রাজশাহী কারাগারে দেখা করলাম আল্লামা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর সাথে- মাসুদ সাঈদী

রাজশাহী কারাগারে দেখা করলাম আল্লামা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর সাথে- মাসুদ সাঈদী

গত ২০.০৭.২০১৯ তারিখ সকাল ১০:২০ মিনিটে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আমার পরম শ্রদ্ধেয় পিতা আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী হাফিজাহুল্লাহকে হঠাৎ করেই রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে আসে কারা কর্তৃপক্ষ। আব্বাকে ঢাকা থেকে রাজশাহীতে আনার ঠিক সেই মূহুর্তে আমি পারিবারিক কাজে ঢাকার বাইরে ছিলাম। খবরটি পেয়ে আমি রাজশাহীতে এসেছি। আগামীকাল ২৫.০৭.২০১৯ তারিখ বৃহস্পতিবার রাজশাহীর আদালতে একটি মামলায় আব্বার হাজিরা আছে।

আব্বাকে এখানে কেন আনা হয়েছে? মামলাটা কি? তাঁরই বা করণীয় কি? এসব কোনো বিষয়ই আব্বার জানা নাই এটা আমি নিশ্চিত। আমি এটাও বুঝছিলাম যে, হঠাৎ করে তাঁকে রাজশাহীতে আনাতে আমরা পরিবারের সদস্যরা বা তাঁর আইনজীবীরা তাঁর এখানে আসার বিষয়টি জানতে পেরেছি কিনা সেটা নিয়েও নিশ্চয়ই আব্বা পেরেশানীতে আছেন।

আমরাও খুব পেরেশানীতে পরে গেলাম হঠাৎ করে আব্বাকে রাজশাহীতে নিয়ে আসার কারনে। নানা দুঃশ্চিন্তা মাথায় নিয়ে আব্বার সাথে পরিবারের সদস্য হিসেবে আমি ও আইনজীবীদের সাক্ষাতের জন্য জেল কোডের বিধান অনুযায়ী আজ ২৪.০৭.২০১৯ তারিখ রাজশাহীর আদালতে একটি আবেদন করি। আমাদের সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে বিজ্ঞ আদালত শুনানী শেষে আমাদেরকে সাক্ষাতদানের জন্য কারা কতৃপক্ষ বরাবরে লিখিত নির্দেশনা প্রদান করে।

দুপুর ৩টার দিকে আদালতের অনুমতির কাগজ কারাগারে পৌঁছায়। ততক্ষনে আমরাও রাজশাহী কারাগারের মূল ফটকে পৌঁছে গেছি। প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টি মাথায় নিয়েই অপেক্ষায় ছিলাম। সাক্ষাতের আবেদন কারাভ্যম্তরে পাঠানোর পর কাজ শুধু অপেক্ষা করা।

কতক্ষনে ডাক আসবে !
কতক্ষনে দেখতে পাবো আমি আমার আস্ত কলিজাটাকে !!

প্রায় ১ ঘন্টা অপেক্ষার পর সাক্ষাতের জন্য ডাক এলো। দৌড়ে গেলাম কারাগারের প্রবেশ গেটে। আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ভেতরে ঢুকলাম। আমার সাথে ছিলেন সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী মতিউর রহমান আখন্দ ও রাজশাহী বারের আইনজীবী হাসানুল বান্না সোহাগ।

ডেপুটি জেলারের রুমে বসে অপেক্ষা করছি। জানালা দিয়ে দূরে দেখতে পেলাম মাথায় ছাতি ধরে আমার আব্বা আসছেন। তাঁর সামনে পেছনে ১০/১২ জন কারারক্ষী। চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি ঝরছে আমার। দেখতে পেলাম আব্বাকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে পেছন থেকে একজন ঠেলে নিয়ে আসছে। ডুকরে কেঁদে উঠলাম। নিজেকে সামলাতে পারছিলাম না কিছুতেই ….।

আব্বাকে ওরা রুমের ভিতরে নিয়ে আসলোনা। আব্বা রইলেন কারাগারের ভেতরেই আর আমরা ডেপুটি জেলারের রুমে। বৃষ্টির মধ্যেই জানালায় দাঁড়িয়ে কথা বলতে হবে। জানালার ওপাশে অঝোর বৃষ্টির মধ্যে মাথায় ছাতা নিয়ে হুইল চেয়ারে বসা আব্বা আর এপারে রুমের ভেতর দাঁড়িয়ে আমরা। অনুরোধ করেও আব্বাকে রুমে এনে কথা বলার সুযোগ পেলাম না। আব্বা জানালার কাছে আসতেই জানতে চাইলাম, হুইল চেয়ার কেন? আব্বা জানালেন, কাশিমপুর কারাগার থেকে আব্বাকে প্রীজন ভ্যানে করে রাজশাহীতে এনেছে। ভ্যানের ভেতর বসার ব্যবস্থা বলতে ভাঙা একটি বেঞ্চ। ভাঙা সেই বেঞ্চে কোনোরকমে বসে দীর্ঘ ৬/৭ ঘন্টার পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। কিছু ধরে বসার কোনো ব্যবস্থা নেই, কারো সাহায্য নেয়ার জন্যও গাড়ির ভেতর কেউ নেই। এমনিতেই আব্বা হাঁটু ও কোমরের ব্যাথায় ভুগছেন আজ প্রায় ১২/১৩ বছর। আর এভাবে আব্বাকে দীর্ঘ পথ টেনে আনাতে ব্যাথায়-কষ্টে তিনি এখন উঠেই দাঁড়াতে পারছেন না। কথাগুলো শুনে আব্বার সামনে চিৎকার করে কাঁদতে পারলাম না, আব্বা ধমক দেবেন এই ভয়ে। কিম্তু ভেতরে ভেতরে আমি কাঁদছি আর রাগে ক্ষাভে, কষ্টের যাতনায় কাঁপছিলাম।

আব্বা জানতে চাইলেন, কেন তাকে এখানে আনা হয়েছে। এডভোকেট মতিউর রহমান আখন্দ ভাই আব্বাকে জানালেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হত্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে আপনাকে। ২০১০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংঘর্ষে মারা যান ফারুক। এই মামলায় সাবেক আমীরে জামায়াত শহীদ মতিউর রহমান নিজামী, সাবেক সেক্রেটারী জেনারেল শহীদ আলী আহসান মোঃ মুজাহিদও আসামী ছিলেন। আব্বা সব শুনছিলেন। আখন্দ ভাইয়ের কথা শেষ হলে আব্বা মুচকি হাসলেন। বললেন, মানুষ এতো মিথ্যা বলে কীভাবে? হত্যা ঘটনার রাতে আমরা কেউই তো রাজশাহীতেই ছিলাম না। তাছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংষর্ষে ফারুক নিহতের ঘটনায় আমরা কীভাবে জড়িত হলাম!!

কে দেবে আব্বার এই প্রশ্নের জবাব! চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। আব্বাকে জানালাম আগামীকাল তাকে রাজশাহীর আদালতে নেয়া হবে। সেখানে সিনিয়র আইনজীবীরা সকলে থাকবেন। আব্বা শুনলেন, আশ্বস্ত হলেন। বললেন, ‘তোমরা আমাকে নিয়ে চিন্তা করোনা। আমি সকল অবস্থায় আমার আল্লাহর উপর ভরসা করি। নিশ্চয়ই আমার মালিক আমার জন্য যা কিছু কল্যাণকর, সেটাই করবেন।’

সাক্ষাতের সময় শেষ হয়ে গেল। মনে আফসোস রয়ে গেল, আব্বাকে একটু ধরতেও পারলাম না। স্পর্শ করতে পারলাম না তার পবিত্র পা দু’টি। চুমু খেতে পারলাম না তার পবিত্র দু’টি হাতে।

তৃষিত নয়ন ঠান্ডা হলেও অতৃপ্ত মন নিয়ে বেরিয়ে এলাম রাজশাহী কারাগার থেকে।

আহ্ .. কি কষ্ট !
কি অব্যক্ত বেদনা আমার …. !!

লেখাটা Masood Sayedee – মাসুদ সাঈদী এর ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া।