জাতির এই ক্রান্তি লগ্নে যুব সমাজের দায়িত্ব ও কর্তব্য: মুহাম্মাদ নুরুদ্দীন

জাতির এই ক্রান্তি লগ্নে যুব সমাজের দায়িত্ব ও কর্তব্য: মুহাম্মাদ নুরুদ্দীন

যুব সমাজ জাতির সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ। যে সমাজের যুবকরা উদ্যমী সাহসী পরিশ্রমি সেই সমাজ পিছিয়ে থাকতে পারে না। যৌবন বয়স কোন বাধা মানে না। দুর্নিবার গতিতে তারা সামনে এগিয়ে যেতে চায়। তাই কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন:-
“আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ
স্পর্ধার নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি
আঠারো বছর বয়সেই অহরহ
দুঃসাহসেরা দেয় উঁকি।”

কিন্তু আজকের অত্যন্ত দুঃখ-বেদনা ও দুশ্চিন্তার বিষয় যে আমাদের সমাজে বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের যুবকরা বিপথগামী। অলসতা হতাশা এবং নীতিহীনতা তাদেরকে গ্রাস করে ফেলেছে। তারা নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর পরিবর্তে অন্যের কাছ থেকে পাওয়ার প্রত্যাশায় দিন গুনতে গুনতে সময়ের শেষ সীমায় এসে পৌঁছেছে। তারা তাদের নিজেদের দুর্ভাগ্যের কারণ সব সময় অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নিজেদেরকে নির্দোষ প্রমাণ করে। তাদের সামনে সব সময় ষড়যন্ত্রের তথ্য উপস্থাপন করা থাকে। তাদের দুর্দশার জন্য তারা কখনও নিজেদের দুর্বলতাকে দায়ী করে না। নিজেদের দায়িত্ব কর্তব্যের ব্যাপারে তাদের অলসতাকে তারা গুরুত্ব আরোপ করতে চায় না। বরং তারা সবসময় অন্যের ঘাড়ে নিজেদের দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে নিজেদেরকে দায়মুক্ত করতে চায়।

এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে কখনো কোন সমাজ উন্নতি লাভ করতে পারেনা। উন্নতি তো দূরের কথা এই অবস্থা দীর্ঘকাল ধরে চলতে থাকলে সে জাতির অস্তিত্ব রক্ষা করা দুর্বিষহ হয়ে পড়ে।
আজকের সংখ্যালঘু যুব সমাজ সেই ধরনের এক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। জাতি এক সাংঘাতিক ক্রান্তিলগ্নে এসে উপস্থিত হয়েছে। দুঃখ-দুর্দশা বেদনা হতাশা আর ব্যর্থতা যেন তাদের পিছু ছাড়ছে না।
এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশন এর মত একটি যুব সংগঠনের দায়িত্ব অনেক। শুধু প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি করে দাবীদাওয়া বিক্ষোভ মিছিল ও স্মারকলিপি দেয়ার কর্মসূচিতে জাতির পরিবর্তন আশা করলে ভুল হবে। অবশ্যই আমাদেরকে অবিচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে হবে। নিজেদের দাবিতে রাজপথ কাঁপিয়ে দিতে হবে। কিন্তু সেই সাথে সাথে জাতির আত্মগঠন এ যুবসমাজকে উপযুক্ত ভাবে গড়ে তোলার জন্য সাবলীল ও পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। এমন কর্মসূচি যুবকদের সামনে পেশ করতে হবে যাতে তারা হতাশা, অলসতা ঝেড়ে ফেলে মানসিক শক্তিতে বলবান হতে পারে। উইলিয়াম শেক্সপিয়ার বলেছিলেন, “অন্যের থেকে বেশী জানুন,
অন্যের থেকে বেশী কাজ করুন,
আর অন্যের থেকে কম আশা করুন।” আমাদের যুব সমাজকে আজ এই মন্ত্রে দীক্ষিত হতে হবে যোগ্যতার দিক থেকে নিজেদেরকে চূড়ান্ত শিখরে নিয়ে যেতে হবে। পরিশ্রমের দিক থেকে এগিয়ে যেতে হবে সবার থেকে বেশি। অন্যের কাছে বেশি বেশি প্রত্যাশা করার পরিবর্তে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করতে হবে । যুব সমাজকে উদ্যোগী হতে হবে, উদ্যমী হতে হবে। তাদের মনের জোর তৈরি করার জন্য যুব সংগঠনকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের মোটিভেশনের ক্লাস নিতে হবে। মনে রাখতে হবে
“যদি উড়তে না পারো দৌড়াও,
যদি দৌড়াতে না পার তবে হাঁট,
যদি হাঁটতে না পারো তবে হামাগুড়ি দাও”
থামলে চলবেনা।
মরমী কবি মতিউর রহমান লিখেছেন “কোন দিকে পথ নেই চারিদিকে বন্ধ দুয়ার
কোন দিকে আলো নেই চারিদিকে ঘিরেছে আঁধার,
তবুও চলতে হবে সামনে যেতেই হবে পথ নেই মুক্তি পাবার।”
এই মন্ত্রে আজকের যুব সমাজকে দীক্ষিত হতে হবে। বিপদাপদ ষড়যন্ত্র দেখে থমকে গেলে চলবেনা। নবী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীদের মত নৌকা ডুবিয়ে দিয়ে মরণপণ সংগ্রামের জন্য ময়দানে অবতীর্ণ হতে হবে। হতাশা আমাদের জীবনকে গ্রাস করেছে। আমরা ভাবতে ভাবতে দিনের পর দিন মাসের পর মাস বছরের পর বছর কাটিয়ে দিচ্ছি। আমরা আমাদের দুর্দশার জন্য আমাদের পূর্বপুরুষদের দায়ী করি। ইতিহাসকে আমাদের ললাট লিখন এর কারণ হিসেবে দায়ী করে থাকি। কিন্তু না এটা সমাধানের পথ নয় আইনস্টাইন বলতেন
Learn from yesterday, live for today, Hope for tomorrow, the important
Things is not to stop questioning.

তাই ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে আমাদেরকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় গ্রহণ করতে হবে।

আজকের যুব সমাজ সাংঘাতিকভাবে নীতিহীন হয়ে পড়ছে। হাতের মুঠোয় সেলফোন তাদের জীবনের মূল্যবান সময় ধ্বংস করে দিচ্ছে। এই সেলুলয়েড উপকরণ তাদের নৈতিক চরিত্রে দিচ্ছে কলঙ্কের কালি। ধূমপান, তেরেঙ্গা, গুটকা ইত্যাদি যুবসমাজের মস্তিষ্ককে গ্রাস করেছে। উন্নত চিন্তা ভাবনা, জাতির সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করা, মানবতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করা, এসব আজ কল্পনার বিষয়। যার ফলে দিনের পর দিন সমাজ নেমে যাচ্ছে গভীর খাদের দিকে। এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হবে নিজেদেরকে। এখনও সময় আছে। মনে রাখতে হবে তাদের উপর আঘাত আসছে মানেই বুঝতে হবে তাদের প্রাণ আছে। কায়েমী স্বার্থবাদী শক্তি তাদেরকে ভয় পায়। মৃতকে কেউ মরেনা। তাই ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি তাদের আছে।
দায়িত্ব নিয়ে সমাজকে রক্ষা করার কাজে আত্মনিয়োগ করতে হবে। তারুণ্যের কবি ফররুখ আহমেদ তাই আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন:
“আজকে তোমার পাল ওঠাতেই হবে ছেঁড়া পালে আজ জুড়তেই হবে তালি ভাঙ্গা মস্তুল দেখে দিক করতালি
তবুও জাহাজ আজ ছোটাতেই হবে।”

সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশনের রাজ্য সম্মলনের স্মরণিকায় প্রকাশিত