হিজরী সনের সূচনা ও মুহাররমের ফযীলত

হিজরী সনের সূচনা ও মুহাররমের ফযীলত

কলমে: মাওঃ মোহাঃ জাসিমুদ্দিন সেখ জাফারী

হিজরী সন বা বছর (আরবি: سنة هجرية‎‎) বা যুগ (التقويم الهجري আত তাকবিম আল-হিজরি) হল ইসলামী চন্দ্র পঞ্জিকায় ব্যবহৃত যুগ, যার গণনা ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে শুরু হয় যা ইসলামী নববর্ষ ।

দ্বিতীয় খলীফা ওমর (রা.)-এর সময়কালে বসরার গভর্ণর আবূ মূসা আল আশ‘আরী (রা.) খলিফা ওমর (রা.)-এর কাছে এক পত্রে লেখেন, “হে আমীরুল মু’মিনীন, আমাদের কাছে বহু পত্র আসে, যাতে তারিখ লেখা থাকে শা‘বান। কিন্তু তা কি বর্তমান বছরের নাকি অতীতের আমরা তা বুঝতে পারি না। তারপর ওমর (রা.) সমস্যা সমাধানের উদ্দ্যোগ গ্রহণ করেন।

আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, যখন ওমর (রা.) হিজরি সন প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তখন তিনি পরামর্শ সভার আহবান করেন। সভায় সা‘দ ইবন আবী ওয়াক্কাস (রা.) প্রিয়নবী (সা.)-এর ইন্তেকালের বছর, হযরত তালহা (রা.) নবুওয়াতের বছর, হযরত আলী (রা.) হিজরতের বছর থেকে বর্ষ গণনার প্রস্তাব দেন। অতঃপর সভার সকলে হযরত আলী (রা.)-এর প্রস্তাবে ঐক্যমত পোষণ করেন। সংগত কারণেই তখন থেকে হিজরতের বছর হিসেবে হিজরি বর্ষ গণনা শুরু হয়।

হিজরি বর্ষের পূর্ণতা লাভ প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সময়েও বিক্ষিপ্তভাবে হিজরি বর্ষ গণনা হতো। বিদায় হজের ভাষণে প্রিয়নবি হিজরি সনের কথা ও সম্মানিত ৪ মাসের উল্লেখ করেন। আর হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফতের সময় তা সুনির্দিষ্ট রূপে প্রকাশিত ও বাস্তবায়িত হয়।

সে সময় রাষ্ট্রীয় কাজে সন তারিখ ব্যবহার না করায় রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রশাসনিক জটিলতা দেখা দেয়। এ সমস্যা সমাধানকল্পে ১৭ হিজরির ১০ জমাদিউল আউয়াল হজরত আবু মুসা আশয়ারি খলিফাতুল মুসলিমিন হজরত ওমরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

তখণ হজরত ওমর সাহাবায়ে কেরামদের মজলিসে শুরায় সবার পরামর্শক্রমে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতকে ভিত্তি করে হিজরি সন গণনার সিদ্ধান্ত নেন।

সেই সম্মেলনের স্লোগান ছিল-‘হিজরতের ঘটনা মিথ্যা থেকে সত্যের পার্থক্য করেছে, মক্কার অবিশ্বাসীদের ওপর ইসলামের বিজয় এসেছে।’

পৃথিবীর ইতিহাসে মুসলমানদের উন্নতি, অগ্রগতি, বিজয় ও সাফল্যের প্রতীক ও শ্রেষ্ঠ তাওহিদী বিপ্লব ছিল প্রিয়নবির ‘হিজরত’। যেহেতু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয় জন্মভূমি ত্যাগ করা ছিল ইসলামের ইতিহাসে একটি মহান ঘটনা। সে কারণেই হিজরতের এ মহাঘটনাকে কেন্দ্র করেই হিজরি সন গণনা শুরু হয়।

সর্বোপরি নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মক্কা থেকে মদিনা হিজরতের বছর থেকে হিজরি সাল গণনা শুরু হয়। তাঁর এই জন্মভূমি ত্যাগ করার ঘটনাকে ইসলামে ‘হিজরত ‘ আখ্যা দেয়া হয়। রাসুল মুহাম্মদ (সা:)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ঘটনাকে চিরস্মরণীয় করে রাখার উদ্দেশ্যেই হিজরী সাল গণনার সূচনা।

মুহাররমের ফযীলত

পবিত্র কুরআনে ও হাদীস শরীফে এ মাস সম্পর্কে যা এসেছে তা হল, এটা অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ সময়। কুরআনের ভাষায় ‘আরবাআতুন হুরুম’-অর্থাৎ চার সম্মানিত মাসের অন্যতম এই মাস।

এ মাসে রোযা রাখার প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত এক হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘রমযানের পর আল্লাহর মাস মুহাররমের রোযা হল সর্বশ্রেষ্ঠ।’-সহীহ মুসলিম ২/৩৬৮; জামে তিরমিযী ১/১৫৭

এর মধ্যে আশুরার রোযার ফযীলত আরও বেশি।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রমযান ও আশুরায় যেরূপ গুরুত্বের সঙ্গে রোযা রাখতে দেখেছি অন্য সময় তা দেখিনি।’-সহীহ বুখারী ১/২১৮

হযরত আলী রা.কে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেছিল, রমযানের পর আর কোন মাস আছে, যাতে আপনি আমাকে রোযা রাখার আদেশ করেন? তিনি বললেন, এই প্রশ্ন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট জনৈক সাহাবী করেছিলেন, তখন আমি তাঁর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘রমযানের পর যদি তুমি রোযা রাখতে চাও, তবে মুহররম মাসে রাখ। কারণ, এটি আল্লাহর মাস। এ মাসে এমন একটি দিন আছে, যে দিনে আল্লাহ তাআলা একটি জাতির তওবা কবুল করেছেন এবং ভবিষ্যতেও অন্যান্য জাতির তওবা কবুল করবেন।’-জামে তিরমিযী ১/১৫৭

অন্য হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমি আশাবাদী যে, আশুরার রোযার কারণে আল্লাহ তাআলা অতীতের এক বছরের (সগীরা) গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন।’ -সহীহ মুসলিম ১/৩৬৭; জামে তিরমিযী ১/১৫৮

আশুরার রোযা সম্পর্কে এক হাদীসে এসেছে যে, ‘তোমরা আশুরার রোযা রাখ এবং ইহুদীদের সাদৃশ্য পরিত্যাগ করে আশুরার আগে বা পরে আরো একদিন রোযা রাখ।’-মুসনাদে আহমদ ১/২৪১

হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যদি আমি আগামী বছর বেঁচে থাকি তাহলে ৯ তারিখেও অবশ্যই রোযা রাখব।’-সহীহ মুসলিম ১/৩৫৯

মহররম ও আশুরাকেন্দ্রিক নানা কুসংস্কার

এ মাসে পৃথিবীর বহু ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এদিনে আল্লাহ তাআলা তাঁর কুদরত প্রকাশ করেছেন। বনি ইসরাইলের জন্য সমুদ্রে রাস্তা বের করে দিয়েছেন এবং তাদেরকে নিরাপদে পার করে দিয়েছেন। আর একই রাস্তা দিয়ে ফেরাউন ও তার অনুসারীদেরকে ডুবিয়ে মেরেছেন।-সহীহ বুখারী ১/৪৮১

এ মাসের একটি ঘটনা শাহাদাতে হুসাইন রা.। বলাবাহুল্য যে, উম্মতের জন্য এই শোক সহজ নয়। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এরই তো শিক্ষা-‘নিশ্চয়ই চোখ অশ্রুসজল হয়, হৃদয়ব্যথিত হয়, তবে আমরা মুখে এমন কিছু উচ্চারণ করি না যা আমাদের রবের কাছে অপছন্দনীয়।’

অন্য হাদীসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই যারা মুখ চাপরায়, কাপড় ছিড়ে এবং জাহেলী যুগের কথাবার্তা বলে।’

অতএব শাহাদাতে হুসাইন রা.কে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অনৈসলামিক কর্মকান্ডে লিপ্ত না হওয়া এবং সব ধরনের জাহেলী রসম-রেওয়াজ থেকে দূরে থাকা প্রত্যেক মুসলিমের অবশ্য কর্তব্য।

এ মাসে যেসব অনৈসলামিক কাজকর্ম ঘটতে দেখা যায় তার মধ্যে তাজিয়া, শোকগাঁথা পাঠ, শোক পালন, মিছিল ও র‌্যালি বের করা, শোক প্রকাশার্থে শরীরকে রক্তাক্ত করা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। এসব রসম-রেওয়াজের কারণে এ মাসটিকেই অশুভ মাস মনে করার একটা প্রবণতা অনেক মুসলমানের মধ্যেও লক্ষ করা যায়। এজন্য অনেকে এ মাসে বিয়ে-শাদী থেকেও বিরত থাকে। বলাবাহুল্য এগুলো অনৈসলামিক ধারণা ও কুসংস্কার।

মোটকথা, এ মাসের করণীয় বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে, তওবা-ইস্তেগফার, নফল রোযা এবং অন্যান্য নেক আমল। এসব বিষয়ে যত্নবান হওয়া এবং সব ধরনের কুসংস্কার ও গর্হিত রসম-রেওয়াজ থেকে বেঁচে কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক চলাই মুসলমানের একান্ত কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাওফীক দান করুন।