ওয়াকফ সম্পত্তিতে মসজিদ থাকা সত্ত্বেও আইনি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে মিল্কি গ্রামের বাসিন্দাদের

    ওয়াকফ সম্পত্তিতে মসজিদ থাকা সত্ত্বেও আইনি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে মিল্কি গ্রামের বাসিন্দাদের

    ইয়াসীন আক্রাম, বঙ্গ রিপোর্ট, শক্তিপুর, মুর্শিদাবাদ: 110বিঘা সম্পত্তি, বংশ পরম্পরায় তাদের হাতেই ছিল মোতায়ালীর দায়িত্ব। ফলে  সুকৌশলে মসজিদের সেই 110 বিঘা ওয়াকফ সম্পত্তি ধীরে ধীরে বিক্রি ও নিজের নামে রেকর্ড করার অপচেষ্টা চালালেও নির্বিকার প্রশাসন। মাফিয়ারাজ চালানো প্রাক্তন মোতওয়াল্লীদের ভয়ে সাধারণ মানুষ চুপ থাকলেও প্রশাসনের কর্মকর্তারাও কোনো সদর্থক ভূমিকা না নেওয়ায় কিন্তু এলাকার সাধারণ মানুষ থেকে বুদ্ধিজীবী মহল ক্ষুব্ধ। ঘটনাটি মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা -২ ব্লকের শক্তিপুর থানার মিল্কি গ্রামে।

    ঘটনার সূত্রপাত 1958 সালে। সূত্রের খবর,1793 সালের দিকে এলাকার বিখ্যাত দানবীর মরহুম শেখ আফসার হোসেন সাহেব মসজিদের নামে 110 বিঘা সম্পত্তি ওয়াকফ করেন। যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন তিনিই সেই জমির মোতায়াল্লী থাকলেও তার মৃত্যুর পর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জনের হাতে যায় মোতাল্লির  রাস। শেষ পর্যন্ত 1998 সালে গোলাম পীর নামে এক ব্যক্তিকে মোতায়াল্লী বানানো হয়। কিন্তু সেই সময় থেকেই শুরু হয় ওয়াকফ সম্পত্তি বিক্রি ও নিজ নামে  রেকর্ড করার গোপন চক্রান্ত। পরবর্তীতে গোলাম পীরের মৃত্যুর পর তিন সন্তানের হাতে অর্থাৎ বাগবুল মঞ্জু, ইকবাল  মঞ্জু ও কবির  মঞ্জুর হাতে সেই ওয়াকফ সম্পত্তি আসলে তারা ধীরে ধীরে সেই সম্পত্তি বিক্রি করার প্রচেষ্টা চালান।

    গ্রামবাসীরা বাধা দিলে থানা পুলিশ দেখিয়ে  বার বার জেলে পুরার হুমকিও দেন। এমত অবস্থায় 2006 সালের শেষের দিকে বাগবুল মঞ্জু অবৈধভাবে সেই ওয়াকফ সম্পত্তি প্রায় 15 বিঘা বিক্রি করে দেয় এবং আরো 10 বিঘা সম্পত্তি বিক্রি করার প্রাকান্তর  প্রচেষ্টা চালান। সেই গ্রামের মেম্বার আনোয়ার হোসেন ও ইউসুফ আলী বাধা দিলে চুরির কেস দিয়ে সেই সময়ে পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় দুই মাস জেলে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু তাতেও দমে যায়নি ওই দুই লড়াকু নেতা। টানা 2 মাস জেল থেকে বেরিয়ে আসার পর 2007 সালে ওয়াকফ বোর্ডের দ্বারস্থ হন তারা। কিন্তু কাজ না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ওই  বছরেই হাইকোর্টে পিটিশন দায়ের করা হয়।

    “মুর্শিদাবাদে 110 বিঘা ওয়াকফ সম্পত্তি বিক্রির  অপচেষ্টা প্রাক্তন মোতায়ালীর  বিরুদ্ধে, নীরব প্রশাসন “

    পরপর চারবার পিটিশনে হাইকোর্ট ওয়াকফ বোর্ডকে  ওই জমির দ্রুত হস্তক্ষেপের অর্ডার দেন। সেই মতো ওয়াকফ বোর্ড 2008 সালের প্রথম দিকে মসজিদের সেই ওয়াকফ সম্পত্তি খতিয়ে দেখতে টিম পাঠান এবং সম্পত্তি বিক্রি ও নিজের নামে রেকর্ড হস্তান্তরের অপরাধে বাগবুল মঞ্জুদের মতোয়াল্লি থেকে সরিয়ে দেন। পরবর্তীতে আবার ওয়াকফ বোর্ডের প্রতিনিধি দল এসে গ্রামে সরেজমিনে খতিয়ে দেখে গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলে এবং ওয়াকফ বোর্ডের হেয়ারিং এর মাধ্যমে মতোয়াল্লি হিসাবে 5 জনের নাম ঘোষণা করেন। সেইমতো নতুন মতোয়াল্লি কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন আনোয়ার হোসেন, সেক্রেটারি ইউসুফ আলী, ক্যাশিয়ার ফজলে মাওলা ও দুই মেম্বার ডক্টর আলাউদ্দিন শেখ এবং মজিবুর রহমান। কিন্তু বাধ আসে মতোয়াল্লি  হস্তান্তরের সময়। আগের মতোয়াল্লি তথা গোলাম পীরের  ছেলে বাগবুল মঞ্জু এই সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিক মেনে নিলেও 110 বিঘা  সম্পত্তির লোভ  থেকে সরে আসতে পারেনি। তাই বোর্ড থেকে বারবার জমি হস্তান্তরের কথা চিঠি মারফত এ.ডি.এম.এল.আর.ও, এস.ডি.এল.আর.ও এবং বি. এল.আর.ও কে জানালেও বাগবুল মঞ্জুর চক্রান্তে বি.এল.আর.ও বারবার রেকর্ড সংশোধনের তারিখ পরিবর্তন করতে থাকে। এমতাবস্থায় দীর্ঘ দিন অতিবাহিত হয়ে যাওয়ায় ওই  110 বিঘা  সম্পত্তির নতুন মতোয়াল্লী আনোয়ার হোসেন ও ইউসুফ আলী সহ আরো তিনজন মেম্বার বহরমপুর এর ডি.এম ও এস.ডি.ও দ্বারস্থ হন। তারাও বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত সেই জমি “শেখ আফসার হোসেন ওয়াকফ স্টেট,ইসি 1207” এর নামে হস্তান্তরের কথা বলে বি.এল.আর.ও কে চিঠি দেন। কিন্তু বি.এল.আর.ও সেই চক্রান্তে তাতেও তারিখ পরিবর্তন করতে থাকে। তাই বাধ্য হয়েই নতুন করে ফের ওয়াকফ বোর্ডের দ্বারস্থ হন নতুন মতয়াল্লিরা। সেইমতো প্রাথমিকভাবে 45 বিঘা জমি উদ্ধারের ব্যাপারে আবার এ.ডি.এম.এল.আর.ও, এস.ডি.এল.আর. ও বি.এল.এল.আর.ও  কে ওয়াকফ বোর্ড থেকে নতুন করে চিঠি দেয়. কিন্তু সেই জমি উদ্ধারের ক্ষেত্রেও বি.এল.আর.ও টালবাহানা করছে বলে অভিযোগ।

    এদিকে তলে তলে সেই 110 বিঘা জমি বিক্রি করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বাগবুল। ফলে সেই 110 বিঘা জমির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
    এবিষয়ে স্থানীয় বি. এল.আর.ও কেয়া সরকারের বক্তব্য, এ.ডি.এম.এল.র.ও নির্দেশনা অনুযায়ী আমি কেসটা ডিসপোজ করে রেখেছি. ওই জমির বেশির ভাগ অংশ টাই বাগবুল মঞ্জুর নামে রয়েছে, তাই ডিপার্টমেন্ট  দখল ছাড়া তো রেকর্ড হয় না তাই দেখছি কিছু করা যায় কিনা। বেলডাঙা-2 ব্লকের বিডিও বলেন, আমি নতুন এসেছি এখানে, বিষয়টি খুব বেশি জানা নেই।

    তবে ওখানে ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে দুই পক্ষের রেকর্ড নিয়ে একটা গণ্ডগোল রয়েছে। পুরো জায়গাটা ওয়াকফ এর নামে দান করা থাকলেও, সেটা মসজিদের কিছু অংশ ওয়াকফ এর নামে রয়েছে এবং বাকি পুরোটা প্রাক্তন মোতায়াল্লী  বাগবুল মঞ্জু ও তার পরিবারের নামে রয়েছে. বি.এল.আর.ও  অফিসেই রেজিস্ট্রি সংক্রান্ত গণ্ডগোল রয়েছে। ওটা ওনারাই ভালো বলতে পারবে।

       অন্যদিকে এই বিষয়ে রেজিনগর বিধানসভার বিধায়ক রবিউল আলম চৌধুরীর বক্তব্য, সমস্যাটা দীর্ঘদিনের, ওয়াকফ বোর্ড গ্রামের মানুষকে মোতায়াল্লী প্রদান করলেও প্রাক্তন মোতায়াল্লীরা সেই জমি ছাড়তে চাইছে না। এটা নিয়ে টাল বাহানা করছে। ওয়াকফ বোর্ডের চেয়ারম্যান আব্দুল গনি সাহেবের বক্তব্য যারা মসজিদের সেই ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়ে নতুন মোতায়াল্লী রাখা হয়েছে।তবে বিষয়টা নিয়ে ভাবনা চিন্তা চলছে।