আমরা আত্মসমর্পণ করি না, হয় জিতি না হয় মরি: মরুসিংহ উমর আল মুখতার

আমরা আত্মসমর্পণ করি না, হয় জিতি না হয় মরি: মরুসিংহ উমর আল মুখতার

বঙ্গ রিপোর্ট ডিজিটাল ডেস্ক: মক্তবের শিক্ষক হতে ইতিহাসের মহাবীর, মহানায়ক উমর আল মুখতার রহ.। ওমর মুখতার (২০ আগষ্ট, ১৮৫৮–১৬ সেপ্টেম্বর,১৯৩১) লিবিয়ার সিরেনিকায় জানযুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯১২ সাল থেকে শুরু করে প্রায় বিশ বছর তিনি লিবিয়ায় ইতালীয় ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেন। ১৯৩১ সালে তিনি ইতালীয়দের হাতে গ্রেপ্তার হন এবং তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।

উমর আল মুখতার মুহাম্মদ ইবনে ফারহাত রহ., যিনি মরুসিংহ নামে খ্যাত। উত্তর আফ্রিকা (আধুনিক লিবিয়া, চাদ, সুদান, মিসরের কিছু অংশে) মুসলিম প্রতিরোধ সংগ্রামের অগ্রনায়ক। কৈশোরে তিনি পিতৃহীন হন।

চরম দারিদ্র্য আর পারিবারিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে বিশ বছর বয়সে এসে কর্মজীবন শুরু করেন। ইলমে দ্বীন চর্চার পাশাপাশি পাণ্ডিত্য ছিল আরবের ভৌগোলিক অবস্থার ব্যাপারে।

তিব্বে নববী বিশেষত ভেষজ চিকিৎসায় পারদর্শী ছিলেন। তিনি কর্মজীবনে বাচ্চাদের কোরআন শেখাতেন। আমাদের দেশে যেটাকে আমরা মক্তব বলি। প্রচলিত পরিভাষায় আমরা যেটাকে বলি মক্তবের মৌলভি, তিনি ছিলেন তাই।

এই মক্তবের মৌলভিই ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়েছেন দূর্গসম। শুধু লিবিয়ায় ইতালির বিরুদ্ধেই নয়, বরং মিসরে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এবং চাদে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন।

পৃথিবীর সমসাময়িক ইতিহাসে তাঁর মত আর কেউই নেই, যিনি ১ হাজারের মত প্রতিরোধ যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন কিম্বা প্রত্যক্ষভাবে শরিক ছিলেন।

যৌবনের প্রারম্ভে একটা কাফেলার সঙ্গে করে সুদান যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে একজায়গায় পুরো কাফেলাকে থামতে হয় কারণ সামনে সিংহ থাকায় সে পথ অতিক্রম সম্ভব হচ্ছিল না।

লোকেরা বাধ্য হয়ে কাফেলার একটা উট সেদিকে ছেড়ে দেয়। যাতে সিংহের পেট ভরা থাকলে তারা জায়গাটা নির্ভয়ে অতিক্রম করতে পারে।

কিন্তু এতেও পুরো নিশ্চিন্ত হওয়া যাচ্ছিল না। উমার আল মুখতার একাই উটের পথ ধরে এগিয়ে যান। আর সিংহটাকে হত্যা করে এর মাথা হাতে করে নিয়ে কাফেলার কাছে ফেরেন।

লোকেরা খুশি হয়ে তাঁকে ‘বারক্বা’র সিংহ’ (Lion of the Cyrenaica) বলে উপাধি দেয়। এই উপাধিই পরে মরুসিংহ (Lion of the desert) নামে পরিচিতি পায়।

দীর্ঘ ৩৫ বছর তিনি সংগ্রাম করেছেন। বহুবার তাঁকে লোভনীয় প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। একবার তাঁকে বলা হলো, সে যদি সশস্ত্র সংগ্রাম ছেড়ে দেয় তবে আজীবন তাঁর জন্য ভাতা ও উচ্চপদ নির্ধারণ করা হবে।

তিনি জবাব দিয়েছিলেন, ‘আমি কখনোই আমার সংগ্রাম ত্যাগ করব না। যতক্ষণ না পর্যন্ত আমার রব্বের সাথে মিলিত হই। প্রকৃতপক্ষে মৃত্যুই তো সর্বাপেক্ষা নিকটবর্তী। প্রতিটি মুহুর্ত আমি এর জন্য প্রস্তুত রয়েছি।’

৭৩ বছর বয়সে যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর ঘোড়া বন্দুকের গুলিতে আহত হয়ে মাটিতে পড়ে গেলে তিনি ঘোড়ার নিচে চাপা পড়েন। তিনি নিজেও আগে থেকেই আহত ছিলেন। তাঁকে ইতালিয়ান সেনাবাহিনী বন্দী করে।

বিচারের নামে এক প্রহসনের মধ্য দিয়ে ফাঁসির দণ্ড ঘোষণা করা হয়। দুই হাত শিকলবন্দী করে তাঁকে আনা হয়। যুদ্ধে আহত হয়ে আগে থেকেই তিনি সোজাভাবে হাঁটতে পারতেন না। তাঁর পায়ের হাড় ভাঙা ছিল। তাঁকে পা টেনে টেনে হাঁটতে হত।

২০ হাজার লোকের উপস্থিতিতে ১৬ ই সেপ্টেম্বর, ১৯৩১ এ প্রকাশ্যে শহরের তাঁর ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করা হয়।

জানা যায়, বিচারের আগে তাঁকে ইতালিয়ান জেনারেল শেষবারের মত প্রস্তাব দিয়েছিলেন, ইতালির প্রতি আনুগত্যের ঘোষণা দিতে এবং প্রতিদানে বাকি নেতাদের মতই আয়েশি জীবন কাটাতে।

তিনি জবাবে বলেছিলেন, ‘আমি কখনোই এইসব লোকেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করব না যতক্ষণ না তারা এই দেশ ছেড়ে যায় অথবা আমি দুনিয়া ছেড়ে যাই।

সেই সত্ত্বার কসম যিনি মানুষের অন্তরের কথা জানেন, যদি আমার হাত শেকলে বাঁধা না থাকত তবে আমি আপনার সঙ্গে লড়াই করতাম এই খালি হাতে, বার্ধক্য আর ভাঙ্গা হাড় নিয়েই।’

উমার আল মুখতারের যুগেও অসংখ্য আলেম ছিল কিন্তু সবাই উমার আল মুখতার হয়ে উঠে নি। বহুজন ছিলেন যারা আয়েশ আর জীবনের নিরাপত্তার বিনিময়ে সাম্রাজ্যবাদীদের দাসে পরিণত হয়েছিলেন।

ইতিহাস তাঁদের স্মরণ রাখে নি। তারা শাহাদাতের মর্যাদা আর উম্মতের শ্রদ্ধার আসন পান নি। উম্মতের তো আজ লাখো কোরআনের শিক্ষক আছে। কিন্তু একজনও মক্তবের মৌলভি উমার আল মুখতার নেই। সেই কোরআন আছে, সে ইসলাম আছে তবুও কেন নেই?

নেই কারণ আমাদের মধ্যে রয়েছে সেই ঈমানী দৃঢ়তার অভাব আর আমলের ঘাটতি। উমার আল মুখতার এত সংগ্রামের মধ্যেও শেষ রাত্রিরে রবের দরবারে হাত তোলা থেকে কখনো বিরত থাকেন নি।

ইশার পর মাত্র ৩ ঘণ্টা ঘুমোতেন। বাকি সময় সালাত আর তিলাওয়াতে কাটাতেন। মাত্র ৭ দিনে একবার কোরআন খতম করতেন। আদতে তিনি যেমন ছিলেন বীর যোদ্ধা তেমনই ছিলেন অধিক তিলওয়াত ও সালাত আদায়কারী।

অধিক ইবাদাতের মধ্য দিয়ে রব্বের নৈকট্য অর্জন ব্যতীত মানুষের পক্ষে কিছুই অর্জন করা সম্ভব নয়৷