের হাইমাদ্রাসা, আলিম ও ফাজিল পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশিত হওয়ার পর, এই বিষয়গুলি ফের সামনে এসেছে। যাকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে তোলপাড়। যার জাবাব দিচ্ছে অমুসলিমরাই।

 

জাবাব দেওয়ার বিষয়ে অমুসলিমদের কথা তুলে ধরার কারণ হচ্ছে, মাদ্রাসাকে শুধু মাত্র মুসলিমদের ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে দেখা হচ্ছে। সরকার পোষিত, ৬১৪টি এডেড মাদ্রাসা ছাড়াও, রয়েছে এমএসকে, এসএসকে ও আনএডেড মাদ্রাসা। যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ। যেখানে সাধারণ শিক্ষা প্রদান করা হয়। এই সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে স্কুলের কোনও পার্থক্য নেই। বরং, মাদ্রাসাগুলি স্কুলের তুলনায় বেশি বিষয় পড়ানো হয়ে থাকে। আরবি ভাষা ও ইসলামিক ইতিহাস পড়ানো হয়। যার সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষার কোনও যোগ নেই। মুসলিমদের ধর্মীয় শিক্ষার জন্য খারিজি মাদ্রাসা রয়েছে। যেগুলি সম্পূর্ণ বেসরকারি ভাবেই পরিচালিত হয়। কিন্তু হাইমাদ্রাসা, আলিম ও ফাজিলের পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা হওয়ার পরেই, সোশ্যাল মিডিয়ায় কেন, ফের সন্ত্রাসবাদী, জঙ্গি শব্দগুলি ব্যবহার করা হচ্ছে। উলে­খ্য, বৃহস্পতিবার মাদ্রাসা পর্যদের ফলাফল প্রকাশ হওয়ার পর সমস্ত মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হয়। মেধা তালিকায় জগন্নাথ দাসের স্থান পাওয়া নিয়েও, জোর প্রচার হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই সব খবরের কাটিং পোষ্ট হয়েছে, সেখানেই কমেন্ট বক্সে কিছু মানুষকে ্মাদ্রাসা সম্পর্কে আপত্তি কর মন্তব্য করতে দেখা গিয়েছে। তার মধ্যে কয়েকটি মন্তব্য এখানে তুলে ধরার হচ্ছে। তপন ঘোষ নামে এক ব্যক্তি লিখেছেন ‘এই ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় মানুষ তৈরি হয় না’। তাপনবাবুর এই ধরনা হতেই পারে। কিন্তু তাঁর জানা দরকার, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এ পি জে আব্দুল কালাম এই মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। শুধু তাই নয়, ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী আবুল কালাম আজাদও মাদ্রাসা থেকেই পড়াশোনা করেছেন। এখন তাপনবাবুর মনে হতে পারে, এনারা মানুষ নন। জয়ন্ত হালদার নামে এক ব্যক্তি লিখেছেন, ‘মাদ্রাসা হলো জঙ্গিদের আঁতুর ঘর। এখান থেকে পাশ করে কেউ আগে জঙ্গি হয়, না হলে পরে সে অবশ্যই জঙ্গি হবে। যেমন কাফিল খান, লাদেন’। অসাধারণ উদাহারণ দিয়েছেন তিনি। ডাক্তার কাফিল খান। যিনি ইতিমধ্যেই মানবদরদি চিকিৎসক হিসাবে পরিচিত হয়েছেন সারা দেশে। যিনি সমস্ত দূর্যোগ ও মহমারীকে উপেক্ষা করে অসহায়, দরিদ্র পবিারের শিশুদের বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবা দিয়ে থাকেন। তাঁর চেষ্টায় মৃতপ্রায় ১৫০ শিশু প্রান ফিরে পেয়েছে। যে মানুষ নিজের খরচে গরিব শিশুদের চিকিৎসা করে। সেই চিকিৎসকে এখন জঙ্গি বলা হচ্ছে।

 

কারণ, তিনি নাকি শিক্ষার প্রথম অবস্থায় মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে ছিলেন। তাই তিনি জঙ্গি। রঞ্জিত দাস নামে এক যুবক আবার লিখেছেন, ‘আমাদের দেশে মধ্যে মাদ্রাসার কোনও দরকার নেই’। রঞ্জিতবাবু মনে রাখান মাদ্রাসা প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই মাদ্রাসা থেকে পড়াশোনা করে বহু মানুষ মহান হয়েছেন। দেশের সব রাজ্যেই মাদ্রাসা রয়েছে। যেখানে ধর্মনিরপেক্ষাতা বজায় রেখেই শিক্ষাদান করা হয়। এই মাদ্রাসা থেকে পড়াশোনা করেই এবারে মাধ্যমিকে ষষ্ট স্থান অধিকার করেছে, জগন্নাথ দাস। তাহলে আপনাদের কথায়, এই জগন্নাথ ভবিষ্যতে জঙ্গী। না জগন্নাথ একজন ভালো মানুষ হবে। ভবিষ্যতে আরও ভালো রেজাল্ট করবে। ওই ভিতটা তৈরি হয়েছে এই মাদ্রাসা থেকেই। শুধু তাই নয়, রাজ্যের সরকারপোষিত মাদ্রাসাগুলি থেকে এবছর ৫ হাজারের বেশি অমুসলিম পরীক্ষার্থী মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে। দিন দিন বাড়ছে অমুসলিম পরীক্ষার্থীর সংখ্যা। মাদ্রাসা সম্পর্কে এই সমস্ত মানুষের করা মন্তব্যের জেরে যে ভুল ধারনা তৈরি হয়েছিল, তা এবার ভেঙে গিয়েছে। তাদের জাবাব দিতেই, মাদ্রাসায় বাড়ছে অমুসলিম পড়ুয়াদের সঙ্গে।

 

একইসঙ্গে বলা ভালো, মাদ্রাসা যদি শুধু মুসলিম ধর্মের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হবে, তাহলে শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এই সংরক্ষণ নেই কেন? যাঁরা আজ মাদ্রাসা সম্পর্কে কু-কথা ব্যক্ত করছেন, তাঁরা মনে রাখবেন এই মাদ্রাসায় প্রায় অর্ধেক শিক্ষক অমুসলিম। মাদ্রাসা হলেও, নিয়োগের ক্ষেত্রে মুসলিম বলে কোনও অগ্রাধিকার নেই। যোগ্যতার ভিত্তিতেই নিয়োগ করা হয়। সেখানে অমুসলিম ছেলে মেয়েরাও শিক্ষাকতার চাকরি করেন। তাই, মাদ্রাসা নাম থাকলেও এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ যেমন শিক্ষকতা করছেন, তেমনই ছাত্রছাত্রীও রয়েছে। এটাই হচ্ছে মাদ্রাসাকে বদনামকারী মানুষের মুখে ঝামা ঘষে দেওয়ার মতো যোগ্য জবাব। মাদ্রাসা নিয়ে আজও যাঁরা বিভ্রান্ত তৈরি করার চেষ্টা করছে, তাদের উচিত ভালো করে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানা। উদ্দেশ্যে প্রণোদিত ভাবে এমন মন্তব্য করে, মানুষের মনে দাগ কাটতে পারবে না। ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের কাছে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব আজও অপরিসীম।