প্রিয়ঙ্কা-রাহুলদের পিতামহ ফিরোজ জাহাঙ্গীর খান গান্ধীর থেকেই এসেছিল গান্ধী পদবী 

প্রিয়ঙ্কা-রাহুলদের পিতামহ ফিরোজ জাহাঙ্গীর খান গান্ধীর থেকেই এসেছিল গান্ধী পদবী 

 

নিউজ ডেস্ক বঙ্গ রিপোর্ট: জহরলাল নেহরু তার একমাত্র মেয়ে ইন্দিরাকে উচ্চশিক্ষা লাভ করতে অক্সফোর্ডে পাঠান। সে সময় ভারত থেকে আরেকজন যুবক অক্সফোর্ডে পড়ালেখা করছিলেন। যার নাম ফিরোজ জাহাঙ্গীর খান গান্ধী( ১২ সেপ্টেম্বর,১৯২২- ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৬০)

 

ফিরোজ গান্ধীকে ফিরোজ নামের কারণে অনেকে মুসলিম বলে মনে করেন। আবার গান্ধী নামের কারণে অনেকে বলেন তিনি ছিলেন হিন্দু। আসলে তিনি হিন্দু-মুসলিম কোনটাই ছিলেন না। ছিলেন পারসি বা পার্সি ধর্মাবলম্বী। তার পুরো নাম ফিরোজ জাহাঙ্গীর খান গান্ধী। তার বাবার নাম জাহাঙ্গীর ফেরাদুন গান্ধী, মায়ের নাম রতিমাই গান্ধী। গান্ধী তাদের পারিবারিক পদবী।

 

উল্লেখ্য, এই গান্ধী আসলে ভারতের ‘Gandhi’ নয়। এটি পার্সিয়ান বা পার্সি ধর্মাবলম্বীদের পদবী ‘Ghandy’। কিন্তু ভারতে গান্ধীই উচ্চারণ করা হতো। ফিরোজ জাহাঙ্গীর খান গান্ধী বা সকলের কাছে ফিরোজ গান্ধী নামে পরিচিত ব্যক্তির পুর্বপুরুষরা পারস্য থেকে ভারতবর্ষে এসেছিলেন। এদের ধর্মের নাম জরাথুস্ত্রবাদ বা পারসী ধর্ম।

 

এখানে উল্লেখ্য ফিরোজ অক্সফোর্ডে যাওয়ার আগেই ভারতীয় কংগ্রেসের সদস্য হন। পার্টির কাজের সুবাদে নেহরু পরিবারের সাথে যোগাযোগ তৈরি হয় ফিরোজের। এক পর্যায়ে ১৬ বছরের ইন্দিরাকে বিয়ে করার ইচ্ছা পোষণ করেন ২২ বছরের যুবক ফিরোজ।

 

ইন্দিরার মা কমলা গান্ধীকে জানালে সে প্রস্তাব নাকচ করে দেন। ভিন্ন ধর্মের মধ্যে বিয়ে সেসময় অনেক কঠিন ব্যাপার ছিল। তাও আবার নেহরু পরিবারের মত রাজনৈতিক পরিবারের জন্য বটেই। কিন্তু অক্সফোর্ডে গিয়ে ইন্দিরা ও ফিরোজের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়, একে অন্যের গভীর প্রেমে পড়েন।

 

পিতা জওহরলাল নেহরুর সাথে কন্যা ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী নেহরুর সম্পর্ক ছিল গভীর, বন্ধুত্বপূর্ণ। কন্যাকে অত্যধিক ভালোবাসতেন পিতা। লন্ডন থেকে পিতাকে অনেকগুলো চিঠি পাঠাতেন কন্যা। পিতাও দিতেন উত্তর। একপর্যায়ে নিজের প্রেমের কথা জানালে ইন্দিরা। কিন্তু পিতা জোরালো আপত্তি তুললেন। কোনভাবেই ভিন্ন ধর্মের কারো সাথে বিয়ে দিতে রাজি নন তিনি।

 

এরপর প্রতিটি চিঠিতে ইন্দিরা তার প্রেমের সম্পর্কের গভীরতার কথা জানিয়েছেন। ফিরোজকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করবেন না এমন প্রতিজ্ঞা শুনিয়েছেন। জওহরলাল নেহরু বুঝতে পেরেছিলেন তার কন্যাকে থামানো সম্ভব নয়। দিশেহারা নেহরু ছুটে গেলেন মহাত্না গান্ধীর কাছে। ইন্দিরাকে বিশেষ স্নেহ করতেন তিনি। গান্ধী বুঝাতে পারবেন ইন্দিরাকে- এরকম ক্ষীণ আশা নিয়েই হয়ত গিয়েছিলেন নেহরু।

 

কিন্তু মহাত্না গান্ধীও পারলেন না অথবা চেষ্টা করলেন না। মহাত্না গান্ধী জওহরলাল নেহরুকে বললেন – আমার পুত্রের সাথে ইন্দিরাকে বিয়ে দিতে রাজি হবে? জওহরলাল নেহরু সম্মতি জানালেন। মহাত্না গান্ধী বললেন আজ থেকে ফিরোজ আমার পুত্র। ততদিনে ফিরোজ গান্ধী কংগ্রেসের রাজনীতি করার সুবাদে মহাত্মা গান্ধীর নামের সাথে মিল রেখে নামের ‘Ghandy’কে ‘Gandhi’ লিখে গান্ধী নামে পরিচিত হয়ে গিয়েছেন।

 

১৯৪২ সালে হিন্দুরীতি মেনে বিয়ে হয় ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী নেহরু ও ফিরোজ জাহাঙ্গীর খান গান্ধীর। শেষ পর্যন্ত আপত্তি থাকলেও পিতা জওহরলাল নেহরু এ বিয়ে মেনে নেন। আসলে বলতে হয় মেনে নিতে বাধ্য হলেন। ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী নেহরু হয়ে গেল ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী, যিনি ইতিহাসে বিখ্যাত হলেন ইন্দিরা গান্ধী নামে।

 

সুইডিশ সাংবাদিক বার্টিল ফক তাঁর লেখা ‘ফিরোজ গান্ধী’ বইতে বলেছেন, নেহরুর জামাতা ছিলেন গণতন্ত্রমনস্ক ও বিরল সাহসী। ফিরোজ দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি আকর্ষণীয়, বুদ্ধিদীপ্ত ও ধৈর্যশীল ছিলেন।

 

ফিরোজের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে এ বইতে আরও বলা হয়, তিনি মজা করতে পারতেন। সত্যের প্রতি অবিচল ছিলেন। দরিদ্রদের উন্নয়নের জন্যও কাজ করতেন। পাশাপাশি ইন্দিরা গান্ধীকে কর্তৃত্ববাদী না হয়ে উঠতে আগেই সতর্ক করেছিলেন ফিরোজ।

১৯৫৯ সালে ভারতের কেরালা রাজ্যে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট সরকার ভেঙে দেন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু। ইন্দিরা গান্ধী এ ব্যাপারে বাবাকে প্রভাবিত করেন। কমিউনিস্ট সরকারকে এভাবে সরানো নিয়ে ইন্দিরা ও ফিরোজের মধ্যে মতবিরোধ চরমে ওঠে।

 

ফিরোজ তখন ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের রায়বেরিলি থেকে নির্বাচিত কংগ্রেস দলীয় সাংসদ। ইন্দিরার এ পদক্ষেপে ফিরোজ তীব্রভাবে নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। সরাসরি ফ্যাসিবাদী বলেছিলেন ইন্দিরাকে। ক্ষুব্ধ ফিরোজ প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কংগ্রেসের নীতি ও আদর্শ কোথায় গেল?’

 

মেয়ে ও জামাইয়ের এই ঝগড়ায় বিব্রতবোধ করেন নেহরু। ফকের লেখায় জানা যায়, ফিরোজ ফ্যাসিবাদী বলায় রেগে যান ইন্দিরা। বলেন, এটি তিনি মেনে নিতে পারছেন না। ফিরোজের বন্ধু ও সাংবাদিক নিখিল চক্রবর্তীর কাছ থেকে এসব কথা শুনেছেন বলে দাবি করেন ফক।

 

ইন্দিরা ও ফিরোজ গান্ধীর দুই ছেলে- রাজীব ও সঞ্জয়। বিবাহিত জীবনে তাঁদের মতানৈক্য ছিল ভারতের রাজনীতিতে আলোচিত ইস্যু। ১৯৬০ সাল পর্যন্ত এভাবেই জীবন কাটে ইন্দিরা ও ফিরোজের। পরে মারা যান ফিরোজ।