সাংগঠনিক সম্ভাবনা: মুসলিমদের উপর রাজনৈতিক অরাজনৈতিক গণসংগঠন ও দলের প্রভাব

সাংগঠনিক সম্ভাবনা: মুসলিমদের উপর রাজনৈতিক অরাজনৈতিক গণসংগঠন ও দলের প্রভাব

অধ্যাপক ডঃ নুরুল ইসলাম

পশ্চিমবঙ্গে প্রায় তিন কোটি মুসলিম আছেন। মোট জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ। এই বিপুল জনগোষ্ঠী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে প্রধানত পাঁচটি শ্রেণিতে বিভক্ত। যথা; ক. ফুরফুরা সিলসিলার অনুসারী, খ. জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের প্রভাবাধীন দেওবন্দী আকীদার অনুগামী, গ. আহলে হাদিস আকীদার অনুসারী, ঘ. জমিয়তে আহলে সুন্নাত তথা ব্রেলভী আকীদার অনুগামী ও ঙ. জামায়াতে ইসলামী। উল্লেখিত পাঁচটি ধর্মীয়-সামাজিক উপদল ছাড়া মুসলিম সম্প্রদায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও উপদলে বিভক্ত। তাদের অনেকেই কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস ও বামপন্থী দলগুলোর অনুসারী।

এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে বেশ কিছু অরাজনৈতিক মুসলিম গণসংগঠন সক্রিয়। সারা বাংলা সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশন, আইমা, দিশা, আমানত ফাউন্ডেশন, মুসলিম অধ্যাপক ও বিদ্বজ্জনদের সংগঠন বেস, বাংলা সংস্কৃতি মঞ্চ এবং উত্তরবঙ্গের শেরশাহ বাদিয়া ভাষা ও সংস্কৃতি মঞ্চ ইত্যাদি অরাজনৈতিক গণসংগঠন দীর্ঘদিন সক্রিয়ভাবে মুসলিম সম্প্রদায়ের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ধারাবাহিক কাজ করে চলেছে। তাদের নেটওয়ার্কের আওতায় আছেন বহু সংখ্যক মুসলিম।
আছেন। উল্লেখ্য, মুসলিম পরিচালিত কয়েক হাজার নিবন্ধিত সোসাইটি ও ট্রাষ্ট আছে যেগুলো শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিয়ে ধারাবাহিক কাজ করছে। ফলে, মুসলিম সমাজে তাদের একটি কার্যকরী প্রভাব আছে।

এই মুহূর্তে মুসলিম পরিচালিত ও প্রভাবিত কয়েকটি রাজনৈতিক দল সম্প্রতি সক্রিয় হয়েছে। বেশ কিছু কাল ধরে মুসলিম লীগ, ওয়েলফেয়ার পার্টি ওফ ইন্ডিয়া, এসডিপিআই, মজলিসে ইত্তেহাদুল মুসলেমিন (মিম) ও পপুলার ফ্রন্ট ওফ ইন্ডিয়া ইত্যাদি রাজনৈতিক দল সমুহ সক্রিয়ভাবে কাজ করে চলেছে। তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড মুসলিম সমাজে পরিদৃষ্ট হচ্ছে। এই মুহূর্তে এই সব রাজনৈতিক দল বেশ সক্রিয়।
এই সব দল, উপদল, গণসংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলোর অস্তিত্ব ও প্রভাবকে অস্বীকার করে মুসলিম মিল্লাতকে ঐক্যবদ্ধ করা ও রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করা প্রায় অসম্ভব। আবার এই সব পরস্পর বিরোধী দল ও উপদেশগুলোকে একটি ছাতার তলায় নিয়ে আসাও খুব সহজ কাজ নয়।

উল্লেখিত ধর্মীয় দল, উপদল, অরাজনৈতিক গণসংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব ও প্রভাববলয় নিয়ে অতিসংক্ষিপ্ত আলোচনার প্রয়াস করব।

ফুরফুরা শরীফ: হুগলি জেলার ফুরফুরায় প্রতিষ্ঠিত সুফি সিলসিলার বলিষ্ঠ প্রভাব আছে দক্ষিণবঙ্গের কয়েকটি জেলা যথা; হুগলি, হাওড়া, দুই ২৪ পরগনা ও দুই মেদনিপু্রের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে। এই সব অঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা ২০% থেকে ৩৫% । তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক ফুরফুরার অনুসারী। তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী। এই সব মানুষ হুজুরদের রাজনৈতিক নির্দেশ কতটা মানবে সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। পীরজাদারাও কোনো একজনের নেতৃত্বে আস্থাশীল নন। তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রশ্নহীন নয়। তারা না ধর্মীয় শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষিত আর না আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত।

জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ: এই সংগঠনের সঙ্গে সংযুক্ত পশ্চিমবঙ্গের বিশাল সংখ্যক দেওবন্দী আকীদার মানুষ। পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলিম এই মতাদর্শে বিশ্বাসী। তাদের মধ্যে অনেকেই তাবলীগ জামাতের সঙ্গে সংযুক্ত। তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংযুক্ত।

আহলে হাদিস: উত্তর বঙ্গের দু’ একটি জেলা ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ জেলায় তারা বসবাস করেন। তবে মুর্শিদাবাদ, মালদা, ও দুই দিনাজপুরের প্রায় অর্ধেক মুসলিম এই মতাদর্শের সঙ্গে সংযুক্ত। এই সব জেলায় মুসলিমদের জনসংখ্যা ৪০% থেকে ৬৫%। বিশাল সংখ্যা। তারাও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংযুক্ত।

জামায়াতে ইসলামী: জামায়াতে ইসলামী একটি সুসংগঠিত অরাজনৈতিক গণসংগঠন। তাদের রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক ভিশন আছে। তারা অত্যন্ত সচেতন ও সংগঠিত। বিভিন্ন মযহবী আকীদার মানুষ এই অরাজনৈতিক সংগঠনের সদস্য ও সমর্থক। পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ জেলায় তাদের কর্ম তৎপরতা আছে। তবে সংখ্যাটা খুব বেশি নয়।

জমিয়তে আহলে সুন্নাত: এই উপদলের অনুসারীদের ব্রেলভী আকীদার অনুগামী বলা হয়। তারা বিভিন্ন পীর ও সুফি সিলসিলাল সঙ্গে সংযুক্ত। বিশাল সংখ্যা। পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব জেলায় তাদের অনুসারী আছে। তবে তারা সংগঠিত নয়। তারাও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে বিভক্ত। এই মুহূর্তে তারা সংগঠিত হতে চেষ্টা করছে।

শেরশাহবাদী: দক্ষিণবঙ্গের মানুষ এদের সম্পর্কে খুব বেশি জানে না। অথচ মুর্শিদাবাদ, মালদা ও দুই দিনাজপুরের বিশাল সংখ্যক মানুষ এই নামে পরিচিত। তাদের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ হবে। কোনো বিশ্বাসযোগ্য পরিসংখ্যান নেই। তারা সকলেই আহলে হাদিস মতাদর্শে বিশ্বাসী। তারাও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংযুক্ত। এই মুহূর্তে তারাও সংগঠিত হতে চেষ্টা করছে।

এই দল, উপদল , গণসংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব ও প্রতিপত্তি মাথায় রেখে প্রতিনিধিত্বমূলক কোঅর্ডিনশন কমিটি গঠন করে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম মিল্লাতকে ঐক্যবদ্ধ ও সুসংহত করতে না পারলে নিকট ভবিষ্যতে মুক্তির কোনো পথ নেই।