রাজনৈতিক শক্তি: মানব সভ্যতার ইতিহাসে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভূমিকা

রাজনৈতিক শক্তি: মানব সভ্যতার ইতিহাসে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভূমিকা

অধ্যাপক ডঃ নুরুল ইসলাম

মানুষের জীবনে সর্বাধিক প্রভাবশালী উপকরণ রাজনৈতিক শক্তি। ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে জীবনের সর্বস্তরে তার অমোঘ উপস্থিতি। তাই কোনো মানুষ অরাজনৈতিক থাকতে পারে না। যারা নিজেদের অরাজনৈতিক মনে করেন, তারা কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের শিকার। আপনার চাষবাস, আপনার ব্যবসা, আপনার চাকরি, আপনার দরিদ্রতা, আপনার স্বচ্ছলতা, আপনার শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ জীবন এবং আপনার অশান্ত ও নিরাপত্তাহীন জীবন- এসব কিছু কোনো না কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফলশ্রুতি। গভীর উপলব্ধি ছাড়া বোঝা যাবে না। দীর্ঘ পরিসরে আলোচনা করলে ও একাধিক উপাখ্যান বর্ণনা করলে সহজবোধ্য হবে। কিন্তু এখানে সবিস্তারে আলোচনার অবকাশ নেই।

রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব সাধারণত ব্যক্তি, সমাজ, সম্প্রদায় ও রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করে। প্রতিটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল সুদূরপ্রসারী। আজ আমি অধ্যাপনা করি এবং আপনি কর্মহীন – এগুলো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে কোনো রাজনৈতিক শক্তিশালী গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়। তারা ঠিক করে রাজনৈতিক ক্ষমতাহীনদের ভাগ্য। ক্ষমতাহীনদের কত শতাংশ মানুষকে সুবিধা দিবে আর কত শতাংশ মানুষকে বঞ্চিত করবে তা ঠিক করে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী। তাই, একই যোগ্যতা নিয়ে আপনার কর্মহীন থাকা আর আমার সরকারি চাকরি করা কোনো না কোনো ভাবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সুদূরপ্রসারী ফলশ্রুতি।

এদেশের নিকট অতীতের ইতিহাস গভীরভাবে অধ্যায়ন করুন। এদেশে ইংরেজদের উপনিবেশ স্থাপন অষ্টাদশ শতাব্দীতে। ঔপনিবেশিক শাসকদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল মুসলিম সম্প্রদায়কে অবদমিত ও বঞ্চিত করে হিন্দু সম্প্রদায়কে তোষণ ও পৃষ্ঠপোষকতা করে তাদের অনুকূলে ক্ষমতার সমীকরণ নির্মাণ করা। আবার বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে হিন্দু সম্প্রদায়কে কিছুটা অবদমিত করে মুসলিম সম্প্রদায়কে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া। এই সিদ্ধান্তগুলো কি সুদূরপ্রসারী ছিল! তার ফলশ্রুতি কি হয়েছিল! ইতিহাসের সকল পাঠক তা জানেন।
প্রথম সিদ্ধান্তের ফলে দীর্ঘ সময় ক্ষমতাসীন থাকা মুসলিম সম্প্রদায় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভাবে নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়েছিল। আবার দ্বিতীয় সিদ্ধান্তের ফলে একই সম্প্রদায় বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে জীবনের প্রতি ক্ষেত্রেই প্রাগ্রসর হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম হয়েছিল।

স্বাধীনতা ও দেশভাগ আবার উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের ভাগ্য পুনর্নির্মাণ করে। লক্ষ লক্ষ মানুষ কোনো অপরাধ ছাড়াই নিহত হয়। কোটি কোটি মানুষ ছিন্নমূল হয়। বিভাজিত ভারতবর্ষে কোথাও মুসলিম সম্প্রদায় বিপন্ন আবার কোথাও হিন্দু সম্প্রদায় বিপন্ন। এসব কিছু ছিল প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল।

স্বাধীন বিভাজিত ভারতবর্ষে মুসলিম সম্প্রদায় প্রথম দিন থেকে রাজনৈতিক ভাবে অনাথ হয়ে পড়ে। গত সাত দশক ধরে তাদের রাজনৈতিক অধিকার যে পরিমাণে সংকুচিত হয়েছে সমানুপাতিক হারে তাদের অন্যান্য অধিকারও সংকুচিত হয়েছে। এই মুসলিম বিরোধী রাজনৈতিক প্রক্রিয়া দীর্ঘস্থায়ী ও সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বহিঃপ্রকাশ। এ ক্ষেত্রে সেকুলার হিন্দু ও ফ্যানাটিক হিন্দুদের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গিগত খুব বেশি পার্থক্য নেই।
দেশে এই মুহূর্তে ফ্যানাটিক হিন্দুদের প্রবল আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতীক ও প্রতিষ্ঠান তাদের দখলে। তাদের কাছে বলিষ্ঠ কোনো জীবন দর্শন নেই। কোনো বৈপ্লবিক মতাদর্শ নেই যা দিয়ে দেশ শাসন করবে। দেশের সকল মানুষকে তারা শান্তি ও সমৃদ্ধির পথ দেখাতে পারবেনা। রূপকথার স্বপ্ন দেখিয়ে আধুনিক রাষ্ট্র শাসন সম্ভব নয়। তাদের রাজনৈতিক আদর্শের দৃঢ় ভিত্তি না থাকার জন্য একটি নেতিবাচক রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে তথাকথিত হিন্দু সম্প্রদায়কে সুসংহত করার তারা চেষ্টা করে চলেছে। তাদের সেই নেতিবাচক আদর্শের ভিত্তিভূমি হচ্ছে ইসলামের প্রতি ঘৃণা ও মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ।

আমার বিশ্বাস, এই নেতিবাচক রাজনৈতিক আদর্শে অনুপ্রাণিত করে বিশাল সংখ্যক মানুষকে দীর্ঘদিন ধরে রাখতে পারবেনা। তাদের স্বাভাবিক ও সহজাত অন্তর্কলহ ও বিভেদ অতীতে কোনো দিন তাদের শক্তিশালী হতে সাহায্য করেনি। এই আপাত ঐক্য কত দিন স্থায়ী হয় তার জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে।

তবে, বিপন্ন ও বিদ্ধস্ত মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দকে সচেতনভাবে এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত ভয়ানক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। পরিস্থিতি উন্নতি সম্ভব না হলে স্ট্যাটাস কো অক্ষুন্ন রাখতে হবে। এজন্য রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী স্থায়ী ও বিশ্বাসযোগ্য পরিষদ থাকা বাধ্যতামূলক। গভীর প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টি ছাড়া সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। এই মুহূর্তে মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ।