মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের অতীত-বর্তমান ও ভবিষ্যতের পোস্টমর্টেম

    মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনের অতীত-বর্তমান ও ভবিষ্যতের পোস্টমর্টেম

    মীর শমীম উদ্দিন

    অতীত :— পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রোষিত 614 টি মাদ্রাসাতে শিক্ষক শিক্ষিকা নিয়োগে স্বজনপোষণ ও আর্থিক কেলেঙ্কারি যাতে না হয়, স্বচ্ছতা ও মেধা বজায় থাকে এজন্য তৎকালীন বাম সরকার স্কুল সার্ভিস কমিশনের অনুরূপ 2007 সালে পশ্চিমবঙ্গ মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন গঠন করেন । এর আগে স্কুল সার্ভিস কমিশন থেকে মাদ্রাসাতে শিক্ষক- শিক্ষিকা নিয়োগ হতো। মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন 2013 সাল পর্যন্ত বিনা বাধাবিঘ্নই নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে স্বচ্ছতার সঙ্গে শিক্ষক শিক্ষিকা নিয়োগ করে আসছে।কিন্তু “সুখে খেলে ভূতে কিলায়”। সমাজের কিছু শ্রেণীর মানুষের লোভ-লালসার তো সীমা পরিসীমা নেই !!এই লোভ লালসার বশবর্তী হয়ে নকল সংখ্যালঘু তকমার নামাবলী ধারী কতিপয় আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষ চুপ থাকতে পারে না ।2013 সালে পূর্ব মেদিনীপুরের মাত্র তিনটি মাদ্রাসা ,কনটাই রহমানিয়া, গিমাগেরিয়া এবং মাজনা, এদের অভিভাবক হিসাবে কন্টাই রহমানিয়া হাই মাদ্রাসা, সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিচালন কমিটি শিক্ষক- শিক্ষিকা নিয়োগ করবে বলে মহামান্য কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করে।এই পরিচালন কমিটির আইনজীবীর সঙ্গে সরকারি আইনজীবীর যোগসাজশে এবং একান্তই সরকারের অবহেলায়, ইচ্ছাকৃত সরকারি আইনজীবী এক ধরনের ওয়াকওভার দিলে ,মহামান্য হাইকোর্টের সিঙ্গেল ও ডিভিশন বেঞ্চ মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন ।এবং পরিচালন কমিটিকে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা প্রদান করেন। সরকার বাহাদুর প্রথমে এ রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিমকোর্ট যাব যাব করে প্রায় তিন মাস গড়িমসি করে কাটিয়ে দেয়, অবশেষে 2015, 9 ই ডিসেম্বর মহামান্য হাইকোর্টের ফাইনাল রাইকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার মান্যতা দেয় এবং কমিটির মাধ্যমে শিক্ষক -শিক্ষিকা নিয়োগের জন্য 3 রা মার্চ 2016, সরকার নোটিফিকেশন প্রকাশ করে। সরকারের গরিমসি ভাবের জন্য ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসার কিছু শিক্ষক শিক্ষিকা দ্বারা গঠিত, অরাজনৈতিক সংগঠন বেঙ্গল মাদ্রাসা এডুকেশন ফোরাম 16 ই ফেব্রুয়ারি 2016, হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের রায় কে চ্যালেঞ্জ করে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করে। এবং 14 ই মার্চ 2016 মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়। মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে পুনরায় পুনর্বহাল করার জন্য বেঙ্গল মাদ্রাসা এডুকেশন ফোরামের পক্ষ থেকে 2016 থেকে 2019 দীর্ঘ চার বছর সুপ্রিমকোর্টে আইনি লড়াই যেমন চলতে থাকে, তেমনি রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে মিটিং, মিছিল, সমাবেশ ও বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে সংগঠিত হয় বহু কনফারেন্স। শিক্ষক – শিক্ষিকা নিয়োগে যাতে স্বচ্ছতা বজায় থাকে ও মেধা প্রাধান্য পায়, এজন্য সমাজের সর্বস্তরের মানুষের গণস্বাক্ষর নেওয়া হয় ।সমাজের বিভিন্ন স্তরের শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ, এবং শিক্ষা জগতের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষা প্রেমী ,বুদ্ধিজীবী মহল ,কবি ,সাহিত্যিক, নাট্যকার থেকে শুরু করে এক কথায় সুশীলসমাজ, এক বাক্যে সকলেই বলেন, স্বচ্ছতা বজায় রাখাতে, মাদ্রাসাতে সংখ্যালঘু ,দলিত এককথায় প্রান্তিক শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য অবশ্যই মেধাকে প্রাধান্য দেওয়া দরকার। যেটা সার্ভিস কমিশন এর মাধ্যমেই সম্ভব। পরিচালন কমিটির মাধ্যমে নিয়োগে স্বজনপোষণ, আর্থিক কেলেঙ্কারি ,টাকার জোরে মেধা হত্যা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও ব্যাপক ভাবে হবে (যার প্রমাণ আগেই পাওয়া গেছে)। এই মর্মে সকলেই একবাক্যে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন পুনর্বহালের জন্য সহমত প্রদান করেন , এবং বহু কনফারেন্স ও সমাবেশে তাদের বলিষ্ঠ বক্তব্য পেশ করেন। এরই মধ্যে 2018 সালে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের আদেশের বলে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন মাদ্রাসাগুলিতে শিক্ষক নিয়োগ করে, আর রাজ্য সরকারের নোটিফিকেশনের ফলে কমিটি যে 42 জন শিক্ষককে নিয়োগ করেছিল সুপ্রিম কোর্ট শুধু তাদেরই বেতন দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এবং সরকারও 42 জনের বেতন দেওয়া শুরু করে।

    ” মানুষ খাঁটি কিনা চেনা যায়, তা শুধু কেবল টাকার সম্পর্কে ,এখানে নাকি ফাঁকি চলে না !!”এই টাকার গন্ধ পেয়ে কয়েকটি কমিটি আর ঠিক থাকতে না পেরে, লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে, কয়েকশো বেকার ছেলেমেয়েকে চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে কাগজপত্র নকল করে, জাল জোচ্চুরির আশ্রয় নিয়ে বহু আমলা, ও নেতার সহযোগিতায় 600 জনের অধিক ভুতুড়ে শিক্ষকের বেতন চেয়ে পুনরায় সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে। সুপ্রিম কোর্ট তাদের আবেদন রিজেক্ট করে। অতঃপর 2020, 6ই জানুয়ারী মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট চূড়ান্ত আদেশ প্রদান করে মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশনকে পুনর্বহাল করেন, এবং আগের ন্যায় সমস্ত বকেয়া কাজ সার্ভিস কমিশনকে সম্পন্ন করতে বলেন। একই ভাবে কমিটির দ্বারা আগের নিয়োগপ্রাপ্ত শুধু 42 জন শিক্ষকের বেতন দিতে বলেন।

    বর্তমান :— ইতিমধ্যে কিছু পরিচালন কমিটি পুনরায় টাকার নেশায় পাগল হয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় কে গোপন করে, 200 অধিক ভুতুড়ে শিক্ষকের প্রায় পাঁচ বছরের এরিয়ার সহ বেতন চেয়ে সরকারের বিরুদ্ধে কনটেম্পট পিটিশন দাখিল করে। যে সমস্ত শিক্ষকের বেতন চেয়েছে , প্রায় পাঁচ বছর কোন ছাত্র-ছাত্রী তাদের দেখেনি। স্কুলে সশরীরে হাজির হয়নি। এমনকি বহু স্কুল কর্তৃপক্ষও জানেনা ,কে নিয়োগ পেয়েছে?কে এদের নিয়োগ দিয়েছে? কি ভাবে নিয়োগ হয়েছে? এবং এই শিক্ষকের বাড়ি কোথায় ? এলাকাবাসীও পর্যন্ত কোনো দিন এই তথাকথিত ভূতুরে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দেখেনি। দেখবেই বা কি করে ? নিয়মমাফিক তো এদের নিয়োগ হয়নি ।তাই সশরীরে হাজির হয় না । যে সব দুষ্টচক্র সরকারের কয়েকশো কোটি টাকা আত্মসাৎ করবে বলে প্রসেস অনুযায়ী এই শিক্ষকদের নিয়োগ না করে, ডকুমেন্ট নকল করে ডাইরেক্ট সুপ্রিমকোর্টে কনটেম্পট পিটিশন করেছে , এতে শুধু কমিটির লোকই জড়িত নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ডিপারমেন্টের বহু আমলা এবং দাপুটে নেতা। এরা যেনতেন প্রকারে সরকারের কয়েকশো কোটি টাকা আত্মসাৎ করতে ভুতুড়ে শিক্ষকদের উপর অদৃশ্য শক্তির মত চরমভাবে ভর করেছে। এখন এই ভূত যেকোন উপায়ে ছাড়াতে হবে।মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট সমগ্র দুনম্বরী বিষয়টি অবগত নয়। কারণ সুপ্রিমকোর্টকে অবগত করা হয়নি ।যিনি অবগত করবেন, সরকারের আধিকারিক ও এ্যাডভোকেট জেনারেল তিনারা কমিটির সাথে আপোষ করে সরকারি খাতের কোটি কোটি টাকা পার্সেন্টেজ অনুযায়ী তছরুপের চক্রান্তে লিপ্ত।প্রমাণস্বরূপ সুপ্রিম কোর্টের হেয়ারিং এ কমিটি পক্ষের আইনজীবী একতরফা আপিল করছেন ,আর সরকার বাহাদুরের উকিল নিয়মিত অনুপস্থিত থাকছেন যাতে হাইকোর্টের মতো কমিটি পক্ষের উকিল ওয়াকওভার পেয়ে যায়।সুপ্রিম কোর্টের মূল মামলা চলাকালীনও সরকারি উকিল ঠিক একইভাবে চেষ্টা করেছিল কমিটিকে জিতিয়ে দেওয়ার ।কিন্তু সেখানে বেঙ্গল মাদ্রাসা এডুকেশন ফোরামের পক্ষ থেকে দুধে দুধে আইনজীবী ছিলেন।যার জন্য সরকারি আইনজীবী ও কমিটির আইনজীবীর যোগসাজশ পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। বর্তমানে থার্ড পার্টি হিসেবে ফোরাম যেহেতু অংশ নিতে পারছে না (এখানে মূল পার্টি সরকার পক্ষ এবং কমিটি) এই সুযোগে সরকার পক্ষের আইনজীবীর নীরবতা ও অনুপস্থিতি এবং কমিটির আইনজীবীর একতরফা আর্গুমেন্ট একরকম ফাঁকা মাঠে গোল ।সরকার ও কমিটির অসাধু ষড়যন্ত্রের ফলে মাদ্রাসায় চাকরিরত শিক্ষক-শিক্ষিকারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।

    ভবিষ্যত:–এই সমস্ত দুষ্টচক্রের অসাধু মতলব ও পক্রিয়া যদি পশ্চিমবঙ্গের আপামোর শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ এবং মাদ্রাসায় কর্মরত শিক্ষক -শিক্ষিকা , শিক্ষা কর্মীরা ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসা শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের স্বার্থে সংঘটিত হয়ে প্রতিবাদ না করেন, তাহলে অচিরেই মাদ্রাসা শিক্ষার ইতিহাসে চরম দুর্দিন নেমে আসবে। ফলস্বরূপ: বর্তমানে 200 জন ভুতুড়ে শিক্ষকের বেতন দিতে যদি সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেন, খুব শীঘ্রই টাকার লালসায় এই অসাধু চক্র ,200 থেকে 2000, 2000 থেকে 10,000 ভুতুড়ে শিক্ষক নিয়োগ করতে কালবিলম্ব করবে না। বহু মাদ্রাসাতে কর্মরত শিক্ষক এর পোস্টের এগেনস্টে ভুতুড়ে শিক্ষক নিয়োগ হয়ে আছে।কিছুদিন আগে 4/5 জন ট্রানস্ফার প্রার্থী ,ট্রানস্ফার নিয়ে নতুন মাদ্রাসা তে গেছেন, বর্তমান মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ তাদের জয়েন করিয়েছেন। কিন্তু অ্যাপ্রুভাল এর জন্য ডিআই অফিসে গেলে ,ডিআই বাবু বলছেন আপনাদের অ্যাপ্রুভাল হবে না, এই পোষ্টের এগেনস্টে অন্য একজন নিযুক্ত হয়েছে, (অশরীরী , অবশ্য কেউ তাকে দেখেনি ,মানে ভুতুড়ে)।যিনি অরিজিনাল শিক্ষক আগের চাকরি থেকে রিলিজ নিয়ে, নতুন মাদ্রাসাতে জয়েন করে অ্যাপ্রভাল না পেয়ে হাহুতাশ করে কেঁদে কেঁদে বেড়াচ্ছেন। এদের চোখের জল মোছার বর্তমানে কেউ নেই।যারা এখনও ভাবছেন আমার তো ট্রানস্ফার দরকার নেই ,আমি অনেকদিন ধরে এই পোস্টে বাড়ির কাছে চাকরি করছি। অন্যের অসুবিধা হচ্ছে তো কি হবে ?এতে আমার তো কিছু যায় আসে না ।কিন্তু মনে রাখবেন এই আগুন যেহেতু একবার লেগেছে এটা খুব শীঘ্রই পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত মাদ্রাসাতে দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়বে ।তখন দেখবেন কে ,কার পোস্টের এগেনস্টে নিযুক্ত হয়ে আছে ? তখন নিজে যে অরিজিনাল শিক্ষক সুপ্রিম কোর্ট থেকে প্রমাণ করে আনতে, ব্যক্তিগতভাবে কত জোড়া জুতোর ফিতে ছিঁড়বে তা বলা যাবে না ??
    দুঃখের হলেও সত্য আসামে, বর্তমান সরকার ধর্মীয় কারণ দেখিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষা প্রায় তুলেই দিলো, কেউ কিছু করতে পারল না ।বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে মাদ্রাসা কে কেন্দ্র করে যে হারে দুর্নীতির পাহাড় জমছে অচিরেই যদি এর সুরাহা না হয় ,তাহলে মনে রাখবেন সরকারের পালা বদল হলে, এই দুর্নীতিকে অস্ত্র করে আগামী সরকার কিন্তু বাংলার মাদ্রাসা শিক্ষাকে তুলে দিতে কুণ্ঠাবোধ করবে না ।তখন কিন্তু আমাদের নীরব দর্শকের ভূমিকা ছাড়া কিছু করার থাকবে না। সরকার বাহাদুর সমস্ত বিষয় অবগত হয়েও অসাধু চক্রের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ,মাদ্রাসায় কর্মরত সকল কে এমন আগুনে নিক্ষেপ করছে ,এর দায় বর্তমান সরকার এড়িয়ে যেতে পারে না ।বলা যায় পুরোপুরি দায়ী ।এবং এই সরকারের মাথায় যিনি বসে আছেন মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী ,তিনিও এই দায় এড়িয়ে যেতে পারেন না।

    পরিশেষে বলি; বেঙ্গল মাদ্রাসা এডুকেশন ফোরাম যেরকম এককভাবে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টে দীর্ঘদিন আইনি লড়াই করে, কলকাতার রাজপথে মিটিং, মিছিল, সমাবেশ করে ,মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন কে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে। আগামীতেও সেই কলকাতার রাজপথে গন আন্দোলন করে ,সরকার ও কমিটির এই অসাধু চক্রের সমস্ত ষড়যন্ত্রকে জনসমক্ষে উন্মোচিত করবে ইনশাল্লাহ্।