“স্যারে জাহা সে আচ্ছা হিন্দুস্থা হামারা”র স্রষ্টা কবি আল্লামা ইকবালের জন্মদিনে শ্রদ্ধা নিবেদন

“স্যারে জাহা সে আচ্ছা হিন্দুস্থা হামারা”র স্রষ্টা কবি আল্লামা ইকবালের জন্মদিনে শ্রদ্ধা নিবেদন

বঙ্গ রিপোর্ট ডিজিটাল ডেস্ক: স্যারে জাহা সে আচ্ছা হিন্দুস্থান হামারার স্রষ্টা কবি আল্লামা ইকবালের জন্মদিনে শ্রদ্ধা নিবেদন । জন্ম ৯ নভেম্বর ১৮৭৭ – মৃত্যু ২১ এপ্রিল ১৯৩৮), আল্লামা ইকবাল নামে ব্যাপক পরিচিত, ছিলেন বিভাগপূর্ব ভারতবর্ষের মুসলিম কবি, দার্শনিক এবং রাজনীতিবিদ,শিক্ষবিদ ও ব্যারিস্টার ছিলেন। তার ফার্সি ও উর্দু কবিতা আধুনিক যুগের ফার্সি ও উর্দু সাহিত্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাকে পাকিস্তানের আধ্যাতিক জনক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। ইকবাল তার ধর্মীয় ও ইসলামের রাজনৈতিক দর্শনের জন্যও বিশেষভাবে সমাদৃত ছিলেন।

ইকবাল ভারতীয়, পাকিস্তানি, বাংলাদেশী, ইরানিয়ান এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সাহিত্যের বিশিষ্ট কবি হিসাবে প্রশংসিত। যদিও ইকবাল বিশিষ্ট কবি হিসাবে সর্বাধিক পরিচিত, তিনি “আধুনিক সময়ের মুসলিম দার্শনিক চিন্তাবিদ” হিসাবেও অত্যন্ত প্রশংসিত। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ আসরার-ই-খুদী ১৯১৫ সালে পারস্য ভাষায় প্রকাশিত হয়েছিল এবং কবিতার অন্যান্য গ্রন্থগুলিতে রুমুজ-ই-বেখুদী ,পয়গাম-ই -মাশরিক এবং জুবুর-ই -আজাম। এর মধ্যে তাঁর বিখ্যাত উর্দু রচনাগুলি হ’ল বাং -ই -দারা ,বাল -ই -জিবরাইল এবং আরমাঘান -ই -হিজাজ ।

১৯২২ সালের নিউ ইয়ার্স অনার্সে তাকে রাজা পঞ্চম জর্জ তাকে নাইট ব্যাচেলর এ ভূষিত হয়েছিল। দক্ষিণ এশিয়া ও উর্দু-ভাষী বিশ্বের বেশিরভাগ অঞ্চলে ইকবালকে শায়র-ই-মাশরিক’ (উর্দু: شاعر مشرق‎‎, প্রাচ্যের কবি) হিসাবে বিবেচনা করা হয়। তাকে মুফাক্কির-ই-পাকিস্তান (উর্দু: مفکر پاکستان‎‎,পাকিস্তানের চিন্তাবিদ ), মুসোয়াওয়ার-ই-পাকিস্তান (উর্দু: مصور پاکستان‎‎, “‘পাকিস্তানের শিল্পী”) এবং হাকিম-উল-উম্মাত (উর্দু: حکیم الامت‎‎, “উম্মাহর ভরসা”) ইত্যাদি নামে ডাকা হয়।

তার একটি বিখ্যাত চিন্তা দর্শন হচ্ছে ভারতের মুসলমানদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন। এই চিন্তাই বর্তমান পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে। তার নাম মুহাম্মদ ইকবাল হলেও তিনি আল্লামা ইকবাল হিসেবেই অধিক পরিচিত। আল্লামা শব্দের অর্থ হচ্ছে শিক্ষাবিদ । তার ফার্সি সৃজনশীলতার জন্য ইরানেও তিনি ছিলেন সমধিক প্রসিদ্ধ; তিনি ইরানে ইকবাল-ই-লাহোরী নামে পরিচিত।

পাকিস্তান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে “পাকিস্তানের জাতীয় কবি” হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাঁর জন্মদিন ইয়াম-ই ওয়েলাদাত-ই মুআম্মাদ ইকবাল (উর্দু: یوم ولادت محمد اقبال‎‎, বা ইকবাল দিবস, পাকিস্তানের সরকারী ছুটির দিন হিসাবে পালন করা হয়।

ইকবালের বাড়ি এখনও শিয়ালকোটে অবস্থিত এবং এটি ইকবালের মঞ্জিল হিসাবে স্বীকৃত এবং দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। তাঁর অন্যান্য বাড়ি যেখানে তিনি তাঁর বেশিরভাগ জীবন কাটিয়েছেন এবং মারা গেছেন যা লাহোরে, জাভেদ মনজিল’ নামে পরিচিত। বর্তমানে এটি জাদুঘর যা পাকিস্তানের পাঞ্জাবের লাহোর রেলস্টেশনের কাছে আল্লামা ইকবাল রোডে অবস্থিত।

ইকবালের জন্ম ১৮৭৭ সালের ৯ নভেম্বর ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের (বর্তমানে পাকিস্তান) শিয়ালকোটের একটি জাতিগত কাশ্মীরি পরিবারে। তাঁর পরিবার হলেন কাশ্মীরি ব্রাহ্মণ সাপ্রু যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। উনিশ শতকে, শিখ সাম্রাজ্য যখন কাশ্মীর জয় করছিল, তখন তাঁর দাদার পরিবার পাঞ্জাবের শিয়ালকোটে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। ইকবাল প্রায়শই তাঁর লেখায় কাশ্মীরি বংশের ধারা উল্লেখ ও স্মরণ করতেন।

তার দাদা শেখ রফিক কাশ্মিরী শাল তৈরি এবং ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন। তার দু’জন পুত্র ছিলেন শেখ গোলাম কাদির এবং শেখ নুর মোহাম্মদ। ইকবালের বাবা শেখ নূর মুহাম্মদ (মৃত্যু: ১৯৩০) তিনি ছিলেন দর্জি, আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিত নন, তিনি একজন ধর্মীয় মানুষ ছিলেন। শেখ নুর মোহাম্মদ কেবল পেশাগত দিক দিয়ে নয়, চিন্তাধারা এবং জীবন যাপনে ছিলেন ইসলামের প্রতি অত্যন্ত নিবেদিত-প্রাণ। সুফি সঙ্গীদের কাছে তার প্রচণ্ড সম্মান ছিল। তার স্ত্রী, মোহাম্মদ ইকবালের মা ইমাম বিবিও ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক মহিলা। তিনি ১৯১৪ সালের ৯ নভেম্বর শিয়ালকোটে মারা যান। এই দম্পতি তাদের পাঁচ সন্তানের মধ্যে ইসলাম ধর্মের প্রতি গভীর অনুভূতির জন্ম দিয়েছিলেন।

পাঞ্জাবের ব্রিটিশ আর্মির কাছে শিখদের পরাজয়ের পর খ্রিষ্টান মিশনারিরা শিয়ালকোটে শিক্ষা প্রচারের উপর গুরুত্ব দিতে শুরু করেন। এই সময়েই শিয়ালকোটে স্কটিশ মিশন কলেজ স্থাপিত হয়। ১৮৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কলেজ লিবারেল আর্টস্ এর কোর্সসমূহের অনেকগুলোতেই আরবি ও ফার্সি ভাষা মাধ্যমে শিক্ষাদান করা হতো। যদিও এই সময় বেশির ভাগ স্কুলেই ফার্সি ভাষার পরিবর্তে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়। এই স্কটিশ মিশন কলেজেই ইকবাল সর্বপ্রথম আধুনিক শিক্ষা প্রাপ্ত হন।

ইকবাল তার কাব্য প্রতিভার স্বীকৃতি পান তার শিক্ষক সাইয়িদ মীর হাসানের কাছ থেকে। ১৮৮৫ সালে স্কটিশ মিশন কলেজের পড়াশোনা শেষ করে ইকবাল লাহোরের সরকারি কলেজে ভর্তি হন। দর্শন, ইংরেজি ও আরবি সাহিত্য নিয়ে তিনি পড়াশোনা করেন এখান থেকে তিনি স্বর্ণ পদক নিয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৮৯২ সালে ইকবাল স্কটিশ মিশন কলেজ হতে তার পড়াশোন শেষ করেন। তিনি ১৮৯৫ সালে চারুকলা অনুষদের থেকে ইন্টারমিডিয়েট লাভ করেন।[২২] ১৮৯৯ সালে যখন তিনি মাষ্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন ততদিনে তিনি সাহিত্য অঙ্গনে পরিচিত ব্যক্তিত্ব।

মাস্টার্স ডিগ্রিতে পড়বার সময় ইকবাল স্যার টমাস আর্নল্ড এর সংস্পর্শে আসেন। এই শিক্ষাবিদ ইসলাম ও আধুনিক দর্শনে বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। ইকবালের কাছে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেছিলেন। স্যার টমাস আর্নল্ডই ইকবালকে ইউরোপে উচ্চ শিক্ষায় অনুপ্রাণিত করেছিলেন তাকে।

বিবাহ
ইকবাল বিভিন্ন সময় প্রয়োজন ও পরিস্থিতিতে তিনবার বিয়ে করেছিলেন।১৮৯৫ সালে ১৮ বছর বয়সে তাঁর প্রথম বিবাহ হয়েছিল। গুজরাটি চিকিৎসকের মেয়ে করিম বিবির সাথে তার বিয়ে হয়। তাদের বিচ্ছেদ হয় ১৯১৬ সালে । এই দম্পত্তির তিনটি সন্তান ছিল। যার মধ্যে মেয়ে মিরাজ বেগম (১৮৯৯-১৯১৫) এবং ছেলে আফতাব ইকবাল (১৮৯৯-১৯৭৯) যিনি ব্যারিস্টার হয়েছেন। ১৯০১ সালে জন্মের পরে তার আরেক পুত্র মারা গেছেন বলে জানা যায়। ইকবালের দ্বিতীয় বিবাহ মুখতার বেগমের সাথে হয়েছিল এবং ১৯১৪ সালের ডিসেম্বরে ইকবালের মা মারা যাওয়ার পরের নভেম্বর মাসে এটি অনুষ্ঠিত হয়। তাদের একটি পুত্র ছিল, তবে মা এবং পুত্র উভয়ই ১৯৪৪ সালে জন্মের পরেই মারা যান। পরে ইকবাল সরদার বেগমকে বিয়ে করেন, তাদের দুই সন্তান, ছেলে জাভেদ ইকবাল এবং মেয়ে মুনিরা বানো।

ইউরোপে ইকবাল
ইকবাল ১৯০৫ সাল হতে লন্ডনে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন । তিন বৎসরের আইনের ডিগ্রি লাভ করেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লিঙ্কনস্ ইন হতে। আর ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন জার্মানির মিউনিখের লুডভিগ ম্যাক্সিমিলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় হতে ফ্রিডরিচ হোমেলের পরিচালনায় কাজ করা, ইকবালের ডক্টরাল থিসিসটি ছিল The Development of Metaphysics in Persia ।

১৯০৭ সালে, লেখিকা আতিয়া ফাইজির সাথে ব্রিটেন এবং জার্মানি উভয় জায়গায় তার বন্ধুত্ব তৈরি হয়।

রাজনীতি
বৃটেনে থাকতেই ইকবাল সর্বপ্রথম রাজনীতির সংস্পর্শে আসেন। ১৯০৬ সালে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হবার পরপরই তিনি তাতে যোগ দেন। দলের ব্রিটিশ চ্যাপ্টারের এক্সিকিউটিভ কমিটিতে নির্বাচিত হন ইকবাল। সৈয়দ হাসান বিলগামী এবং সৈয়দ আমির আলির সাথে তিনি সাব-কমিটির সদস্য হিসেবে মুসলিম লীগের খসড়া সংবিধান প্রস্তুত করেন। এর পর ১৯২৬ সালে তিনি লাহোরের মুসলিম লীগের পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হন।

পেশাগত জীবন
১৯০৮ সালে ইকবাল ইউরোপ হতে দেশে ফিরে আসেন এবং লাহোরের সরকারি কলেজে যোগদান করেন। এই সময় একই সাথে তিনি আইন ব্যবসা, শিক্ষাদান ও সাহিত্য চর্চা শুরু করেন। কিন্তু মূলত অর্থনৈতিক কারণেই তিনি ১৯০৯ সালে তিনি সার্বক্ষণিক আইন পেশায় নিয়োজিত হন। ইকবাল কেবল একজন উঁচু লেখকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন পরিচিত আইনজীবীও। তিনি দেওয়ানী ও ফৌজদারি উভয় বিষয়েই লাহোর হাইকোর্টে হাজির থাকতেন। তার নামে ১০০ টিরও বেশি রায় দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি তার সাহিত্যর জন্যে বেশি সময় ব্যয় করতেন। তিনি তার পিতাকে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে কবিতার বিনিময়ে কোনো অর্থ তিনি গ্রহণ করবেন না। অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণে তিনি সে প্রতিজ্ঞা রাখতে পারেন নি। ইতোমধ্যেই বিখ্যাত কবি ইকবালকে ব্রিটিশ সরকার তাকে “আসরার-ই-খোদায়ী” পুস্তকের জন্য নাইট উপাধিতে ভূষিত করেন।

ইকবাল দর্শন ও সাহিত্য
আল্লামা ইকবাল অমর হয়ে আছেন তার কয়েকটি কবিতা ও রচনার জন্য। এরমধ্যে আসরার ই খুদি, শিকওয়া ও জবাবে শিকওয়া, দ্যা রিকনস্ট্রাকশন ওফ রিলিজিয়াস থট ইন ইসলাম, বাআল ই জিবরাইল, জাভেদ নামা, ইত্যাদি অত্যন্ত গভীর দার্শনিক ভাব সমৃদ্ধ রচনা। আল্লামা ইকবালের লেখনিতে যে ইসলামী পুনর্জাগরণের আওয়াজ উঠেছিল তা সমসাময়িক অনেক ব্যক্তি ও আন্দোলনকে সাংঘাতিকভাবে প্রভাবিত করেছে। তার দর্শনে প্রভাবিত হয়েছিলেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ যিনি পাকিস্তানের কায়েদে আজম। তার ইসলামী পুনর্জাগরণের চেতনাকে সারা জীবনের তরে জীবনোদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করে একটি পুনর্জাগরণী দলের জন্ম দেন তার স্নেহধন্য সৈয়দ আবুল আ’লা মওদুদি। যার প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামী পাক-ভারত উপমহাদেশে ইসলামী পুনর্জাগরণের স্বপ্ন দেখেছিল আল্লামা ইকবাল শিয়া চিন্তানায়কদেরকেও প্রভাবিত করেছিলেন। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের চিন্তানায়ক ড. আলি শরিয়তিও আল্লামা ইকবাল দ্বারা সাংঘাতিক প্রভাবিত ছিলেন।

১৯৩৮ সালের ২১ এপ্রিল তিনি মৃত্যু বরন করেন।