প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমলে যেভাবে ভেঙে পড়লো ত্রিশ বছর ধরে ঢেলে সাজানো ভারতীয় অর্থনীতি

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমলে যেভাবে ভেঙে পড়লো ত্রিশ বছর ধরে ঢেলে সাজানো ভারতীয় অর্থনীতি

(ব্লুমবার্গ হতে অনূদিত। মূল রচয়িতা : বৃষ্টি বেনিওয়াল, এরিক মার্টিন, ধ্বনি পাণ্ডিয়া ও শ্রুতি শ্রীবাস্তব।)

 

ত্রিশ বছর আগের কথা। জুলাই মাসের শেষাশেষি এক গ্রীষ্মের সন্ধ্যায়, ভারত তাদের সোভিয়েত ঘরানার অর্থনীতিকে উদারীকরণের সিদ্ধান্ত পাকা করে। এর ফলাফল হয় সুদূরপ্রসারী। একাধারে ৩০ কোটি মানুষের দারিদ্র্যবিমোচন ঘটে, এবং বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম সম্পদ সৃষ্টি সম্ভবপর হয়।

 

কিন্তু তারপর একদিন আগমন ঘটে করোনাভাইরাসের। সেটির বিদ্যুৎবেগী প্রাদুর্ভাবে শবদেহ উপচে পড়তে থাকে দেশটির হাসপাতালগুলোয়। শ্মশানের কালো ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় শহুরে আকাশ।

 

এভাবেই, বছরের পর বছর, কিংবা দশকের পর দশক ধরে সংঘটিত উন্নয়ন, নিঃশেষ হয়ে যায় মাত্র কয়েক মাসে। একসময় ভারতের যে মানুষগুলো দারিদ্র্যের করালগ্রাস হতে মুক্ত হয়েছিল, তারা আবার চাকরি হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়ে। অথচ একদিকে তাদের কাঁধে ঋণের বোঝা, অন্যদিকে মহামারিতে আপনজন হারানোর বেদনাও টাটকা।

 

এই দুর্যোগ এসে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় দেশটির স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামোর মান ঠিক কতটা অনুন্নত। অর্থনৈতিক উদারীকরণের ফলে এই দুই খাত সর্বাধিক অবহেলার শিকার হয়েছে, যার ফলস্বরূপ আজ দিশেহারা অবস্থায় উপনীত গোটা জাতি।

 

অবস্থা ঠিক কতটা খারাপ? যতটা খারাপ হলে ২০ কোটি মানুষের দৈনিক উপার্জন ন্যূনতম ৫ ডলারের নিচে নেমে যায়, এমনটিই জানাচ্ছে ব্যাঙ্গালোরের আজিম প্রেমজি ইউনিভার্সিটি। এদিকে পিউ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতে, দেশের ভোক্তা অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে বিবেচিত যে মধ্যবিত্ত শ্রেণি, তাদের সংখ্যা ২০২০ সালে হ্রাস পেয়েছে প্রায় ৩.২০ কোটি। তার অর্থ হলো, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ভারতের গুরুত্ব ক্রমবর্ধমান হলেও, নিজ দেশেই একটি মহাগুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তারা দিন দিন পশ্চাৎধাবমান।

 

সবকিছু ঠিক থাকলে, এই দশকেই ভারতের কথা রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশের তালিকায় পেছনে ফেলার চীনকে, যারা বেশ অনেক বছর ধরেই বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিতে চালকের আসনে রয়েছে। অথচ জনসংখ্যায় চীনকে টেক্কা দিতে পারলেও, এবং দেশটিতে তরুণ, কর্মজীবী-বয়সের জনসংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী হলেও, ভারত আজ বড় ধরনের অর্থনৈতিক-ধসের হুমকির সম্মুখীন।

 

“এই দশকটি হতে চলেছে সুযোগ হারানোর এবং প্রতিবন্ধকতার,” এভাবেই নিজের হতাশা ব্যক্ত করেন অরবিন্দ সুব্রামানিয়ান, যিনি ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ফেলো, এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের একজন প্রাক্তন অর্থনৈতিক উপদেষ্টা।

 

“যদি না সামনে দেশের অর্থনৈতিক নীতিমালায় বড় ধরনের সংস্কার এবং মৌলিক পরিবর্তন না আসে, তাহলে আমরা উন্নতির বছরগুলোর ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারব না। আমাদের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ, ৮ শতাংশে ফিরে যাওয়া খুবই জরুরি, আর সেজন্য করণীয় রয়েছে প্রচুর।”

 

এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে চির কিন্তু ধরতে শুরু করেছে মহামারির আগে থেকেই। ২০১৪ সালে মোদি যখন ক্ষমতায় আসেন, তার আগে ভোটাররা ত্যক্তবিরক্ত ছিল বিভিন্ন ব্যাংক কেলেঙ্কারি ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত নীতিমালা নিয়ে, যা ভারতীয় প্রবৃদ্ধিকে অনেকটা খাদের কিনারে ঠেলে দিচ্ছিল। মোদি আসার পর, সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও, নতুন করে নানাবিধ ঝুটঝামেলার উদয় ঘটেছে। যেমন- ২০১৬ সালের নোটবন্দি, যা দেশটির অর্থনীতির অনানুষ্ঠানিক খাতগুলোকে (ইনফরমাল সেক্টর) মহাসংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে; কিংবা তাড়াহুড়া করে প্রবর্তিত নতুন কর ব্যবস্থা।

 

মোদি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ২০২৫ সালের মধ্যে ভারতকে ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করার। কিন্তু মহামারি এসে সন্দেহাতীতভাবেই সেটিকে বেশ কয়েক বছর পিছিয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালের এপ্রিলে শুরু হতে যাওয়া পরবর্তী অর্থবছর নাগাদ ভারতের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৬.৯ শতাংশ। কিন্তু তা তো প্রত্যাশিত ৮ শতাংশের চেয়ে অনেক কম, যা মোদির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে এবং প্রতিবছর কর্মক্ষেত্রে প্রবেশকারী লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আবশ্যক।

 

লন্ডনের চাটম হাউজের চেয়ারম্যান জিম ও’নীল, যিনি গোল্ডম্যান স্যাক্স গ্রুপ ইঙ্ক.-এর একজন শীর্ষ অর্থনীতিবিদ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের উদীয়মান বাজারকে অভিহিত করার জন্য ব্রিকস (BRICs) পরিভাষাটি প্রণয়ন করেন, এই মুহূর্তে ভারতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বেশ শঙ্কিত। এর প্রধান কারণ এই যে, তিনি মনে করেন, নিজেদের সম্ভাবনার সবটুকু অর্জনে ভারত সরকারের যে-সকল দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত পরিবর্তন আনা উচিত ছিল, তা তারা আনেনি।

 

গোল্ডম্যান স্যাক্সে থাকতেই, ২০১৩ সালে তিনি মোদির সামনে একটি পেপার উপস্থাপন করেন। মোদি তখনো প্রধানমন্ত্রী হননি। সেই পেপারে ১০টি প্রস্তাবের উল্লেখ ছিল, যেগুলো ২০৫০ সালের মধ্যে ভারতীয় অর্থনীতিকে ৪০ গুণ বড় করে তুলতে পারবে। সেই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল অবকাঠামো, শিক্ষা প্রভৃতি খাতে জোরালো পরিবর্তন, স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বকে মজবুতকরণ, বাণিজ্যিক বাজারগুলোকে আরো উদারীকরণ, এবং পরিবেশগত সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ। কিন্তু ও’নীলের মতে, মোদি এই বিষয়গুলোতে যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করেননি।

 

“ভারতের রয়েছে চমৎকার জনশক্তি, যাকে কাজে লাগিয়ে তারা আরো শক্তভাবে এগিয়ে যেতে পারত, এমনকি হয়তো দীর্ঘ সময় ধরে চীনের মতো দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি উপভোগ করতে পারত। অথচ ভারতীয় সিস্টেমকে দেখে প্রায়ই মনে হয় তারা বুঝি নিজেদেরকে দমিয়ে রাখছে, যা কোভিড মহামারির সময় বেশ কয়েকবার চোখে পড়েছে।”

 

একজন সরকারি মুখপাত্রের কাছে এ বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অবশ্য মোদি প্রশাসন ঠিকই সাম্প্রতিক সময়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে।

 

“যদি আমরা প্রবৃদ্ধিকে একটি টেকসই পথে ফিরিতে আনতে চাই — ৮ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে — তাহলে শুধু সাময়িকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো নিয়ে ভাবলেই চলবে না,” গত ৩০ জুন ইন্ডিয়া গ্লোবাল ফোরামে এ কথা বলেন সরকারের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা সঞ্জীব সান্যাল। তার মতে, কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন, এবং সেজন্য সরকার প্রতিনিয়তই অর্থনীতির নতুন নতুন খাত উন্মোচন করছে।

 

একসময় ভারত ছিল বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতবর্ধনশীল। কিন্তু গত বছর তারাই দেখেছে তাদের বৃহত্তম সংকোচন — দেশব্যাপী লকডাউনের ফলে প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে ৭ শতাংশের বেশি। এরপর যখন অর্থনীতি আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে শুরু করে, ঠিক তখনই দেশটিতে আছড়ে পড়ে সংক্রমণের এক নতুন ঢেউ।

 

কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, এ বছর ভারতের প্রবৃদ্ধি হবে ৯.৫ শতাংশ, যা পূর্বে প্রত্যাশিত দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধির চেয়ে কিছুটা কম। গত বছরের সংকোচনের সাথে তুলনা করলে এই প্রবৃদ্ধি অনেক বেশি, তবে অনেক অর্থনীতিবিদই বলছেন, প্রকৃত সংখ্যা হয়তো আরো কমবে।

 

বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ গত বছর বেড়েছে ১৯ শতাংশ, কিন্তু সেটিও সিঙ্গাপুর কিংবা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর সাপেক্ষে, জিডিপির শতাংশ হিসেবে বেশ কম। তাছাড়া বৈদেশিক বিনিয়োগের একটি বড় অংশই গেছে বিলিয়নিয়ার মুকেশ আম্বানির ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে।

 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাক্তন প্রধান দুভভুরি সুব্বারাও এবং আরো কয়েকজন বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে দিয়েছেন যে ভারতের ‘কে-শেপড রিকভারি’ হতে পারে, যেখানে ধনীরা আরো ধনী হবে, এবং গরিবরা হবে আরো গরিব।

 

“অসমতা বৃদ্ধি পাওয়া কেবল একটি নৈতিক সমস্যা নয়। এর ফলে ভোগের পরিমাণ কমতে পারে, ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে দেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা।”

 

এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন – আম্বানি ও পোর্টস ম্যাগনেট গৌতম আদানি – ভারতীয়। মহামারি চলাকালীন তাদের দুজনেরই মোট সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কেননা বিশ্বব্যাপী সস্তা তারল্যের সুবাদে স্টকের দাম বেড়েছে, এবং অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও বড় বড় কোম্পানিদের করের পরিমাণ কমানো হয়েছে।

 

অথচ যদি তাকানো হয় সামগ্রিক ভারতীয় সম্পদ কিংবা ঋণ ব্যতীত সাধারণ মানুষের মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও প্রকৃত সম্পদের মূল্যমানের দিকে, তাহলে দেখা যাবে সেগুলোর পরিমাণ ২০২০ সালে হ্রাস পেয়েছে ৫৯৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৪.৪ শতাংশ (ক্রেডিট সুইস গ্রুপ এজির তথ্যানুযায়ী)।

 

ত্রিশ বছর আগে, ভারত বাধ্য হয় তাদের অর্থনীতিকে ঢেলে সাজাতে। বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য ঘাটতি এবং ডুবতে বসা বৈদেশিক মুদ্রার মজুদের কারণে তারা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে ধার নেয়। ১৯৯১ সালের ২৪ জুলাই, তৎকালীন বাণিজ্য মন্ত্রী মনমোহন সিং ঘোষণা দেন বেশ কিছু বৃহৎ পদক্ষেপ গ্রহণের, যাতে শুল্কের পরিমাণ কমে এবং বাণিজ্যের প্রতি আগ্রহ বাড়ে। এভাবেই দেশটির অর্থনীতিকে উন্মুক্ত করে দেয়া হয় বাইরের দুনিয়ার কাছে।

 

সেই উদারীকরণের ফলে গর্জে ওঠে দেশটির অর্থনীতি। প্রবৃদ্ধি ছাড়িয়ে যায় ৮ শতাংশ। ইনফোসিসের মতো টেক জায়ান্টদের জন্ম হয়, এবং এখনো ব্যাঙ্গালোরে বিলিয়ন ডলার মূল্যমানের নানা স্টার্ট-আপ গজিয়ে উঠছে ব্যাঙের ছাতার মতো। এরই মধ্যে একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব ঘটেছে, যারা নেটফ্লিক্স দেখে, অ্যামাজনের মাধ্যমে অনলাইনে কেনাকাটা করে। দক্ষিণে উইস্ট্রন কারখানা বিশেষ অর্থনৈতিক ফায়দা লুটছে অ্যাপলের আইফোন জোড়া দেয়ার মাধ্যমে। ভারত পরিণত হয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম জেনেরিক ওষুধ সরবরাহকারী দেশে, এবং সেরাম ইনস্টিটিউট অভ ইন্ডিয়া বিশ্বের বৃহত্তম টিকা প্রস্তুতকারক। একটি ভারতীয় এক্সচেঞ্জই বর্তমানে সামলাচ্ছে বিশ্বের সর্বোচ্চ সংখ্যক ডেরিভেটিভ কন্ট্রাক্ট।

 

কিন্তু তারপরও, সবসময়ই এমন কিছু লক্ষণ ঠিকই দেখা গেছে, যা থেকে বোঝা যায় ভারত তার সক্ষমতার চরম শিখরে পৌঁছাতে পারছে না। ৩০ বছরের গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি যেমন ৬.২ শতাংশ, যা চীনের ৯.২ শতাংশ তো বটেই, এমনকি পিছিয়ে পড়া ভিয়েতনামের ৬.৭ শতাংশের চেয়েও কম। অনেক বছর ধরেই ভারতীয়দের গড় আয়ুষ্কাল বেশ কম, এবং এখন তাদের গড় উপার্জনও বাংলাদেশের মতো ছোট দেশের মানুষের চেয়ে কম।

 

ইতোমধ্যে বৈষম্যের মাত্রাও প্রবল হয়েছে। গবেষকদের মতে, ভারতের শহুরে এলাকা ও উচু বর্ণের মধ্যে সম্পদশালী জনগোষ্ঠীর পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার মাধ্যমে বোঝা যায় যে উন্নয়নের হাওয়া তাদের গায়েই লেগেছে, যারা আগে থেকেই উন্নত ও সুবিধাপ্রাপ্ত ছিল। কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণের পরিমাণও হ্রাস পেয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মতে, ১৯৯১ সালে যেখানে তা ছিল ৩০.৩ শতাংশ, ২০১৯ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ২১ শতাংশে। মহামারি শুরুর আগে ভারতের সরকার জিডিপির ২ শতাংশেরও কম ব্যয় করত স্বাস্থ্যসেবার পেছনে।

 

“স্বাস্থ্যসেবা খাত যদি এত লম্বা সময় ধরে এতটা অবহেলিত না থাকত, তাহলে ভারত কোভিড-১৯ বিপর্যয় সামলানোর ক্ষেত্রে আরো ভালোভাবে প্রস্তুত থাকত,” এমনই মনে করেন বেলজিয়ামে জন্ম নেয়া ভারতীয় অর্থনীতিবিদ এবং দিল্লি ইউনিভার্সিটির লেকচারার, জন দ্রেজা। “ভারত যদি সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরো বলিষ্ঠভাবে গড়ে তুলতে পারত, তাহলে চলমান বিপর্যয়ে মৃতের সংখ্যা এতটা ভয়াবহ হতো না।”

 

ভারতের অবস্থা আর ১৯৯১ সালের মতো নেই। মোদি দেশটির অর্থনীতিকে আরো বেশি অন্তর্মুখী করে তুলেছেন। তিনি আত্মনির্ভরশীলতার উপর জোর দিয়েছেন, গড়ে তুলতে চেয়েছেন বেশি বেশি দেশীয় কোম্পানি। বৈশ্বিক ফোরামগুলোতে মুক্ত অর্থনীতির পক্ষে কণ্ঠ তুললেও, তিনিও অন্যান্য অনেক দেশের দেখাদেখি শুল্কের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছেন ইলেকট্রনিক্স কিংবা মেডিকেল ইকুইপমেন্টের মতো পণ্যের উপর।

 

এসব সিদ্ধান্তই বুমেরাং হয়ে এসেছে ভারতের দিকে, যখন দেশটির নাগরিকেরা হাঁসফাঁস করেছে মহামারি চলাকালীন অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটরের মতো জীবন-বাঁচানো পণ্য আমদানি করতে। বড় বড় বিজ্ঞানীরা মোদির কাছে চিঠি লিখেছেন, আবেদন করেছেন যেন করোনাভাইরাস ও এর বিভিন্ন ভ্যারিয়েন্ট (যেমন ডেল্টা ওয়ান, যেটি এখন এক বৈশ্বিক হুমকির কারণ হয়েছে দাঁড়িয়েছে) নিয়ে গবেষণা করতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রের উপর থেকে সংরক্ষণবাদী শুল্ক তুলে নেয়া হয়।

 

অথচ বৈশ্বিক টিকা কর্মসূচিতে অবদান রাখার অঙ্গীকার দেয়ার পর মোদি সরকার কমিয়ে দিয়েছে কোভিড-১৯ শট রপ্তানি, যার ফলে ভেস্তে গেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মদদপুষ্ট একটি টিকা কর্মসূচির উদ্যোগ।

 

“ভারত চেয়েছিল বৈশ্বিক পর্যায়ে একজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের মর্যাদা লাভ করতে। কিন্তু সেই উচ্চাভিলাষ বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে মহামারিকালে। এই মহামারি এসে উলঙ্গ করে দিয়েছে সরকারের দুর্বলতাগুলোকে। বেরিয়ে এসেছে তাদের শক্তি ও ক্ষমতার ভঙ্গুরতা,” বলেন কর্নেল ইউনিভার্সিটির বাণিজ্য নীতির অধ্যাপক ঈশ্বর প্রসাদ।

 

বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো এই যে, ভারতীয়রা ধনী হওয়ার আগেই ভারত বুড়িয়ে যাবে কি না। নেটফ্লিক্স এখনো ভারতের মুখ চেয়ে রয়েছে তাদের পরবর্তী ১০ কোটি ভোক্তার জন্য। বেজোস বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঢালছেন, এমনকি ভারতীয় আদালতেও লড়াই করছেন — যেন ভারতের সর্বোচ্চ ধনী ব্যক্তি আম্বানির পাশাপাশি তিনিও খানিকটা কামড় বসাতে পারেন দেশটির এক বিলিয়নের অধিক জনগোষ্ঠীর জন্য উন্মুক্ত একমাত্র খুচরা বাজারে।

 

“মহামারি আমাদেরকে একদম পিষে দিয়েছে, এবং এটি ঘটেছে যখন আমরা ইতোমধ্যেই একটি প্রবৃদ্ধি-অবনমনের দুঃসময় পার করছি,” বলেন অর্থনীতিবিদ ও রিজার্ভ ব্যাংক অভ ইন্ডিয়ার বোর্ডের একজন প্রাক্তন সদস্য, ইন্দিরা রাজারমন। “সামনের দিনগুলোতে দেখার বিষয় এটাই হবে যে আমরা এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কতটা বুদ্ধি খাটিয়ে নীলনকশা সাজাতে পারি।”

প্রতিবেদন: রোয়ার বাংলা