শের-ই-মহিশূর টিপু সুলতান জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে গেছেন

শের-ই-মহিশূর টিপু সুলতান জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে গেছেন

বঙ্গ রিপোর্ট ডিজিটাল ডেস্ক: শের-ই-মহিশূর টিপু সুলতান  জন্ম: ২০ নভেম্বর, ১৭৫০ । তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের মহীশূর রাজ্যের শাসনকর্তা। তিনি একজন বীর যোদ্ধা ছিলেন। ইংরেজদের বিরুদ্ধে তিনি বীরত্ব সহকারে যুদ্ধ করেন। তিনি তাঁর শৌর্যবীর্যের কারণে শের-ই-মহীশূর(মহীশূরের বাঘ) নামে পরিচিত ছিলেন।

দক্ষিণ ভারতের মহীশূর রাজ্যের শাসক ছিলেন টিপু সুলতান ৷ পিতা হায়দার আলী মহীশূর রাজ্যের সেনাপতি ছিলেন ৷ শ্রীরঙ্গপত্তনম গ্রামে কাবেরী নদীর একটি ব-দ্বীপে নির্মিত একটি দূর্গ থেকে রাজ্য শাসন করতেন৷ বর্তমানে শ্রীরঙ্গপত্তনম গ্রাম দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের মান্ডিয়া জেলার অন্তর্গত৷ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর সঙ্গে যুদ্ধে ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে নিহত হন। টিপুর এক সেনাপতি মীর সাদিক বিশ্বাসঘাতকতা করে ব্রিটিশদের সঙ্গে হাত মেলান৷ পরে তার পরিবারের লোকজনকে ভেলোরের দূর্গে বন্দী করে রাখে ব্রিটিশ শাসকরা৷

টিপু সুলতানকে ডাকা হতো শের-ই-মহীশূর; উপাধিটা ইংরেজদেরই দেওয়া। তাঁর এই বাঘ (শের) হয়ে ওঠার পিছনে অনেকগুলো বিষয় সম্পর্কিত ছিলো। মূল কারণ ছিলো তাঁর অসাধারণ ক্ষীপ্রতা, দক্ষতা, বুদ্ধিমত্তা আর কৌশলপূর্ণ রাজ্য পরিচালনা – বাবার সুযোগ্য উত্তরসূরি ছিলেন টিপু সুলতান। বাবা হায়দার, ১৭৪৯ খ্রিস্টাব্দে টিপু নামে এক ফকিরের দোয়ায় এক পুত্রসন্তান লাভ করেন এবং আনন্দচিত্তে ঐ ফকিরের নামেই ছেলের নাম রাখেন “টিপু”। মহীশূরের স্থানীয় ভাষায় (কানাড়ী ভাষা) ‘টিপু’ শব্দের অর্থ হলো বাঘ। হয়তো তাঁকে ‘শের-ই-মহীশূর’ ডাকার পিছনে এটাও একটা কারণ ছিলো।

ছোটবেলা থেকেই টিপু, বাঘের গল্প শুনতে ভালোবাসতেন। বাবাই তাঁকে বাঘের গল্প শোনাতেন। কিশোর বয়সে টিপু সুলতান বাঘ পুষতে শুরু করেন। বাঘ নিয়ে তাঁর ব্যঘ্রতার শেষ ছিলো না। বাবার মৃত্যুর পর তিনি যখন সিংহাসনে আরোহণ করলেন, তখন বাবার পুরোন সিংহাসনটি তিনি ঠিক পছন্দ করলেন না। তাই তিনি তৎকালীন শ্রেষ্ঠ কারিগর দিয়ে কাঠের ফ্রেমের উপর সোনার পাত বসিয়ে তার উপর মণিমুক্তা ও রত্নখচিত একটি সিংহাসন বানিয়ে নিলেন, যাকে বরং “ব্যাঘ্রাসন”ই (Tiger throne) বলা যায়। কারণ আট কোণা ঐ আসনটির ঠিক মাঝখানে ছিলো একটি বাঘের মূর্তি। ৮ ফুট চওড়া আসনটির রেলিংয়ের মাথায় বসানো ছিলো সম্পূর্ণ স্বর্ণে তৈরি দশটি বাঘের মাথা, আর উপরে উঠার জন্য ছিলো দুধারে, রূপার তৈরি সিঁড়ি। আর পুরো ব্যাঘ্রাসনটাই ছিলো বাঘের শরীরের মতো ডোরাকাটা।

টিপু সুলতানের রাজ্যের প্রতীক ছিলো বাঘ। এই বাঘ ছিলো তাঁর অনুপ্রেরণার মতো। তাঁর রাজ্যের পতাকায় কানাড়ী ভাষায় লেখা ছিলো “বাঘই ঈশ্বর”। তিনি সিংহাসনে বসে মাঝে মাঝেই বলতেন:

“ভেড়া বা শিয়ালের মতো দু’শ বছর বাঁচার চেয়ে বাঘের মতো দু’দিন বেঁচে থাকাও ভালো”

তাঁল সমস্ত পরিধেয় পোষাক ছিলো হলুদ-কালো রঙে ছাপানো আর বাঘের শরীরের মতো ডোরাকাটা। তিনি যে তলোয়ার ব্যবহার করতেন, তার গায়েও ছিলো ডোরা দাগ এবং হাতলে ছিলো খোদাই করা বাঘের মূর্তি। তাঁর ব্যবহৃত রুমালও ছিলো বাঘের মতো ডোরাকাটা। তাঁর রাজ্যের সমস্ত সৈনিকের পোষাকে থাকতো বাঘের ছবি। সৈন্যদের ব্যবহার্য তলোয়ার, বল্লম, বন্দুকগুলোর নল, কুদো, হ্যামারেও আঁকা থাকতো বিভিন্ন আকারের বাঘের প্রতিরূপ কিংবা মূর্তি। এমনকি তিনি তাঁর রাজ্যের প্রধান প্রধান সড়কের পাশে, বাড়ির মালিকদেরকে বাড়ির দেয়ালে বাঘের ছবি আঁকার নির্দেশ জারি করেছিলেন। তখনও তাঁর বাঘ পোষার বাতিক যায়নি এবং রাজবাড়িতে বেশ কয়েকটি পোষা বাঘ ছিলো। তার কয়েকটি আবার তাঁর ঘরের দরজার সামনে বাঁধা থাকতো।

১৭৮২ সালে পিতার মৃত্যুর পর টিপু সুলতান সিংহাসনে আরোহন করেন। পরে তিনি লুৎফে আলী নামক সেনা প্রধানকে বিজনৌরে পাঠান এবং নিজে ১৭৮৩ সালে মালাবার যান। আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এ সময় ফরাসীগণ টিপুকে ত্যাগ করে চলে যাওয়ায় তাঁর বাহিনীতে সাময়িক দুর্বলতা দেখা দেয়। তিনি ১৭৮৪ সালের ১১ মার্চ ইংরেজদের সাথে সন্ধি করেন। এ সময় ইংরেজ, মারাঠা ও নিজাম অক্ষজোট গঠন করে টিপুর রাজ্য মহীশূর আক্রমণের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। ১৭৮৬-১৯৮৭ তে এদের সাথে যুদ্ধ হয় এবং ১৭৮৭ তে এক সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ সন্ধিতে টিপুকে বাদশাহ এবং নওয়াব টিপু সুলতান ফতেহ আলী খান বাহাদুর উপাধিতে ডাকা স্থির হয়। ১৭৮৪ সালে টিপু উসমান খানকে ইস্তাম্বুল রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করেন। এ সময় তিনি ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে দূত পাঠান।

টিপু সুলতান ১৭৮৪ সাল থেকেই শ্রীরঙ্গপট্টমে মসজিদ ইআলা নামে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন এবং ১৭৯০ সালে এ মসজিদেই ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করেন। তিনি খলিফায় সনদ পাওয়ার পর নিজ নামে ইমামী নামক মুদ্রা জারি করেন। তিনি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) নবুওয়াত লাভের বছর থেকে মুহাম্মদী সন নামে একটি নতুন সাল চালু করেন। তিনি শ্রীরঙ্গপট্টম, বাঙ্গালোর, চীতল, দারাক ও নাগর নামক স্থানে ‘তারামন্ডল’ নামে সমরাস্ত্র কারখানা স্থাপন করেন। এসব কারখানায় তোপ, বন্দুক, চাকু ইত্যাদি তৈরি হত। ইরান, আফগানিস্তান এবং ফরাসী সম্রারাটের কাছে তিনি দূত প্রেরণ করেন। তিনি সামরিক প্রশিক্ষণ কলেজ স্থাপন করেছিলেন।

তাঁর এ সুশৃংখল প্রশাসন ও সামরিক ব্যবস্থাপনায় ভীত ইংরেজ, মারাঠা ও নিজাম সরকার যৌথভাবে টিপুকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। ১৭৯১ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস নিজেই সেনাপতি হিসেবে বাঙ্গালোর দখল করেন। এরপর নিজামের সাথে মে মাসে টিপুর রাজধানী শ্রীরঙ্গপট্টম অবরোধ করেন। টিপুর কৌশলের কাছে তাদের এ অবরোধ পর্যুদস্ত হয়। ফলে তারা অবরোধ ত্যাগ করে চলে যেতে বাধ্য হয়। ১৭৯২ সালে মারাঠাসহ অক্ষশক্তি পুনরায় শ্রীরঙ্গপট্টম অবরোধ করে। ফলে টিপু তাঁর রাজ্যের অর্ধেকাংশ অক্ষশক্তির হাতে সমর্পণসহ যুদ্ধের ক্ষতিপূরণস্বরূপ তিন কোটি ত্রিশ লাখ টাকা পরিশোধের অঙ্গীকারে ও তার দুই পুত্রকে ইংরেজদের হাতে জিম্মি রাখার শর্তে এক সন্ধি করতে বাধ্য হন।

১৭৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে নেপোলিয়ান চিঠি দিয়ে টিপুকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন। টিপু মারাঠা ও নিজামকে দেশরক্ষায় ইংরেজদের বিরুদ্ধে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানালেও তারা অদূরদর্শিতার জন্য এ আহ্বানে সাড়া না দিয়ে ইংরেজদের দালালীতে ব্যস্ত থাকে। ১৭৯৯ সালের ২২ ফের্ব্রুয়ারি ওয়েলেসলী টিপুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। বোম্বাই থেকে প্রেরিত একদল ইংরেজ সৈন্য ৬ মার্চ কুর্গ সীমান্তে টিপুর সেনাদলকে পরাজিত করে। ইংরেজ সেনাপতি জর্জ হেরিস মালভেলী নামক স্থানে ২৭ মার্চ টিপুর সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করে। ২২ এপ্রিল টিপুর চার পুত্র ও চার সেনাপতিকে জিম্মি রাখা রাজ্যের অর্ধেক অক্ষশক্তিকে দান, আরও দুই কোটি টাকা যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ চেয়ে ২৪ ঘন্টার মধ্যে উত্তরদানে সেনাপতি হেরিসের মাধ্যমে ইংরেজরা প্রস্তাব পাঠায়।

টিপু এ প্রস্তাবে সাড়া না দেয়ায় ইংরেজরা পুনরায় অবরোধ সৃষ্টি করে এবং গোলাবর্ষণের মাধ্যমে শ্রীরঙ্গপট্টমের টিপুর দুর্গে ছিদ্র সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। এদিকে মীর সাদিক নামক টিপুর সেনাদলের এক বিশ্বাসঘাতক বেতন দেয়ার নাম করে ছিদ্রপথের পাহাড়ারত সৈন্যদের সরিয়ে এদিক দিয়ে ইংরেজদের দুর্গে প্রবেশের পথ করে দেয়। মীর সাদিক ছিলেন টিপু সুলতানের চাচা শ্বশুর। ফলে সৈন্যদের মধ্যে বিশৃংখল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এক অংশ যুদ্ধে থাকলেও অন্য অংশ তখন চক্রান্তের শিকার। এমতাবস্থায় ৪ মে যুদ্ধরত অবস্থায় টিপু সুলতান বন্দুকের গুলীতে আহত হয়ে শহীদ হন।

(তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া)