তিন অগ্নিকন্যার সংগ্রামী লড়াই

তিন অগ্নিকন্যার সংগ্রামী লড়াই

অমিত সরকার ,বঙ্গ রিপোর্ট: “নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার কেন নাহি দিবে অধিকার,হে বিধাতা?”নারী শক্তি যে আমাদের দেশের কত বড় শক্তি বিশ্বের দরবারে বিদেশী শক্তির সাথে যেন মণিকাঞ্চনযোগ যোগ ঘটিয়েছে এই তিন অগ্নিকন্যা।

স্বপ্না বর্মন:-
দীর্ঘ ষোলো বছর পর ফের সোনা এল বাংলার ঘরে। জাকার্তা এশিয়ান গেমসে হেপ্টাথলনের মতো কঠিন ইভেন্টে ভারতকে সোনার পদক এনে দিলেন জলপাইগুড়ির মেয়ে স্বপ্না বর্মন। আর হেপ্টাথলনে এই প্রথম সোনা পেল ভারতীয় অ্যাথলেটিক্স। দু’দিন ধরে চলা হেপ্টাথলনের সাতটি ইভেন্টে ২১বছরের স্বপ্নার স্কোর ৬০২৬ পয়েন্ট।

জলপাইগুড়ির এক অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের মেয়ে স্বপ্নার এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে দাঁতে দাঁত কামড়ে লড়াইয়ের দীর্ঘ ইতিহাস। স্বপ্নার বাবা পঞ্চানন বর্মন পেশায় ভ্যান চালক। অসুস্থতার জন্য গত সাতবছর ধরে তিনি শয্যাশায়ী। মা বাসনা বাড়ি বাড়ি কাজ করে ও চা বাগানে পাতা তুলে সামান্য টাকা রোজগার করেন। স্বপ্না নিজেও শারীরিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ নন। তাঁর পায়ের দু’ পাতায় ছ’টি করে আঙুল, ফলে ইভেন্টে পারফর্ম করার সময় প্রায়ই অসহ্য যন্ত্রণার শিকার হন তিনি। তা ছাড়া পিঠে পুরোনো একটা চোটের কারণে প্রতি মাসে মুম্বইয়ে গিয়ে একটা ইনজেকশন নিতে হয় তাঁকে। হেপ্টাথলন ইভেন্টের দু’দিন আগে থেকে অসম্ভব দাঁতের যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছিলেন স্বপ্না। কিন্তু কোনও প্রতিবন্ধকতাই থামিয়ে দিতে পারেনি তাঁর অনমনীয় জেদ আর নাছোড় পরিশ্রমকে। হাই জাম্প আর জ্যাভেলিন থ্রো, এই দুটি ইভেন্টে যথাক্রমে ১০০৩ পয়েন্ট আর ৮৭২ পয়েন্ট স্কোর করে জিতে যান স্বপ্না, দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন শট পাট (৭০৭ পয়েন্ট) আর লং জাম্পে (৮৬৫ পয়েন্ট)।

মানসী যোসী:-
দুর্ঘটনায় পা হারিয়েছিলেন। স্বপ্নটাকে হারিয়ে যেতে দেননি। অসম্ভব পরিশ্রম আর অধ্যবসায়কে সম্বল করে আজ বিজয়ী মানসী যোশি। বিডব্লুএফ প্যারা ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা ছিনিয়ে আনলেন ৩০ বছরের এই মেয়ে। হারালেন তিনবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন পারুল পারমারকে।
এই জেদটাই বরাবর জিতিয়েছে মানসীকে। ২০১১ সালে পথ দুর্ঘটনায় পা হারিয়েছিলেন। ট্রাক এসে ধাক্কা মারে। গুরুতর জখম হয় পা। হাত, মুখে হাড় ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যায়। স্থানীয় হাসপাতালে পৌঁছতে ১০ ঘণ্টা লেগে যায়। তার পর ১২ ঘণ্টা ধরে চলে অস্ত্রোপচার। গ্যাঙ্গরিন হচ্ছিল। থামাতে চিকিৎসকরা মানসীর পা কেটে বাদ দেন।

মানসী পুল্লেলা গোপীচাঁদের অ্যাকাডেমির ছাত্রী মানসী। তিনি পেশায় ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ার। ব্যাডমিন্টনও খেলতেন ছোটবেলা থেকেই। ২০১১ সালে অফিসে যাওয়ার সময়ে ভয়ঙ্কর পথ-দুর্ঘটনায় বাঁ পা বাদ দিতে হয় তাঁর। কিন্তু অদম্য মনের জোরে খেলা থামাননি। বেছে নেন প্যারা-ব্যাডমিন্টন। তাতেই জয় করেেন অসম্ভবকে। এবার বিশ্বের মঞ্চেও ছিনিয়ে নিলেন সেরার মুকুট। এখন মানসীর স্বপ্ন, ২০২০ সালের টোকিও প্যারালম্পিক্সে জয়ী হওয়া।

ঐশ্বর্য পিসাই–
গত দু’বছর রেস চলাকালীনই দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন ঐশ্বর্য। ২০১৭ সালে কলার বোন ভেঙে যায় তাঁর। ২০১৮ সালে প্রথম ভারতীয় মহিলা বাইকার হিসেবে দুর্গম বাজা অ্যারাগন র‌্যালিতে অংশগ্রহণ করেন তিনি। সেই র‌্যালিতেই বাইক দুর্ঘটনায় প্যানক্রিয়াস ফেটে যায় তাঁর। এরপরও স্পোর্টসের জগতে আবার ফিরে আসাটাই ছিল বিশাল চ্যালেঞ্জ। শুধু ফিরে আসাই নয়, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে ঐশ্বর্য এখন সারা দেশের গর্ব।

প্রথম ভারতীয় হিসেবে মোটরস্পোর্টসে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে ইতিহাস তৈরি করলেন বেঙ্গালুরুর বাইকার কন্যা ঐশ্বর্য পিসাই। সম্প্রতি হাঙ্গেরিতে এফআইএম বিশ্বকাপে মেয়েদের বিভাগে সোনা জিতেছেন তিনি |

প্রথম ভারতীয় হিসেবে মোটরস্পোর্টসে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে ইতিহাস তৈরি করলেন বেঙ্গালুরুর ২৩ বছর বয়সি বাইকার ঐশ্বর্য পিসাই। সম্প্রতি হাঙ্গেরিতে এফআইএম বিশ্বকাপে মেয়েদের বিভাগে সোনা জিতেছেন তিনি। হাঙ্গেরিতে ফাইনাল রাউন্ড হওয়ার আগে আরও বেশ কয়েকটা ধাপ পেরতে হয়েছিল ঐশ্বর্যদের। দুবাইতে হওয়া প্রথম রাউন্ডে জেতেন তিনি। এরপর পর্তুগালে তৃতীয়, স্পেনে পঞ্চম ও হাঙ্গেরিতে চতুর্থ হওয়ার পর সব মিলিয়ে মেয়েদের বিভাগে ঐশ্বর্যর স্কোরই হয় সবচেয়ে বেশি।