স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁসির রানীর নাম ইতিহাসে থাকলেও হারিয়ে গেছেন “বেগম হযরত মহল”

স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁসির রানীর নাম ইতিহাসে থাকলেও হারিয়ে গেছেন “বেগম হযরত মহল”

বঙ্গ রিপোর্ট ডিজিটাল ডেস্ক: হয়তো মুসলমান বলেই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এই অসীম সাহসী মহিয়সী রমনীর কর্ম ও বর্ণাঢ্য জীবনের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। তেমন বইপুস্তক, তথ্যও নেই। উইলিয়াম ডেলরী স্পেল রচিত “দি লাষ্ট মুঘল’ স” এবং জনাব আনোয়ার হোসেন মঞ্জু রচিত “সিপাহী বিদ্রোহের ভুলে যাওয়া কাহিনী এবং একটি ঐতিহাসিক অবিচার” গ্রন্থে কিঞ্চিত তথ্য পাওয়া যায় মাত্র।

উত্তর প্রদেশ সরকার ১৮৫৭ সালের আন্দোলনের শতবর্ষ উদযাপনের সময় বেগমের সহযোদ্ধা নানা রাও, তাঁতিয়া টোপি ও রানি লক্ষ্মী বাইকে সম্মানিত করলেও এমনকি স্বাধীনতা যোদ্ধা হিসেবে হজরত মহলের নাম পর্যন্ত অন্তর্ভূক্ত করেনি। হয়তো মুসলমান বলেই তার অধীনস্থ যোদ্ধাদের সম্মানিত করা হলেও তিনি উপেক্ষিত হয়েছেন।

স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদানঃ
************************
“বেগম হযরত মহল” আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হলেও সমর বিদ্যায় পারদর্শিনী ছিলেন।
হযরত মহল হাতির পিঠে সওয়ার হয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করতেন।যুদ্ধক্ষেত্রে স্ব-শরীরে উপস্থিত হয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্বয়ং সরজমিনে পরিদর্শন করতেন।

১৮৫৭ সালের ৩০শে জুন অযোধ্যা বাসীর একটি স্মরণীয় দিন।
ভারতের বীর সিপাহীরা “চিনহাট” যুদ্ধে হটিয়ে দিল ইংরেজ বাহিনীকে।
কমিশানর স্যার হেনরীর বিপর্যস্ত বৃটিশ বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হলেন। সমগ্র অযোধ্যা থেকে বৃটিশদের কর্তৃত্ব অবসান হল।

প্রায় ১ বৎসর ব্যাপী স্বাধীনভাবে পুত্র নবাব বিরজিস কাদারের নামে অযোধ্যা শাসন করেন বেগম হযরত মহল। অযোধ্যার এই স্বাধীনতা সংগ্রামীর ক্রমাগত শক্তিবৃদ্ধিতে শংকিত হয়ে উঠে কোম্পানী কর্তৃপক্ষ। ইংরেজ বাহিনী শক্তি সঞ্চয় করে লক্ষ্মৌ আক্রমন করে।

হযরত মহল ইংরজদের কাছে আত্মসমর্পন না করে অধিকতর শক্তি সঞ্চয়ের জন্য গৌরবজনক পশ্চাদপসারন করেন। খাগড়ানদী পাড়ি দিয়ে তিনি বাহরাইচ জেলার “বাউন্দি” দুর্গে আশ্রয় গ্রহন করেন।

১৮৫৮ সাল জুড়ে হযরত মহল তাঁর বিশাল বাহিনী নিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখেন। সমগ্র সিপাহী বিদ্রোহে কোম্পানী বাহিনীকে সবচাইতে বেশী বেগ পেতে হয়েছে হযরত মহলকে পরাজিত করতে।

ভারতের বীর নারী মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী হযরত মহলের শৌর্য্য, শক্তি, সাহস ও বীরত্ব গাঁথার কাহিনী অবশেষে ইংল্যান্ডের মহারানী ভিক্টোরিয়ার দরবারে পর্যন্ত পৌঁছায়। মহারানী ভিক্টোরিয়া তাকে ক্ষমা প্রদর্শন ও পেনশন মঞ্জুেেরর প্রস্তাব পাঠালে ভারতনেত্রী হযরত মহল ঘৃণাভারে সে প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন।

কিন্তু শেষ রক্ষা হল না, অযোধ্যার স্বাধীনতা সংগ্রামী হযরত মহলের। ইংরেজরা অধিকতর শক্তি সঞ্চয় করে কিছু দেশীয় বেঈমানের সহযোগিতায় বাউন্দি দূর্গ আক্রমন করে।

নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ তখন কলকাতার ফোর্ট উইলিয়মে বন্দি। বেশ কিছু কাল অতিবাহিত হওয়ার পর হজরত মহল এবং তাঁর সঙ্গীদের রসদ ফুরিয়ে এল। লখনউ শহরের তিন দিকে তখন ব্রিটিশ ফৌজ।

কোম্পানির সৈন্যসংখ্যা ৫৭ হাজার, বিদ্রোহীরা সংখ্যায় ৩৬ হাজার।

বেগম কোঠির ভয়াবহ যুদ্ধে দুর্গের পতন হল। কোম্পানীর বিজয় হল। কিন্তু আত্মসমর্পন করেন নি বেগম হযরত মহল। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কোন অবস্থাতেই ইংরেজদের কাছে আত্মসমর্পন করবেন না, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দেশের জন্য ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবেন।

“কথিত আছে ইংরেজরা যুদ্ধের ভয়াবহতায় দিশেহারা হয়ে হযরত মহলের হাতিকে হামলা করে। ভীতসন্ত্রস্ত হাতি পলায়ন করলে সৈন্যরা রাণী পলায়ন করেছে ভেবে হতোদ্যম হয়ে পড়ে।”

হুলিয়া জারি করা হল, বেগম ও তাঁর পুত্র যদি আত্মসমর্পণ করেন তবে তাঁদের সঙ্গে সম্মানজনক সন্ধি স্থাপন করা হবে।

তিনি আত্মসমর্পণ না করে ১৮৫৮ সালের ডিসেম্বর মাসে কিছু বিশ্বস্থ সৈন্য নিয়ে অধিক সৈন্য সংগ্রহের আশায় বাউন্দি দুর্গ ত্যাগ করে হিমালয়ের গভীর জংগলে প্রবেশ করেন। এর বৎসর খানেক পরে তিনি ১৮৫৯ সালের শেষভাগে নেপালে প্রবেশ করেন।কিন্তু ইতিমধ্যে ইংরেজরা বিদ্রোহী সেনাদের কঠোর হস্তে দমন করে তাঁর নতুন সেনাদল গঠনের প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করে দেয়।

১৮৭৪ সালের দিকে ঐহিত্যবাহী অযোধ্যার স্বাধীনতা সংগ্রামের আপোষহীন মহানায়িকা, পল্লীবালা, বেগম হযরত মহল এই মায়াময় পৃথিবী থেকে চীর বিদায় নেন। মৃত্যুকালে তাঁর পাশে তার প্রিয় পুত্র নবাব বিরাজস কাদার ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। অনাদরে আর অবহেলায় তিনি তার প্রতিষ্ঠিত মসজিদের পাশেই সমাহিত হলেন চিরনিদ্রায়!

অযোধ্যার মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী হযরত মহলের কবর কোথায় আমাদের জানা নেই। তাঁর কবরে কেউ পুষ্পস্তবক দেয় কিনা, রুহের মাগফেরাত কামনা করেন কি না, কেউ কবর জিয়ারত করেন কি না তাও আমাদের জানা নেই।

আজ সেই মহান বীর নারীর মৃত্যুর প্রায় ১৪৬ বছর পর তাঁর স্বাধীনতা সংগ্রামীর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।