আগ্রাসী সাম্প্রদায়িক শক্তিকে প্রতিহত ও নিরাপত্তা পেতেই মুসলিমদের রাজনৈতিক ভাবনা

সহমত অসহমত হতে: অধ্যাপক ডঃ নুরুল ইসলাম

শিরোনামটি বেমানান লাগছে? ইংরেজিতে একটি বহুল প্রচলিত বাকধারা আছে। We agree to disagree. এই বাক্যের ভাষান্তর ‘সহমত অসহমত হতে।’ প্রসঙ্গ প্রবাহমান রাজনৈতিক বিতর্ক। এত কাল আমাদের আধুনিক শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীরা বলত একাধিক মৌলভী ও মাওলানা কোনো একটি বিষয়ে এক মত হতে পারে না। এখন দেখছি, মহাবিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অধ্যাপিকা, উচ্চ পদস্থ সরকারি আধিকারিক, লেখক ও গবেষক এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কোনো একটি বিষয়ে একমত হতে পারছেন না।

আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে জোরদার বিতর্ক চলছে। বিতর্ক তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে। এই নির্বাচনে তারা কোন রাজনৈতিক দল বা দলগুলোকে সমর্থন দিবে। সত্য বলতে কি, ইতোপূর্বে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি রাজনৈতিক পালা বদলে তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল নির্ণায়ক।

স্বাধীনতার পর প্রতিটি নির্বাচনে মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে জ্বলন্ত বিষয় ছিল নিরাপত্তা। আগ্রাসী সাম্প্রদায়িক শক্তিকে প্রতিহত করা। এজন্য তারা দীর্ঘদিন জাতীয় কংগ্রেসকে সমর্থন দিয়েছে। তারা যখন দাঙ্গার পর দাঙ্গা করিয়ে মুসলিমদের উৎখাত করেছে, তখন তারা কংগ্রেস ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের সেই সিদ্ধান্তের ফলে কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়।
মুসলিম সম্প্রদায় নিরবিচ্ছিন্ন তিন দশকের অধিক কাল সমর্থন করে বামপন্থী দলগুলোকে। বিশেষ করে সিপিএমকে। জ্বলন্ত বিষয় ছিল নিরাপত্তা। আগ্রাসী সাম্প্রদায়িক শক্তিকে প্রতিহত করা। নিরাপত্তার প্রশ্নে তারা সামান্য সফল হলেও মুসলিম সম্প্রদায়ের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ভেঙে পড়ে তাদের শাসন কালে। যা উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বহিঃপ্রকাশ। তাদের প্রতি মুসলিম সম্প্রদায় বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। তারা আনুগত্য বদলের সিদ্ধান্ত নিলে, বাম শাসনের অবসান ঘটে।
তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি সমর্থন দেওয়ার পূর্ব শর্ত ছিল নিরাপত্তা ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন। গত দশ বছরে নির্দিষ্ট লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে সে নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক চলছে। বিশাল সংখ্যক মুসলিম এখন তৃণমূলের প্রতি অসন্তুষ্ট। অভিযোগ, তাদের শাসন কালে নিরাপত্তা ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ব্যাহত হয়েছে।

বড় পরিতাপের বিষয়, স্বাধীনতার পর মুসলিম সম্প্রদায় কখনো কোনো মূলস্রোতের রাজনৈতিক দলকে অসাম্প্রদায়িক ও মুসলিমবন্ধু পায়নি। প্রত্যেকে তাদের বিরুদ্ধে কমবেশি বৈষম্য করেছে। সাম্প্রদায়িকতায় উস্কানি দিয়েছে। অথচ প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দল উল্টে মুসলিম তোষণের গল্প ও উপাখ্যান সৃষ্টি করে মুসলিম বিরোধী বৈষম্যকে ইস্যু হতে দেয়নি। বরং মুসলিম বৈষম্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থেকেছে।
আসন্ন নির্বাচন ২০২১ হতে যাচ্ছে নিরাপত্তা ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে। আগ্রাসী সাম্প্রদায়িক শক্তিকে প্রতিহত করতে মুসলিম সম্প্রদায় কোন দলকে সমর্থন করবে সে বিষয়ে জোর বিতর্ক চলছে। কিভাবে তারা আর এস এস-বিজেপিকে প্রতিহত করবে? তারা বাম-কংগ্রেস বা তৃণমূল কংগ্রেসের মতো নরম হিন্দুত্ববাদীদের সমর্থন করবে না মিমের মতো মুসলিম সম্প্রদায়ের নিজের রাজনৈতিক দল গুলোকে সমর্থন করবে?

বেশ কিছুদিন ধরে মুসলিমদের মধ্যে এনিয়ে জোর বিতর্ক চলছে। তারা শুধু দ্বিধা বিভক্ত নয়। বহুধা বিভক্ত। সত্য বলতে কি, মুসলিম সম্প্রদায়ের সামনে এখন খুব বেশি অপশন নেই। তৃণমূল কংগ্রেসেক সমর্থন করে যেমন অভিষ্ট অর্জন সম্ভব নয়। ঠিক তেমন মিমের ক্ষুদ্র দলগুলোকে সমর্থন করে আর এস এস-বিজেপিকে প্রতিহত করা সম্ভব নয়। আবার বাম-কংগ্রেসকে সমর্থন দিয়ে আর এস এস-বিজেপিকে প্রতিহত করা সম্ভব কিনা তাতেও যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে।
এরকম এক প্রেক্ষাপটে সার্বিক পরিস্থিতি বিচার বিশ্লেষণ করে তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আবেগ ও ক্ষোভ সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা। তাদের বাস্তববাদী হতে হবে। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, যে কোনো দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য তা ক্ষতিকারক হয়। জোট সরকার তুলনামূলকভাবে তাদের জন্য কম ক্ষতিকারক। অতএব, নিম্ন প্রদত্ত অপশন গুলো ভেবে দেখতে পারেন।
১. মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষ মুসলিম দল গঠন করতে হবে।
২. ঐক্যবদ্ধ মুসলিম সম্প্রদায় সিদ্ধান্ত নিবে নিজেদের পকেট এরিয়া গুলোতে মিমের মতো ক্ষুদ্র মুসলিম দলগুলোকে সমর্থন করবে। আর অন্যত্র তুলনামূলকভাবে কম সাম্প্রদায়িক দলগুলোকে সমর্থন করবে। কোনো দল অসাম্প্রদায়িক নয়। ধর্মনিরপেক্ষ নয়।
৩. তৃণমূলকে চুক্তির ভিত্তিতে সমর্থন করতে হবে।
৪. মূলস্রোতের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংযুক্ত না থাকলে সাম্প্রদায়িক বিভাজন মারাত্মক আকার ধারণ করবে। অতএব, মূলস্রোতের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে থাকতে হবে।
৫. নিজেদের রাজনৈতিক দলগুলোকে শক্তিশালী করতে না পারলে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলগুলো চিরদিন তাদের ফুটবলের মতো নিয়ে খেলা করতে থাকবে।
এসব অপশন গুলো নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা ভাবনা করতে সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুরোধ করছি। দ্রুত পদক্ষেপ করুন। সঠিক সিদ্ধান্ত নিন।