স্বাধীনতা, সমতা ও মৈত্রীর ফেরিওয়ালা!

স্বাধীনতা, সমতা ও মৈত্রীর ফেরিওয়ালা!

অধ্যাপক ডঃ নুরুল ইসলাম

ঊনবিংশ-বিংশ শতাব্দীর সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ কবি রুদিয়াদ কিপলিং (১৮৬৫-১৯৩৬) তার কুখ্যাত ‘হোয়াইট ম্যানস বার্ডেন’ কবিতায় বলেছিলেন, অসভ্য জাতিগুলোকে সুসভ্য করা শ্বেতাঙ্গদের বোঝা
(White Man’s burden)। খ্রীষ্টান শ্বেতাঙ্গ দস্যু ও মানুষ খেকো সাম্রাজ্রবাদীদের গুরু কিপলিং অশ্বেতাঙ্গদের প্রতি কি ধরনের ঘৃণা পোষণ করতেন, তা কবিতাটির পরতে পরতে স্পষ্ট। অহম বোধের চরম পরাকাষ্ঠা এই কবিতা। এই কবিতা আধিপত্যবাদী শ্বেতাঙ্গ-খ্রীষ্টানদের বদ্ধ ধারণার বহিঃপ্রকাশ।

সত্য বলতে কি, মানব সভ্যতার লিখিত ইতিহাসের আনুমানিক আশি শতাংশ অধ্যায় সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতনের ইতিকথা নিয়ে। বিজয়ীরা তাদের ধ্বংসলীলা ও বর্বতাকেও মহান সৃষ্টি ও সভ্যতার প্রতি ইতিবাচক অবদান বলে প্রমাণ করেছে।

এই মুহূর্তে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শক্তিশালী জাতি ও জনগোষ্ঠী খ্রীষ্টান শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীরা। তারা গত পাঁচ শতাব্দী কাল ধরে পৃথিবীর কত জনপদ ও জনগোষ্ঠী ধ্বংস করেছে তার ফিরিস্তি ক’জন রেখেছে! তাদের সৃজনশীলতার প্রশংসা করে তাদের অনুগত বসংবদরা ও ভাড়াটিয়া লেখকরা লক্ষ লক্ষ গ্রন্থ প্রণয়ন করেছে! কিন্তু তাদের বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের ইতিকথা সংরক্ষণ করতে ক’জন সচেষ্ট হয়েছে!

গত পাঁচ শো বছরে তারা কত কোটি মানুষ হত্যা করেছে ও কত জনপদ ধ্বংস করেছে তার সঠিক পরিসংখ্যান দেওয়া সম্ভব না হলেও বিশ্বাসযোগ্য একটি চিত্র উপস্থাপন করা অসম্ভব নয়।

এই দস্যুরা শুধুমাত্র অর্থ উপার্জনের জন্য বিধ্বংসী মারণাস্ত্র সৃষ্টি করেছে। আর তা যথেচ্ছ ব্যবহার করে একের পর এক দেশ দখল করেছে। আর সেখানকার অধিবাসীদের হয় অপমানিত দাস করেছে অথবা সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছে। কে না জানে? আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মূলনিবাসীদের ইউরোপীয় শ্বেতাঙ্গরা সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছে। আফ্রিকার কোটি কোটি মানুষকে তারা দাস বানিয়ে মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য করেছে। এশিয়া মহাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তারা সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। তাদের পরিকল্পিত দস্যুবৃত্তির শিকার হয়ে ভারতের লক্ষ লক্ষ মানুষ না খেতে পেয়ে মারা গেছে। তাদের স্বৈরশাসনের বিরোধিতার অপরাধে তারা কি নির্মমভাবে প্রকাশ্য রাজপথে তাদের ফাঁসি দিয়ে অথবা কামান দেগে হত্যা করেছে! ১৮৫৭ সালে রাজধানী দিল্লি শহরকে তারা শশ্বানে পরিণত করেছিল। কত মানুষ নিহত হয়েছিল তার পরিসংখ্যান রাখার প্রয়োজন বোধ করেনি সভ্যতার ঠিকাদাররা। বস্তুত ঔপনিবেশিক শাসন কালে খ্রীষ্টান শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীরা বিশ্বব্যাপী এক ভয়াবহ সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল।

এক সময় তাদের সৃষ্ট মারণাস্ত্র দিয়ে মূলনিবাসী মানুষ কথিত উপনিবেশ থেকে তাদের বিতাড়িত করে।

এখন আবার ঔপনিবেশিক উত্তর কালে ঐ একই আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো পূর্বের ন্যায় দেশে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি ও যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্র নিক্ষেপ করে দূর্বল দেশ ও জনগোষ্ঠীগুলোকে সন্ত্রস্ত করে রেখেছে। যেহেতু তারা আজও আধিপত্যবাদী ও বিজয়ী, অতএব, আখ্যান তারা নির্মাণ করছে। নিপীড়িত ও নিহতদের বিলাপগাথা ও শোকগাথা রচনা করে ভাড়াটিয়া লেখকদের কি লাভ! বরং বিজয়ী আধিপত্যবাদের সঙ্গে থাকলে বখরা পাওয়া যাবে! তাই ভাড়াটিয়া গণমাধ্যম ও বিদ্বজ্জনরা শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীদের পক্ষে থেকে আখ্যান নির্মাণ করে চলেছে।

মধ্য যুগের ইতিহাস পড়তে পড়তে মনে হতো, পশু শক্তি ছিল নিয়ামক শক্তি। আধুনিক যুগে আর কখনো পশু শক্তির ব্যবহার হবে না। কিন্তু যারা মধ্য যুগের বর্বতার সকাল সন্ধ্যা নিন্দা করেন, তারা কি ভেবে দেখেছেন ইউরোপে রেঁনেসা ও ফরাসি বিপ্লবের পর আলোকিত ও আধুনিক ইউরোপীয় খ্রীষ্টান শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীরা দেশে দেশে কত মানুষ হত্যা করেছে! লুট তরাজ করেছে!

তাদের দ্বিচারিতা ও কপটতার কিছু দৃষ্টান্ত না দিলে আমার উত্থাপিত বিতর্ক অস্পষ্ট থেকে যাবে। কোনো হত্যাযজ্ঞকে যথার্থ প্রমাণ করতে চাইনা। প্রতিটি হত্যাকান্ড সমান অপরাধ। হত্যাকান্ড কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান অথবা সরকারি এজেন্সি যেই করুক না কেন, তাতে অপরাধের মাত্রা কম বা বেশি হয় না। বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রে সন্ত্রাসী আক্রমণের কুচক্রীদের চিহ্নিত না করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তিন হাজার মানুষের মৃতুর বদলা নিতে গিয়ে কম করে পনের লক্ষ মানুষ হত্যা করেছে। বিয়ে বাড়িতে উৎসব রত ও জানাজার সারিবদ্ধ নামাজিদের উপর তারা ক্ষেপনাস্ত্র নিক্ষেপ করে যে ধ্বংস তান্ডব চালিয়েছে তার জন্য কি পাশ্চাত্য সভ্যতাকে দায়ী করা হচ্ছে? রাফায়েল বিমানে চড়ে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ার ঘুমন্ত গ্রামের উপর ক্ষেপনাস্ত্র নিক্ষেপের থেকে ভয়াবহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কি হতে পারে? সেজন্য কেন ফরাসি জাতির জঙ্গিপনার নিন্দা করা হয়না? জঙ্গি শুধু মুসলিম হয়! সুদানে ও ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব তিমুরের গুটি কয়েক খ্রীষ্টান বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকারীরা শান্তিকামী! আর মুসলিমরা স্বরাজ ও স্বায়ত্ব শাসন দাবি করলে বিচ্ছিন্নতাবাদী!

সম্প্রতি হজরত মুহাম্মদের স ব্যাঙ্গ চিত্র নিয়ে সংঘটিত ঘটনায় ফ্রান্সে এক শিক্ষকের শিরোচ্ছেদ করা হয়। এই হত্যাকান্ড নিয়ে যেন বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে! অথচ তার বদলা নিতে গিয়ে কথিত অপরাধীর বিচার না করে রাজ পথে পুলিশ তাকে গুলি করে হত্যা করেছে। এক শ্বেতাঙ্গ আততায়ী দুজন নিরীহ মুসলিম মহিলার উপর অতর্কিত ছুরি মেরে প্রায় অর্ধ মৃত অবস্থায় পথে ফেলে গেছে। অসংখ্য নিরীহ মুসলিম পুরুষ ও মহিলাদের নির্বিচারে পুলিশ গ্রেপ্তার ও শারীরিক নির্যাতন করছে। ষাট সত্তর লক্ষ মানুষের জীবনকে তারা দূর্বিসহ করে তুলেছে! এগুলো খবর নয়! বিশ্ব আলোড়ন সৃষ্টিকারী খবর, একজন শ্বেতাঙ্গের মাথা কাটা হয়েছে! তথাকথিত উদারপন্থী ও মুক্তমনাদের দ্বিচারিতা যত সংঘাত ও সংঘর্ষের কারণ। আরে ও মুক্তমনা বিহঙ্গ, হলোকাস্টের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দ্যাখনা! তাদের ঢ্যামনামি উন্মোচিত হবে! এদেশের আত্মপরিচয়হীন একটি শ্রেণি ফরাসিদের পক্ষে তাল ঠুকছে! আরে ও ভাই, বিশ্বনন্দিত ফিদা হোসেনকে কেন তোরা দেশ ছাড়া করেছিলিস?