হজরত মুহাম্মদ (সঃ) এর তৈরি হিলফুল ফুজুল ও বর্তমান যুবসমাজ

হজরত মুহাম্মদ (সঃ) এর তৈরি হিলফুল ফুজুল ও বর্তমান যুবসমাজ

আলি আকবর, বঙ্গ রিপোর্ট: মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব। তিনি শুধু ইসলাম ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেই শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেননি, মানবজাতির সব অন্যায়, অনাচার, অবিচার, শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সফল আন্দোলনকারী এবং মানবজাতির মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবেও শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছিলেন।

তাঁর জীবনের প্রতিটি কাজ মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শক ও আদর্শ শিক্ষা হিসেবে সর্বজন সমাদৃত। মহানবী (সা.)-এর জীবনের তেমনি একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে ‘হিলফুল ফুজুল’ প্রতিষ্ঠা। ‘হিলফুল ফুজুল’ অর্থ শান্তিসংঘ। নবুয়তপ্রাপ্তির ১৫ বছর আগে মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি আরব সমাজের সব অন্যায়, অবিচার, শোষণ ও নির্যাতন বন্ধের লক্ষ্যে তাঁর সমবয়সী কিছু যুবককে নিয়ে এ শান্তিসংঘ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ সংঘের প্রতিটি কর্মসূচি থেকে যুবসমাজের জন্য বহু শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে।

মহানবী (সা.) এমন একটি সময় আরব ভূমিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যখন আরব সমাজে চরম বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা বিরাজ করছিল। এ সমাজে ছিল না কোনো নিয়মনীতি ও আইনের শাসন। গোত্রীয় কলহ, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, সামাজিক শ্রেণিভেদ, নারী নির্যাতন, ব্যভিচার, সুদ, ঘুষ, মদ, জুয়া প্রভৃতি সমাজকে মারাত্মকভাবে কলুষিত করেছিল। ঐতিহাসিকরা আরবের এই সময়কে ‘আইয়ামে জাহেলিয়া’ বা ‘অন্ধকার যুগ’ বলে অভিহিত করেছেন।

জাহেলিয়া যুগের এই রক্তপাত, অন্যায় ও অনাচার বালক মুহাম্মদ (সা.)-এর মনে গভীর রেখাপাত করে। তিনি সমাজের সব অন্যায়, অবিচার ও নির্যাতন বন্ধের উপায় খুঁজে বের করার জন্য সর্বদা চিন্তায় মগ্ন থাকতেন। অবশেষে তাঁর মনে একটি অভিনব চিন্তার উদয় হলো। তিনি তাঁর সমবয়সী কতিপয় যুবককে নিয়ে ‘হিলফুল ফুজুল’ নামে একটি সংঘ গড়ে তুললেন। এ সংগঠন সমাজের সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল।

আরব সমাজের সব অন্যায় প্রতিরোধের লক্ষ্যে হিলফুল ফুজুল গঠিত হলেও একটি বিশেষ যুদ্ধের ভয়াবহতার পরিপ্রেক্ষিতে মহানবী (সা.) এ সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন বলে মনে করা হয়। এ যুদ্ধের নাম ‘হরবুল ফুজ্জার’ বা অন্যায় সমর। সম্ভবত ৫৮৫ খ্রিস্টাব্দে ওকাজ মেলার (মক্কার ওকাজ নামক স্থানে প্রতিবছর এই মেলা বসত) ঘোড়দৌড়, জুয়াখেলা ও কাব্য প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে পবিত্র জিলকদ মাসে মক্কার কোরাইশ ও হাওয়াজিন গোত্রের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়।

আরবে পবিত্র জিলকদ মাস ছিল শান্তির মাস। এ মাসে আরব দেশে সব ধরনের যুদ্ধবিগ্রহ নিষিদ্ধ ছিল। তাই জিলকদ মাসে শুরু হওয়া এ যুদ্ধকে ‘হরবুল ফুজ্জার’ (মতান্তরে ‘ফিজার’) বা অন্যায় সমর বলা হয়। দীর্ঘ পাঁচ বছর স্থায়ী এ যুদ্ধের ভয়াবহতা বালক মুহাম্মদ (সা.)-এর কোমল মনকে মারাত্মকভাবে ব্যথিত করে তোলে। এ যুদ্ধে অনেক লোক প্রাণ হারিয়েছিল। এ যুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ১৪ কিংবা ১৫ বছর (সিরাতে ইবনে হিশাম)।

যদিও তিনি অস্ত্র হাতে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেননি; কিন্তু এই যুদ্ধের বীভৎসলীলা দেখে বালক মুহাম্মদ (সা.) অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েন এবং আরববাসীদের এরূপ ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে পরিত্রাণের উপায় নিয়ে ভাবতে থাকেন। আরবে শান্তি বজায় রাখার জন্য তিনি একটি শান্তিসংঘ গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ৫৯৫ খ্রিস্টাব্দে সমমনা নিঃস্বার্থ কিছু উৎসাহী যুবক ও পিতৃব্য জুবাইরকে নিয়ে তিনি এ শান্তিসংঘ গঠন করেন।

এ সংঘের চারজন বিশিষ্ট সদস্য ফজল, ফাজেল, ফজায়েল ও মোফাজ্জেলের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছিল ‘হিলফুল ফুজুল’। এ সংঘের কর্মসূচি ছিল নিম্নরূপ : (১) দেশে শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা, (২) বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে সদ্ভাব ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধ করা, (৩) অত্যাচারিতকে অত্যাচারীর হাত থেকে রক্ষা করা, (৪) দুর্বল, অসহায় ও এতিমদের সাহায্য করা, (৫) বিদেশি বণিকদের জান ও মালের নিরাপত্তা বিধান করা এবং (৬) সর্বোপরি সব ধরনের অন্যায় ও অবিচার অবসানের চেষ্টা করা। এ শান্তিসংঘ প্রায় ৫০ বছর ধরে স্থায়ী হয়েছিল। এভাবে মুহাম্মদ (সা.) মানুষের কল্যাণের জন্য আত্মনিয়োগ করেন এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত হিলফুল ফুজুলই বিশ্ব ইতিহাসে সর্বপ্রথম কল্যাণী সেবাসংঘের মর্যাদা লাভ করে। এভাবে হজরত মুহাম্মদ (সা.) নবুয়তপ্রাপ্তির আগেই শান্তির অগ্রদূত হিসেবে পৃথিবীর বুকে আত্মপ্রকাশ করেন।

জাহেলি যুগে আরব সমাজের অন্যায়, অবিচার প্রতিরোধ করার জন্য হিলফুল ফুজুল গঠিত হলেও মহানবী (সা.)-এর নেতৃত্বে গঠিত এ সংগঠনটির শিক্ষা সর্বকালের, সর্বসমাজের যুবকদের জন্য একটি আদর্শ শিক্ষা ও পথনির্দেশক হয়ে রয়েছে। বর্তমান যুগে জাহেলি যুগের মতো কলুষিত সমাজ পরিলক্ষিত না হলেও পৃথিবীর সব দেশে, সব সমাজেই এখনো বহু অন্যায়, অবিচার ও বৈষম্য রয়ে গেছে। এখনো সমাজে বহু মানুষ নিপীড়িত, নির্যাতিত ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছে। এখনো সমাজে হত্যা, নারী নির্যাতন, সুদ, ঘুষ প্রভৃতি অসামাজিক কাজ কম-বেশি প্রচলিত রয়েছে। হিলফুল ফুজুলের মতো সংগঠিত হয়ে যুবসমাজ আজও সমাজের সব অন্যায় প্রতিরোধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

ইসলাম ধর্মে যুবকদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। যুবক বয়সের ইবাদত আল্লাহর কাছে অধিক পছন্দনীয়। প্রকৃতপক্ষে যুবক বয়সই দেশ ও জাতি গঠনে দায়িত্ব পালনের শ্রেষ্ঠ সময়। এ সময় গায়ে থাকে শক্তি এবং মনে থাকে উৎসাহ, উদ্দীপনা ও সাহস। এ শক্তি ও সাহস কাজে লাগিয়ে শুধু সামাজিক অসাম্য দূরীকরণই নয়, পরিবার, সমাজ ও দেশের উন্নয়ন ও সার্বিক কল্যাণ সাধনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব। হিলফুল ফুজুল শুধু অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেই শেখায়নি, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধান, সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং দেশ ও জাতির কল্যাণ সাধনের শিক্ষা দিয়েছে। মহানবী (সা.)-এর এই সংগঠনের আলোকে প্রতিটি গ্রাম ও মহল্লায় শান্তিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হলে দেশের শান্তিশৃঙ্খলা ও উন্নয়ন অনেকটাই নিশ্চিত হবে। মহানবী (সা.)-এর এ আদর্শ প্রত্যেক যুবকের মনে প্রতিফলিত হোক।